সাক্ষাৎকারে নুর, ‘দায়িত্ব নিলে প্রথমে গণরুমে নির্যাতন থামানোর উদ্যোগ নেবো’

দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ১১ হাজার ৬২ ভোট পেয়ে সহ সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর। গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসুর নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ২৫টি পদের মধ্যে মাত্র দুটি পদে জয়লাভ করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের এই প্যানেল। বাকি পদগুলোতে জয়লাভ করেছে ছাত্রলীগের প্রার্থীরা। ভোটের দিন ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি পাঁচটি প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে তিনিও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি পদে জয়লাভ করে এখন শিক্ষার্থীরা চাইলে দায়িত্ব পালনে ইচ্ছুক নুরুল হক নুর। আর দায়িত্ব গ্রহণ করলে প্রথমেই গেস্টরুম, গণরুমে সাধারণ ছাত্রদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের নির্যাতন চালানোর যে অপসংস্কৃতি তা থামানোর জন্য উদ্যোগ নেবেন তিনি।

তবে তাকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গতকাল থেকে পক্ষ-বিপক্ষ শিবিরে চলছে গুঞ্জন, দানা বাঁধছে সন্দেহ। এর কারণ গতকাল মঙ্গলবার (১২ মার্চ) নিজের অবস্থান পরিষ্কার না করে একদিনে নুরের চার রকম কথা বলা। এই নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার অভিযোগ তুলে অন্য প্যানেলগুলো যখন পুনর্নির্বাচনের দাবিতে মরিয়া হয়ে আন্দোলনে তখন নুর দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন নাকি বাকিদের সঙ্গে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করবেন তা আজ বুধবারও (১৩ মার্চ) স্পষ্ট করেননি তিনি।

বুধবার দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাইলে তিনি শপথ নেবেন। কিন্তু, এই সিদ্ধান্ত নিতে দুই-একদিন সময় লাগবে। দায়িত্ব গ্রহণ করবেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন নুর। কিন্তু তিনি কোথাও ‘শপথ নেবেন না’ এমন কথা বলেননি।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার দুপুরে মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে।

বাংলা ট্রিবিউন: দায়িত্ব নেবেন নাকি আন্দোলন করবেন?

নুর: এইটা আসলে ‘ওইভাবে’ না। কারণ, আমি অবশ্যই সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাহিদাটিকে সবসময় প্রাধান্য দেবো। আমাকে যারা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন বা আমার সহযোদ্ধারা দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে ছিল, পরিশ্রম করেছে, আমাকে নির্বাচিত করার পেছনে তারা ভূমিকা পালন করেছে, তারা যদি আমাকে বলে দায়িত্ব নিতে আমি দায়িত্ব নেবো। আমাকে যদি তারা বলে পুনর্নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করতে আমি সেটা করবো।

একটি পক্ষ আপনাকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে, তাদেরও তো প্রত্যাশা থাকতে পারে-

সেজন্য আমি বলেছি সবারটা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবো। আর এখানে তো এমন না যে গতকালকে আমাকে ডাকা হয়েছে , না গেলে আমার পদ শেষ! বিষয়টা তো এরকম না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আছে।

যেহেতু ডাকসু’র কেন্দ্রীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাত্রলীগের, দায়িত্ব নিয়ে কাজ করবেন কিভাবে?

যেহেতু গতকালকে আমরা দেখেছি যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ভাই শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন এবং তিনি সবার সামনে কথা দিয়েছেন  এবং তার নেতা কর্মীদের বলেছেন যে স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণের নেতৃত্বে তারা আমাকে মেনে সহযোগিতা করবেন। যেহেতু একটি ছাত্র সংগঠনের প্রধান এই কথা বলেছেন, সেই জায়গা থেকে আমরা মনে করি তারাও সেই সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন। এখানে অন্যান্য ছাত্র সংগঠন যারাই রয়েছেন, এখানে ভিসি স্যার আছেন সভাপতির পদে, আমি মনে করি সবকিছু মিলিয়ে কাজ করতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে না।

এক বছরের জন্য ভিপি পদে জয়ী হয়েছেন। সময় কম, দায়িত্ব নিয়ে প্রথম কী কাজ করবেন?

দায়িত্ব নিলে প্রথমে আমাদের বিশেষ করে নজর থাকবে যে হলের ছাত্ররা যে রাজনৈতিক নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হচ্ছে হলে এবং ক্যাম্পাসে সেটার সমাধান করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্টরুম, গণরুম নামক যে অপসংস্কৃতি বা নির্যাতনের সংস্কৃতি রয়েছে সেটা বন্ধ করার জন্য একটা কার্যকর উদ্যোগ নেবো। আর দ্বিতীয়ত অছাত্র বহিরাগতরা যাতে হলে থাকতে না পারে সেটা বিবেচনায় থাকবে। আর শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন হল নির্মাণ না হলে সিট সংকট কাটানো সম্ভব নয়, সেই জায়গা থেকে আমাদের একটা বিষয় নজরে থাকবে যে , প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে অর্থাৎ যাদের ফ্যামিলির আর্থিক অবস্থা ভালো না, তারা যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিট পায় সেটা নিয়ে কাজ করবো। আর ক্যাম্পাস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, লাইব্রেরি, রিডিং রুমের পরিবেশ নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনের সময় হলগুলোতে সাধারণ ছাত্রদের ভোটদানে বাধা দেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ তোলেন ছাত্রলীগ ছাড়া অপর পাঁচটি প্যানেলসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এরপর রোকেয়া হলের ভেতরে বিপুল পরিমাণ ব্যালট উদ্ধারের ঘটনার পর সেখানে মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ আনেন নুরুল হক নুর। এরপর সব প্যানেল একত্রে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও গভীর রাতে হাসপাতালে বসে ভিপি পদে জয়ের সংবাদ পান নুর। গতকাল মঙ্গলবার (১২ মার্চ)  হাসপাতাল থেকে ক্যাম্পাসে আসেন তিনি। ক্যাম্পাসে তখন তার বিরুদ্ধে চলছিল স্লোগান। তার বিজয় মানতে না পেরে ভিপি পদে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে উপাচার্যের বাসার সামনে বসে অবস্থান কর্মসূচি করছিল ছাত্রলীগ। এর কিছুক্ষণ পর টিএসসিতে তাকে ধাওয়াও দেয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। নুর তখন তাদের জেতা দুটি পদ ছাড়া বাকি ২৩টি পদে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে অনড়। এজন্য ক্যাম্পাসে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু, প্রতিদ্বন্দ্বী পরাজিত প্রার্থী ও ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন তাকে মেনে নিয়ে শুভেচ্ছা জানালে ও সহযোগিতার কথা বললে কর্মসূচি প্রত্যাহার, বাম ঘরানার নেতাদের সঙ্গে বসার পর নিজেরটিসহ সব পদে আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে নির্বাচন দাবি করার পর আবার একটি গণমাধ্যমে শপথ নিচ্ছেন এমন মন্তব্য করেন তিনি। এমন একের পর এক অবস্থান পরিবর্তনের কারণে নূর আসলে কী করবেন তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত নন তার সহকর্মীরাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির কিছু শিক্ষার্থী মন্তব্য করেছেন, তারা ধারণা করছেন, ছাত্রলীগ প্রশ্রয় দেওয়ায় নিজের পদে নির্বাচন আর চাইবেন না নুর। তিনি অভিষেকে ঠিকই যোগ দেবেন।

print

LEAVE A REPLY