সিইসির বক্তব্যে নড়েচড়ে বসেছে বিরোধী দলগুলো

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার নির্বাচনে অনিয়ম বন্ধ করা নিয়ে দেওয়া এক বক্তব্যের পরে নড়েচড়ে বসেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তারা বলেছেন, ক্ষমতাসীন জোটের বাইরে অন্যদলগুলো নির্বাচনের পর দিন থেকেই বলে আসছে এবার ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তিসহ নানা অনিয়ম হয়েছে। সিইসি তার বক্তব্যের মাধ্যমে স্বীকার করে নিলেন যে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট কারচুপি হয়েছে। ফলে বিভিন্ন মহল থেকে উঠা পুনর্নির্বাচনের দাবিটিও যৌক্তিক। একইসঙ্গে বিদেশি বন্ধুদেরও বোঝাতে সহজ হবে যে এবারের সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি।

রাজনীতিকরা বলছেন, পুনর্নির্বাচনের দাবিতে সরকার বিরোধী দলগুলোর একসঙ্গে আন্দোলন গড়ে তোলার যে বিষয়টি এসেছিল, সিইসির এই বক্তব্যের পর এখন তা আবার সামনে আসবে। চেষ্টা থাকবে সিইসির বক্তব্যকে কাজে লাগিয়ে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনও গড়ে তোলা।

গত ৮ মার্চ এক সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেন, ‘ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হলে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার কোনও সুযোগ থাকবে না। তার এই বক্তব্যের পরে চারদিকে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।’

নূরুল হুদা আরও বলেন, ‘জেলা-উপজেলা সদর থেকে অনেক দূরে দূরে ভোটকেন্দ্র হয়। এ কারণে আগের দিন এসব কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স পাঠাতে হয়। এখানে ভোটের দিন সকালে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স নিয়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু যদি ইভিএমে ভোটের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আর ভোটের আগের দিন রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার সুযোগ থাকবে না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের পর থেকে বলে আসছি ২৯ তারিখ রাতে ভোট ডাকাতি হয়ে গেছে। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়নি। সিইসি তার বক্তব্যে এটা স্বীকার করে নিলেন। জ্ঞাত বা অজ্ঞাত যেভাবে হোক তিনি নিজের স্বীকার করছেন একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে ভোট বাক্স ভর্তি হয়েছে। সুতরাং আমাদের পুনর্নির্বাচনের দাবি সঠিক আছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিইসির এই বক্তব্যের পরে দলে এই নিয়ে এখনও কোনও আলোচনা হয়নি।’

তবে বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সিইসির বক্তব্যকে কীভাবে কাজে লাগিয়ে পুনর্নির্বাচনের দাবিটি আরও জোরালো করা যায় তা ঠিক করতে রবিবার (১০ মার্চ) দলের স্থায়ী কমিটি বৈঠকে বসবে। পুনর্নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচিতে কিভাবে ক্ষমতাসীন জোটের বাইরে অন্যদলগুলোকে যুক্ত করা যেতে পারে সে কৌশল নিয়েও আলোচনা হবে। এছাড়া নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ধানের শীষের প্রার্থীদের ট্রাইবুন্যালে করা মামলার শুনানিতে সিইসির এই বক্তব্য একটা রেফারেন্স হয়ে দাঁড়াবে।

বিএনপির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি সূত্র জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির নেতারা। বৈঠকে ভোটের অনিয়মগুলো কীভাবে তুলে ধরা হবে তার প্রস্তুতিও চলছে। এখন সিইসির এই বক্তব্যের মাধ্যমে কূটনীতিকদের সহজে বোঝানো যাবে যে এবারের নির্বাচনের ভোটের কারচুপি হয়েছে আগের রাতেই। ফলে বিএনপির পুনর্নির্বাচনের দাবি যৌক্তিক।

সিইসির এই বক্তব্যের প্রসঙ্গে শনিবার (৯ মার্চ) বিকালে সাংবাদিকদের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আপনারা যেভাবে বুঝেছেন আমিও সেভাবেই বুঝেছি। তিনি কায়দা করে বুঝাচ্ছেন যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। দেশের মানুষ কিন্তু এখন সচেতন।’

একাদশ সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে গণশুনানি করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। শুনানিতে প্রার্থীরা অভিযোগ করেন যে- নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি রাখাসহ নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এইকসঙ্গে বর্তমান সংসদ বাতিল করে পুনর্নির্বাচনে দাবি উঠেছিল শুনানি থেকে।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দল বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘সিইসি নূরুল হুদার বক্তব্যে প্রমাণিত হয়, নির্বাচনে অনিময় হয়েছে। বিলম্ব হলেও তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন অনিয়মের কথা। তার এই বক্তব্য নিয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে আমরা ২-১ দিনের মধ্যে জোটগতভাবে বসবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভোটের অনিয়ম ও পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আমরা গণশুনানি করছি। কর্মসূচিও চলছে আমাদের। সিইসির এই বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে আমাদের পুনর্নির্বাচনের দাবি যৌক্তিক।’

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলেন, সিইসি বলেছেন ইভিএম ভোট হলে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার কোনও সুযোগ থাকবে না। তার এই কথায় প্রমাণিত হয়, আমরা যে এবারের সংসদ নির্বাচনে ভোট চুরির অভিযোগ করেছি তা সঠিক। এই জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই আমি। একইসঙ্গে ওনাকে বলবো নির্বাচন সুষ্ঠু করতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে সরে দাঁড়ান। আর সরকারকে বলবো ভোট চুরির এই সংসদ বাতিল করে পুনর্নির্বাচন দিন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘সবাই নিজেদের মত করে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে। এখন সব দলের মধ্যে মতের মিল থাকলে যেকোনও সময় যৌথভাবে রাজপথে এই দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। এতে আমরাও যেতে পারি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন- সিইসি কে এম নূরুল হুদার বক্তব্যের পর এখন একাদশ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের দায়িত্ব হলো সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা। তারা যদি সেই কাজ করতে না পারে তাহলে তাদের দায়িত্বে থাকার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন সম্পাদক) বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি না শুধু, যতজনের কথা শুনছি এমনকি সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. সাখাওয়াত হোসেনও বলতেছে এটা তো একটা স্বীকারোক্তি। এটা তো ভয়ানক। এতদিন বিরোধী দল, বিদেশি মিডিয়া, টিআইবিসহ বিশিষ্টজনেরা বলে আসছে নির্বাচনের অনিয়মের কথা। এখন তো নির্বাচনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।’

নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এটা সুস্পষ্ঠ বলে মনে করেন বদিউল আলম। তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের দায়িত্ব হলো সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা। এখন নির্বাচন যদি সঠিক না হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আসে নির্বাচন কমিশন কি করবে। তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিইসির বক্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে যে- বিভিন্ন দল থেকে পুনর্নির্বাচনের যে দাবি উঠেছে তা সঠিক।’

বাংলা ট্রিবিউন

print

LEAVE A REPLY