বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন আজ

বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন আজ। ১৯২০ সালের এদিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দিবসটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

এ উপলক্ষে আজ সব সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন আজ। তার ৯৯তম জন্মবার্ষিকীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে থাকছে নানা আয়োজন।

যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হবে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন। এছাড়া চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় আয়োজন থাকছে কোমলমতি শিশুদের জন্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের খুব ভালোবাসতেন বলেই দিবসটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়ে আসছে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আজ টুঙ্গিপাড়া যাবেন। সেখানে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মহান এ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন ও জাতীয় শিশু দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা যিনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। জনসাধারণের কাছে তিনি ‘শেখ মুজিব’ ও ‘শেখ সাহেব’ হিসেবে বেশি পরিচিত এবং তার উপাধি ‘বঙ্গবন্ধু’।

তিনি বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটে বেড়িয়ে বাঙালির কাছে পৌঁছে দেন পরাধীনতার শিকল ভাঙার মন্ত্র। সে মন্ত্রে বলীয়ান হয়ে স্বাধীন দেশে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ আজ বিশ্বে রোল মডেল।

তার সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই শুধু নয়- এখন বিদেশে চালও রফতানি করা হচ্ছে এবং দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে চলেছে।

বঙ্গবন্ধুর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান ও মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। তাদের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়।

সেদিনের টুঙ্গিপাড়ার অজপাড়াগাঁয় জন্মগ্রহণ করা ‘খোকা’ ডাকনামের সেই শিশুটি পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারি। গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ ও জনগণের প্রতি অসাধারণ মমত্ববোধের কারণেই পরিণত বয়সে হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু।

কিশোর বয়সেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে শেখ মুজিব প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। এরপর শুরু হয় তার আজীবন সংগ্রামীর অভিযাত্রা।

ইতিহাসের পাতায় পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পরপরই ঢাকায় ফিরে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা নিয়ে ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ গঠন করেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৮-এর আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারারুদ্ধ হন তিনি।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন বাঙালির অদ্বিতীয় নেতা। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার পক্ষে জানায় অকুণ্ঠ সমর্থন।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরভাস্বর।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষণটিকে ইউনেসকো বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন।

সে রাতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় বঙ্গবন্ধুকে কারাবন্দি করে রাখা হয়।

সে সময় প্রহসনের বিচার করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্যোগও নেয় পাকিস্তানি শাসকরা। যদিও পরে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ দেশের আপামর জনগণ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেন বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। এরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে মনোনিবেশ করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে সেনাবাহিনীর একদল পথভ্রষ্ট, বিশ্বাসঘাতক সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। বাঙালির হৃদয়ে গেঁথে যায় অবিস্মরণীয় ও কিংবদন্তি নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। তিনি রয়ে গেছেন কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে নীরবে।

১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর বড় কন্যা শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী।

আজ জাতীয় শিশু দিবস : স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটি শিশু দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাতীয় শিশু দিবস ঘোষণা করেন।

১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ দিবসটি পালন শুরু হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে জাতীয় শিশু দিবস পালনের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ করে দেয়।

তবে দলীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে দিনটি পালন অব্যাহত ছিল। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসেন। তারপর থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে আবার পালিত হচ্ছে জাতীয় শিশু দিবস।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচি : আজ রোববার সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করবে আওয়ামী লীগ। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ।

সকাল ৯টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের প্রতিনিধিরা টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবেন।

সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও গার্ড অব অনার প্রদান।

সকাল সাড়ে দশটায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস-২০১৯ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখবেন; বাদ জোহর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলেও অংশগ্রহণ করবেন তারা। এছাড়া সেখানে শিশু সমাবেশ, গ্রন্থমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আগামীকাল সোমবার বিকাল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটি ৩ দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর রাসেল স্কয়ারে শনিবার সকাল ১০টায় গরিব, দুস্থ, অসহায় মানুষের মাঝে রিকশা ও ভ্যান বিতরণ করা হয়।

আজ রোববার সকাল ১১টায় বিজয়নগরে ঢাকা বধির হাইস্কুল প্রাঙ্গণে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ এবং এতিম, প্রতিবন্ধী, বধির ও অসহায় শিশুদের মধ্যে উন্নত মানের খাবার বিতরণ এবং ৩১ মার্চ রোববার সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তি প্রদান ও সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টিলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বই বিতরণ অনুষ্ঠান হবে। এসব অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

এছাড়া যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন উপলক্ষে নিজ নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।

যুগান্তর

print

LEAVE A REPLY