ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ

আজ ২৪ জানুয়ারি। ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে বাঙালির স্বাধিকার আদায়সহ পাকিস্তানি স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে মতিউর রহমান, মকবুল, রুস্তমসহ পাঁচজন শহীদ হন। তাদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলনসহ স্বাধীনতা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়।

বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা দেয়ার কারণে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাতে চেয়েছিলো পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠী। কিন্তু সেদিন বিক্ষুব্ধ বাংলার মানুষ দ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান-গণবিস্ফোরণের মুখে আইয়ুব খানকে ক্ষমতার মসনদ থেকে বিদায় জানায় এবং দীর্ঘ ৩৩ মাস কারাগারে আটক প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুক্ত করে আনে।

ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। পৃথক বাণীতে গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনসহ তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন তারা।

এ দেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে বাঙালিকে মুক্ত করতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন। এতে স্বাধিকার আন্দোলনের গতি তীব্রতর হলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে। এর বিরুদ্ধে ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-জনতার দেশব্যাপী দুর্বার ও স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন শুরু হয়।

এক পর্যায়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি ঢাকায় হরতালের ডাক দেয়। এই হরতাল চলাকালে সচিবালয়ের সামনে (আবদুল গণি রোড) শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে বকশীবাজার নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র মতিউর রহমান মকবুল, রুস্তমসহ পাঁচজন শহীদ হন। সেদিন মতিয়ুরের বুক পকেটে পাওয়া গিয়েছিল একটি চিরকুট। তাতে লেখা ছিল, ‘মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। যদি ফিরে না আসি, তুমি মনে করো তোমার ছেলে বাংলার মানুষের জন্য জীবন দিয়ে গেছে। ইতি- মতিয়ুর রহমান, ১০ম শ্রেণী, পিতা আজহার উদ্দিন মল্লিক, নবকুমার ইন্সটিটিউট। ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনি, মতিঝিল।’

এর আগে ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে আসাদুজ্জামান আসাদ শহীদ হওয়ায় গোটা পূর্ব পাকিস্তান এমনিতেই বিক্ষোভে তেতে ছিল। ২৪ জানুয়ারি মতিউরদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন দুর্বার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ডাকসুর তৎকালীন ভিপি ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজের পাশাপাশি রাজপথে নামে বিক্ষুব্ধ বাঙালি। অবশেষে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুসহ রাজবন্দিদের মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি পদত্যাগে বাধ্য হন।

এই ঐতিহাসিক দিনের স্মরণ করে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক তৎকালীন ঢাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ বলেন, ’৬৯-এর ২৪ জানুয়ারির ঝলমলে শীতের সকালটি আমাদের জীবনে অবিচল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার আগেই ক্ষুব্ধ জনতার উত্তাল সংগ্রামের মুখে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। সেদিনের ঢাকার সংগ্রামের দৃশ্য ভাবতে কতই না ভালো লাগে। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান যে বীরত্বের ইতিহাস রচনা করেছিল, সে ইতিহাসের কঠিন শিক্ষাই হল, জনগণের সংগ্রাম দাবানলের মতো জ্বলে উঠতে সময় লাগে না। জনতার ঐক্য যখন এক সুতোয় গাঁথা হয় তখন কোনো অপশক্তির ষড়যন্ত্র, অসত্য ও অসুন্দরের কালো পাহাড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। একজন স্বৈরশাসকের পতনের ইতিহাস যেমন করুণ, তেমনি জনতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই সত্য, চিরসুন্দর। আর তাই সত্যের জয় অনিবার্য।

এরই ধারাবাহিকতায় সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির অবিস্মরণীয় বিজয়, একত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চের গণহত্যা ও ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পথ ধরে তার নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়। নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন আজ সকালে রাজধানীর নবকুমার ইনস্টিটিউটে শহীদ মতিউর রহমান স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করবে।

উৎসঃ   ইনকিলাব
print

LEAVE A REPLY