মূলধন ঘাটতিতে ৬ ব্যাংক: চাহিদা ২৫ হাজার কোটি টাকা, বরাদ্দ ১৫শ’ কোটি

সরকারি খাতের ছয়টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ২৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সরকারের কাছে ব্যাংকগুলো চেয়েছে ২৪ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা।

সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

তাদের মূলধন ঘাটতি ও সুদ ভর্তুকি বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের আলাদা দুটি প্রতিবেদনে সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। মূলধন ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব ব্যাংক পিছিয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, জনগণের করের টাকা থেকে ব্যাংকগুলোকে এভাবে মূলধনের জোগান দেয়ার আগে তাদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত। জবাবহিদিতা থাকলে জালিয়াতি হবে না। তখন ঋণও খেলাপি হবে না। স্বাভাবিকভাবে কমে যাবে মূলধন ঘাটতি।

আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়। তবে এর পরিমাণ হবে কমপক্ষে ৪০০ কোটি টাকা। কোনো ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে ওই হারে অর্থ রাখতে না পারলে মূলধন ঘাটতি হিসেবে ধরা হয়। যে পরিমাণ অর্থ ঘাটতি থাকবে সেটিই তাদের মূলধন ঘাটতি। ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হলেই ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি খাতের ছয়টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। এর পরিমাণ ৮ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা।

সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কৃষিঋণের বিপরীতে মওকুফ করা সুদ ও মূল ঋণের সব অর্থ এখনও ফেরত পায়নি ব্যাংক। এ ছাড়া বেড়ে গেছে খেলাপি ঋণ। এসব কারণে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর বিপরীতে ব্যাংকটি সরকারের কাছে চেয়েছে ৭ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা।

জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৫ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। বিশেষ করে ক্রিসেন্ট লেদার ও অ্যানন টেক্সের জালিয়াতির কারণে তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। তাই মূলধন ঘাটতি বেড়েছে। ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে সরকারের কাছে চাওয়া হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা।

সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৫ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে হলমার্কসহ কয়েকটি জালিয়াতির কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এতে বেড়েছে ঘাটতি। এ ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছে কোনো নগদ অর্থ চাওয়া হয়নি। তবে ৬ হাজার কোটি টাকার গ্যারান্টি চাওয়া হয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় মূলধন ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘাটতি মেটাতে তারা সরকারের কাছে চেয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৮১৩ কোটি টাকা। সরকার থেকে কৃষি খাতের মূল ঋণসহ সুদ মওকুফ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মূলধন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে তারা সরকারের কাছে চেয়েছে ৭৭৫ কোটি টাকা।

অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৮৮৩ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে তাদের কোনো ঘাটতি ছিল না। গত বছর খেলাপি ঋণ বাড়ায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে তারা এখনও সরকারের কাছে কোনো অর্থ চায়নি। মুনাফা থেকে সমন্বয় করে ও খেলাপি ঋণ কমিয়ে এ ঘাটতি মেটানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।

২০১৭ সালে রূপালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি থাকলেও গত বছর তা সমন্বয় করেছে। ফলে গত বছর তাদের কোনো ঘাটতি নেই। এর আগে ব্যাংকটি রাইট শেয়ার ও বোনাস শেয়ার দিয়ে মূলধন বাড়িয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় ব্যাংকটি এটি করতে পেরেছে। এ ছাড়া মুনাফা থেকে সমন্বয় ও খেলাপি ঋণ কমিয়ে ঘাটতি মেটানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তারা সরকারের কাছে ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার গ্যারান্টি চেয়েছিল, তা দেয়া হয়নি।

প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নতুন মূলধনের জোগান, মূলধন ঘাটতি পূরণে এ সরকারের দুই মেয়াদে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংক পেয়েছে ৩ হাজার ৩৯০ কোটি, সোনালী ব্যাংক ৩ হাজার ৪০৫ কোটি, জনতা ব্যাংক ৮১৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক ১ হাজার ৮১ কোটি, রূপালী ব্যাংক ৩১০ কোটি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৭৩৫ কোটি এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৩২২ কোটি টাকা।

jugantor
print

LEAVE A REPLY