কি ঘটেছিল সেই ভয়াল রাতে?

জোনায়েদ আহমেদ : দেশের পথে-প্রান্তরে, পাবলিক পরিবহনে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় চা স্টলে, হাটে-ঘাটে-মাঠে, টিভি টকশোতে সর্বত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পুলিশ-র‌্যাব, বিজিবি’র যৌথবাহিনীর মধ্যরাতের অভিযান। কেউ কেউ এ অভিযানকে অপারেশন মিডনাইট নামে অভিহিত করেছে। দেশের অধিকাংশ মিডিয়া ‘অপারেশন মিডিনাইট এর ব্যাপারে নীরব রয়েছে। এ নীরবতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে প্রভাবশালী বিশ্বমিডিয়া লন্ডনের ‘দ্য ইকোনমিস্ট’। নিরপেক্ষ দু’টি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় দু’-একটি পত্রিকা সরকারের খড়গ হতে গা বাঁচিয়ে যা লিখছে তাতে মানুষের জানার আগ্রহ তো মিটছে না বরং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরো বাড়ছে। চারিদিকে হরেক রকমের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

হেফাজতে ইসলাম তাদের ৫ ‘মে’র অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে আরো এক মাস আগে গত ৬ এপ্রিলের লংমার্চ পরবর্তী সমাবেশ থেকে। হেফাজতে ইসলাম আগে থেকেই মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবরোধ পরবর্তী সমাবেশ করার জন্য অনুমতি চেয়েছিল। সরকার শেষ মুহূর্তে তাদেরকে অনুমতি দেয়। বিভিন্ন মহল থেকে ধারণা করা হচ্ছিল যে, হেফাজতে ইসলাম তাদের অবরোধ কর্মসূচি অথবা অবরোধ পরবর্তী সমাবেশ দাবি না আদায় হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী করবে। সরকার কিভাবে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন মোকাবিলা করবে তা ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সময় পেয়েছিল এক মাস। অর্থাৎ ধরে নেয়া যায় ‘অপারেশন মিডনাইট’ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি নয়। সরকার সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে এ সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিল।

পুলিশের সাথে হেফাজত কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে বেলা ১২টার দিকে। রাত ১২ টা পর্যন্ত এ সংঘর্ষে বেশকিছু সংখ্যক নিহত ও কয়েকশ জন আহত হয়। কিন্তু রাত ১২টার পরের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। মূলত এ সময়ই অপারেশন মিডনাইটের প্রাথমিক পর্ব শুরু হয়। সরে যেতে বলা হয় মিডিয়াকর্মীদের। ধীরে ধীরে শাপলা চত্বর ছাড়ে মিডিয়াকর্মীরা। শাপলা চত্বর হয়ে পড়ে মিডিয়াকর্মী শূন্য। আরও অনেক আগেই রোড লাইট ও অন্যান্য আলোর ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকার করে রাখা হয়েছিল শাপলা চত্বরকে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সারাদিন মিছিল-শ্লোগান, সংঘাত-সংঘর্ষ ও দীর্ঘ পথ হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল হেফাজত কর্মীরা। অনেকেই ছিল ক্ষুধার্ত। ক্ষুধার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে শরীর। ক্লান্ত শরীরের হেফাজত কর্মীরা অধিকাংশই ঘুমিয়ে পড়ে। কেউ কেউ তন্দ্রাচ্ছন্ন। কেউ আবার জিকির আজকারে ব্যস্ত। কেউ দাঁড়িয়ে তাহাজুদ্দের নিয়ত করে। এমন একটি মুহূর্তে গভীর অন্ধকারে হেফাজত কর্মীদের ওপর চালানো হয় ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। অভিযানে অংশগ্রহণ করে পুলিশ র‌্যাব-বিজিবি’র ১৪ হাজার সদস্য। একমাত্র কমলাপুরের দিক বাকি রেখে অন্য তিন দিক থেকে মুহুর্মুহু গুলী চালিয়ে শাপলা চত্বরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে যৌথবাহিনী, এর আগেই সেখানে মোতায়েন করা হয় সিটি কর্পোরেশনের ময়লা অপসারণের ২০/২৫টি গাড়ি। ফায়ার সার্ভিসও মোতায়েন রাখা হয়। দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টিভি অন্ধকারের মধ্যেও দূর থেকে সরাসরি সম্প্রচার করছিল যেখানে অন্ধকার ও গুলীর শব্দ ছাড়া আর কিছুই বুঝা সম্ভব হচ্ছিল না। তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে দেয়া হয় এই দু’টি টেলিভিশন চ্যানেল। সঠিক তথ্য জানার শেষ সম্বল টুকু হারিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে বাকি রাত কাটে দেশবাসীর। ভোরবেলা, তখনও সূর্য উঠেনি, সুবহি সাদিকের আবছা আলোয় মতিঝিলবাসী দেখতে পায় পুলিশ শাপলা চত্বর ও আশেপাশের এলাকা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করছে।

আলো বন্ধ রেখে অন্ধকারের মাঝে, সাংবাদিকদের সরিয়ে দিয়ে, দু’টি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে। অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চরম গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে। আবার জনগণের দৃষ্টির আড়াল করতে, অভিযানকারীদের চেহারা লুকাতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে মধ্যরাতে। কিন্তু কেন এই গোপনীয়তা? সরকার কি গোপন করতে চেয়েছিল? রাত ১২টার পূর্ব পর্যন্ত ২২ জন হেফাজত কর্মী নিহত ও শত শত আহত হওয়ার খবর তো গোপন ছিল না। তাহলে কি আরো ভয়াবহ কোন গণহত্যা চালানো হয়েছিল মধ্যরাতের সেই অভিযানে- যা গোপন রাখতেই এত আয়োজন।

সরকারের প্রেসনোট, আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র ও ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যে একযোগে একই সুরে গণহত্যার বিষয়টি অস্বীকার করা হলেও তিনটি সূত্রের বক্তব্যের মাঝে যথেষ্ট অমিল আছে। এ অমিল থেকে বুঝতে কঠিন হয় না যে তারা কেউই সত্য কথা বলেননি এদিকে হেফাজতে ইসলাম বলেছে নিহতের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বিএনপি বলেছে আড়াই হাজার। অন্ধকারের সেই অভিযানের ব্যাপারে জনগণ এখনও অন্ধকারেই রয়ে গেছে। হেফাজতের বক্তব্য নয় বরং সরকারের বক্তব্য সঠিক হলেই জনগণ খুশি হবে। সরকারের বক্তব্য বিশ্বাস করে জনগণ মানসিক যন্ত্রণা ও স্বজন হারানোর বেদনা লাঘব করতে চায় কিন্তু জনমনে বিশ্বাস জন্মাতে হলে সরকারকে কিছু প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। প্রশ্নগুলো হলোÑ

১. হেফাজতে ইসলামকে অবস্থান করতে না দিলে অবস্থানের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের সমাবেশের অনুমতি দেয়া হলো?

২. সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছিল ৬টা পর্যন্ত। তাহলে ৬টার পরই তাদের সরানোর অভিযান না চালিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলো কেন?

৩. সবাই নিজের ভালো কাজের প্রচার চায়। সরকার যদি তখন মতিঝিলে ভালো কাজ করছিল, তাহলে দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি সেটাই লাইভ সম্প্রচার করছিল। সরকার ভালো কাজ করলে এ দু’টি টিভি বন্ধ করা হলো কেন?

৪. মানুষ ভালো কাজ করে প্রকাশ্যে, আলোতে আর খারাপ কাজ করে গোপনে, অন্ধকারে। যৌথবাহিনী আলো বন্ধ করে অন্ধকারে কি করছিল?

৫. সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ি মোতায়েন করা হয়েছিল কি সরানোর জন্য?

৬. মিডিয়াকর্মীদের সরিয়ে দেয়া হয়েছিল কেন?

৭. মুহুর্মুহু গুলীর শব্দ হচ্ছিল। পুলিশ গুলী না করলে কারা গুলী করল?

৮. পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি ছাড়া অভিযানে আরো কারা ছিল?

৯. বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ নেতাদের এখনো গ্রেফতার করা হলো না কেন? তারা এখন কোথায়? তারাও কি ‘অপারেশন মিডনাইটে’ অংশগ্রহণ করেছিল?

গুজব ছড়ানোর জন্য বিরোধীদলকে দায়ী না করে সরকারের উচিত এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া। উত্তর গ্রহণযোগ্য হলে জনগণ সরকারকে বিশ্বাস করবে। না হলে বিশ্বাস করবে বিরোধীদলকে। নয়াপল্টনে গায়েবানা জানাযায় বি. চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী, সাদেক হোসেন খোকা প্রমুখ বলেছেন এ গণহত্যা বিনা বিচারে যাবে না। এটুকু বলা যথেষ্ট না। সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শক্তিশালী বেসরকারি তদন্ত কমিশন গঠন করুন। অতিসত্বর তদন্ত করে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে প্রকৃত সত্য তুলে ধরুন।

জনাব বি. চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী, ড. কামাল হোসেন, ১৮ দল নেতৃবৃন্দ, ইসলামী ও সমমনা ১২ দল নেতৃবৃন্দ আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি। জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে দেশকে এ গণহত্যা থেকে বাঁচাতে ছোটখাটো বিভেদগুলো ভুলে গিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো আর একবার ঐক্যবদ্ধ হোন। জাতিকে এই ফ্যাসিবাদী, জালিম, খুনি সরকারের হাত থেকে বাঁচান। দেশবাসী আজ আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনাদের অনৈক্যের কারণে, অবহেলার কারণে দেশ যদি আরো কোন বড় দুর্যোগের সম্মুখীন হয়, যদি আরো বড় কোন গণহত্যা চালানো হয় তাহলে জাতির নিকট ও মহান আল্লাহর নিকট শেখ হাসিনার পাশাপাশি অপনারাও দায়ী হয়ে থাকবেন। কারণ আপনাদের দুর্বলতাই শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যায়কারী ও অন্যায় সহ্যকারী উভয়কে সমান ঘৃণা করতে বলেছেন। আপনারা অনেক সহ্য করেছেন। প্লিজ আর সহ্য করবেন না।

 

Songram

print

LEAVE A REPLY