চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রণক্ষেত্র: পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রোববার ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ক্যাম্পাস। পুলিশের লাঠিপেটা ও ছররা গুলিতে ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মী আহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দু’জনকে আটক করে। বিপরীতে ছাত্রলীগ কর্মীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে আহত হন ৫ পুলিশ সদস্য। ভাংচুর করা হয়েছে পুলিশের গাড়ি ও কয়েকটি ভবনে।

অস্ত্রসহ গ্রেফতার ছয় কর্মীর মুক্তিসহ চার দফা দাবিতে রোববার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটের ডাক দেয় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ ‘বিজয়’ ও ‘সিএফসি’। সকালে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। এর আগে হোসপাইপ কেটে ফেলে আটকে দেয় শাটল ট্রেন, আটকে দেয় শিক্ষকদের বাসও। নানা উদ্যোগের পরও তারা সেখান থেকে সরে যেতে না চাইলে পুলিশ তাদের সরানোর চেষ্টা করে। বেধে যায় সংঘর্ষ। এ নিয়ে এদিন অচল ছিল ক্যাম্পাস।

ছাত্রলীগ কর্মীদের অন্য তিনটি দাবি হল- ভিসি ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ও প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরীর পদত্যাগ এবং হাটহাজারী থানার ওসিকে অপসারণ। সংঘর্ষে অবস্থান ছাড়তে বাধ্য হলেও চার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রলীগের ওই নেতাকর্মীরা।

‘বান্ধবীর’ ফেসবুকে হাসির ‘রিয়েক্ট’ করা নিয়ে ৩১ মার্চ সংঘর্ষে জড়ায় ‘বিজয়’ ও ‘সিএফসি’ কর্মীরা। পরদিন বিভিন্ন হলে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ গুলি ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। সে সময় গ্রেফতার করে ছয়জনকে। দুই গ্রুপই চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি ও সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দিনের শুরুতেই শাটল ট্রেন আটকে দেয়া হয়। রেলওয়ে স্টেশন থেকে শাটল ট্রেনের কয়েকটি বগির হোস পাইপ কেটে নেয় অবরোধকারীরা। তারা ট্রেনের লোকোমাস্টারকে অপহরণ করে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ব্যবস্থাপক বোরহান উদ্দিন বলেন, ষোলশহরে স্টেশন থেকে অবরোধকারীরা শাটল ট্রেনের লোকোমাস্টারকে অপহরণ করার পর ছেড়ে দেয়। এর আগে তারা ট্রেনের হোসপাইপ কেটে দেয়। ফলে সারাদিনে আর ট্রেন চালানো যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, সকাল পৌনে ৯টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ কর্মীরা। তারা প্রধান ফটক আটকে দিয়ে কারাগারে থাকা ছয় কর্মীকে মুক্তিসহ চার দফা দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। বেলা সাড়ে ১০টার দিকে চবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা জিরো পয়েন্টে আসেন। তারা কয়েক দফা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে কর্মীদের অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করতে অনুরোধ করেন এবং উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকে যেতে বলেন। কিন্তু তাতে আশ্বস্ত না হয়ে কর্মীরা তাদের অবস্থানে অটল থাকে। এ সময় তারা ভিসিকে সেখানে আসার জন্য স্লোগান দিতে থাকে।

বেলা সোয়া ১১টায় প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেয় পুলিশের জলকামান। পুলিশ কর্মকর্তারা ছাত্রলীগ কর্মীদের সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তারা আশ্বাস দেন, অস্ত্র মামলা ও গ্রেফতার শিক্ষার্থীদের মুক্তির বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন সহযোগিতা করবে। কিন্তু রাজি হননি ছাত্রলীগ কর্মীরা। পরে সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের জলকামান ফটক খুলে ভেতরে ঢোকে। পুলিশ সামনে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা ফটক লাগিয়ে পুলিশকে ধাক্কা দেয়। এতে উভয় পক্ষ বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। ছত্রভঙ্গ হয়ে যান ছাত্রলীগ কর্মীরা। পুলিশ জিরো পয়েন্টে এবং ছাত্রলীগ কর্মীরা কাটা পাহাড়ের রাস্তায় ও শাহজালাল হলের সামনে অবস্থান নিয়ে পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।

প্রক্টর অধ্যাপক আলী আজগর চৌধুরী বলেন, ছাত্রলীগের আন্দোলন অনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য। শনিবার থেকে রোববার পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ভাংচুর চালিয়ে ৫ লাখ টাকার সম্পদ নষ্ট করা হয়েছে। বহিষ্কৃত কিছু ছাত্র শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি আরও বলেন, এক মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে বারবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে তারা। হলে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের কক্ষ ভাংচুর, সংঘর্ষে আহত ছাত্র মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও মারধরের ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। আজকেও মহিলা সমিতি, টিচার্স ক্লাবের গার্ডরুম ও শিক্ষক বাসসহ বিভিন্ন জায়গায় ভাংচুর চালিয়েছে।

আলী আজগর চৌধুরী বলেন, তাদের মধ্যে বারবার সংঘর্ষ থামাতে একাধিকবার বৈঠকও করা হয়েছে। সংঘাতে জড়াবে না জানিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে আবারও সংঘর্ষে জড়িয়েছে তারা। যখন তাদের সংঘর্ষ থামাতে আমরা হলে তল্লাশি ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি, তখন বহিষ্কৃত কিছু ছাত্রের নির্দেশে এই অবরোধের ডাক দেয় তারা। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন বন্ধ করে, প্রধান ফটকে তালা দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা কোনো ছাত্রের প্রতিবাদ-আন্দোলন হতে পারে না। গুটিকয়েকের জন্য কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ক্ষতি হবে- সেটা আমরা মেনে নিতে পারি না।

আন্দোলনকারী ছাত্রলীগ কর্মীরা বলেন, বর্তমান প্রশাসন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে জামায়াত শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। এ প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার শুরু থেকে সব সময় ছাত্রলীগের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মশিউদ্দোলা রেজা বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহবান জানিয়েছেন ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। তিনি বলেন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্রলীগকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটিকে তিনি বলেন, আমরা আশা করছি এ মাসেই কমিটি দিয়ে দেয়ার। এ বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে। কমিটি হওয়ার পর আশা করছি চবি প্রশাসন চাকসু নির্বাচন দেবে।

যুগান্তর

print

LEAVE A REPLY