বাংলাদেশে হিন্দুবাদী সংগঠন ইসকনের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে

কেন্দ্র ভারতে হলেও বাংলাদেশে প্রভাব বাড়ছে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস- ইসকনের। তা ভক্ত অনুসারির সংখ্যার বিচারে, আচার অনুষ্ঠান আয়োজনে এবং প্রচার প্রাচরনায়ও। এমনকি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের লোক নিয়োগের আবদারও বাড়ছে।

১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। অভিযোগ রয়েছে ইসকনের ভক্ত-অনুসারি বা দিক্ষিত এমন কমপক্ষে তিন জনকে নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ওপর চাপ রয়েছে সংগঠনটির। প্রসঙ্গটি তোলা হলে ইসকনের কেন্দ্রীয় স্বামীবাগ আশ্রমের ব্রহ্মচারী ঈশ্বর গৌরহরিদাস কোন রাখ ঢাক ছাড়াই বললেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকদের ৩/৪ জন করে ইসকনের ভক্ত-অনুসারি রয়েছেন। আর নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব ক্ষেত্রেই ২/৩ জন করে থাকছেন।

হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ওখানেও আমাদের একজন নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। সব প্রক্রিয়া শেষ। এখন শুধু ফলাফলের অপেক্ষা।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৮-২০১৩ মেয়াদে গণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করা তরুণ এই ব্রহ্মচারী আরও জানান, তার বিভাগে ইসকনের অনুসারি কোন শিক্ষক না থাকলেও উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগে একজন শিক্ষক ছিলেন যিনি পরে বিভাগীয় প্রধানেরও দায়িত্ব পালন করেন।

কৃষ্ণ ভত্তির নতুন ধারা নিয়ে সৃষ্ট এই সংগঠনটির যাত্রা শুরু ১৯৬৬ সালে নিউ ইয়র্কে। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। তবে বাংলাদেশে ইসকনের কার্যক্রম নিয়ে প্রথম ১৯৭৫ সালে আয়ারল্যান্ডের একজন ও কানাডার দুই নাগরিক আসেন। প্রথমে তারা ঢাকার ৬১ তেজকুনিপড়ায় অফিস খুলে কার্যক্রম শুরু করেন। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা আর বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেননি।

পরে আবার ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে শুরু হয় ইসকনের প্রচার কার্য। এ যাত্রায়ও প্রথমে তারা তেজকুনিপাড়ায় এবং পরে ঢাকার ওয়ারি ও চিটাগং-এর হাটাজারিতে মন্দির স্থাপন করে। অল্প সময়ের মধ্যে হাটাজারিতে তাদের প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, ওই এলাকায় একটি গ্রামের নাম ‘ইসকন নগর’ রাখা হয়েছে।

১৮৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভারতের উত্তর কলকাতার ১৫১ নং হ্যারিসন রোডে জন্মগ্রহণ করা এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে ১৯৬৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে যান। বলা হয়, সেখানে তিনি যে জায়গাটিতে সর্ব প্রথম ওঠেন সেটির নিয়ন্ত্রণ ছিল হিপ্পিদের। বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মই ছিল যাদের জীবনের অংশ। কিন্তু প্রভুপাদের কির্তন ও বিভিন্ন বাদ্য যন্ত্রের বাজনায় আকৃষ্ট হয়ে হিপ্পিরা তার কাছে জড়ো হতে থাকে এবং শিষ্যত্ব গ্রহণ করে স্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করে। একই সঙ্গে স্বামী প্রভুপাদের কৃষ্ণ ভক্তের নতুন ধারার সূচনা ঘটে।

পরে ১৯৭২ সালে তিনি যান রাশিয়াতে এবং সেখানেও তিনি কৃষ্ণ ভক্তির বিভিন্ন নমুনা প্রচার করতে থাকেন। ইসকনের দাবি, বর্তমানে রাশিয়াতে তাদের মন্দিরের সংখ্যা দুই শতাধিক। আর বাংলাদেশে গত এক দশকে মন্দিরের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১টিতে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ছয়টি। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের দিকে এর সংখ্যা ছিল ৩৫টি।

অথচ, ইসকনের কেন্দ্রীয় দপ্তর ভারতের মায়াপুরে এবং এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ শেষ নিঃশ্বাসও ত্যাগ করেছেন ওখানে। সেই গোটা ভারতেই এখন পর্যন্ত ইসকনের মন্দিরের সংখ্যা ৬৪টি। ফলে তুলনামূলক বিচারে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে ইসকনের প্রচার ও প্রসার অনেকটাই বেড়েছে জানিয়ে সংগঠনটির সাবেক সম্পাদক কৃষ্ণ কির্তন আচার্য বলেন, ভারতে হিন্দু বেশি কিন্তু ধার্মিক হিন্দু কম। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে বলে ইসকনের প্রসারটাও বেশি হচ্ছে।

ভারত-বাংলাদেশের তুলনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ভারতে অধিকাংশই রাম ভক্ত। সেখানে বাংলাদেশে ইসকনের মাধ্যমে বাড়ছে কৃষ্ণ ভক্তের সংখ্যা।

ইসকনের দর্শন

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস শ্রী কৃষ্ণ ভগবান যুগে যুগে মর্ত্যে আসেন। আদিকাল থেকে সময়কে অগ্নি, দাপর, ত্রাতা ও কলি- এই চার যুগে ভাগ করে বর্তমান যুগকে তারা কলি যুগ বলছেন। আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে কৃষ্ণের অবতারের মাধ্যমে কলি যুগ শুরু হয়েছে।

তবে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা এসি ভক্তিভেদান্ত প্রভুপাদের বিশ্বাস, প্রায় ৫০০ বছর আগে শ্রী কৃষ্ণ বৃন্দা বনে অবতার হয়েছেন ‘নিমাই সন্যাস’ নাম নিয়ে। ওই সময়ের দর্শনকে তারা ‘শ্রী চৈতন্য মহা প্রভু দর্শন’ বলে মেনে আসছে। ইসকনের মুল ভিত্তি হচ্ছে সেই ‘শ্রী চৈতন্য মহা প্রভু দর্শন’।

ঢাকার স্বামীবাগ আশ্রমে গিয়ে দেখা গেছে গেরুয়া ও সাদা বসনে ন্যাড়া মাথায় এক গোছা চুলের ঝুটি নিয়ে কেউ জপমালা জপছেন, কেউ মন্দিরের কাজ করছেন, কেউ ব্যস্ত সন্ধ্যারতি নিয়ে। যাদের সবাই তরুণ যুবক। কথা বলে জানা গেলো তারা সবাই কম বেশি শিক্ষিত। ইসকনের শর্ত হচ্ছে, দিক্ষা নিতে কেউ আগ্রহী হলে তাকে কমপক্ষে এসএসসি পাস ও বয়সে তরুণ হতে হবে। এই তরুণদের দিয়েই চলছে ইসকনের কৃষ্ণভক্তির প্রচার কাজ। বর্তমানে বাংলাদেশে ইসকনের মোট স্থায়ী বা আজীবন সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। ২০০৩/২০০৪ সালের দিকেও তা ছিল মাত্র ১৯০০ জনের মধ্যে।

এদিকে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে উপস্থিতি রয়েছে হিন্দুদের। কিন্তু কৃষ্ণ ভক্তিই হোক আর পূজা অর্চনাই হোক সব কিছুই বছরের বিশেষ কয়েকটি পূজা যেমন, দূর্গা পুজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা এবং শ্রী কৃষ্ণের জন্মতারিখে পালিত জন্মাষ্টমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও ইসকন এর ব্যাপ্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহর ও গ্রাম সর্বত্রই চোখে পরে ইসকনের ভক্ত ও অনুসারিদের বিশেষ করে যুবক ছেলেরাই কাপড়ের থলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সার্বক্ষণিক ‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ’ বলে জপমালা গুনছে। অথচ, বাংলাদেশর এই অংশে এই প্রক্রিয়ায় উপসনার প্রচলন ছিলোনা।

১৯৯০ সালে ঢাকায় প্রথম ইসকনের আয়োজন করা জগন্নাথ দেবের রথ যাত্রা এখন একটি আলোচিত অনুষ্ঠান। ব্রহ্মচারী ঈশ্বর গৌরহরিদাস জানান, প্রতি বছর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দেশের ৫৪টি জেলায় এক সঙ্গে রথ যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, আয়োজন, লোক সমাগম ও মন্ত্রীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান এখন রথ যাত্রা।

প্রচারের কৌশল

প্রচারনার মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে কির্তন পরিবেশনাকে। স্বামীবাগ আশ্রম ও মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে তাদের কির্তন পরিবেশনার দল। সাথে গীতা থেকে পাঠ ও আলোচনার আয়োজন করছে তারা।

এছাড়া ইসকনের ভক্তরা কৃষ্ণ ভক্ত তৈরির জন্যে সারা দেশে ঘুরে ঘুরে বিষয় ভিত্তিক ছোট ছোট নাটিকা প্রচার করছে। এর আগেও সনাতন ধর্ম প্রচার কাজে যেসব নাটক মঞ্চায়ন করা হতো সেগুলোর সবটাই ছিল মহাভারতের গল্প বা কোন কোন অধ্যায় ভিত্তিক। কিন্তু ইসকন যে সব নাটিকা মঞ্চায়ন করে সেগুলো সমসাময়িক ঘটনা, সমাজ, সংস্কৃতি কেন্দ্রীক। ইসকনের একজন ব্রহ্মচারী বলেন, ‘নাটিকাগুলোর রচনায়, নির্দেশনায় এবং অভিনয়ে আমরাই থাকি। তবে সব সময় মনে রাখতে হয়- আমরা বিনোদনের জন্য করছি না। কৃষ্ণের দর্শন প্রচারের জন্যই কাজ করছি। সেই দিকটিই যাতে ফুটে ওঠে।”

এছাড়া স্বামীবাগ আশ্রম থেক ২৯ বছর ধরে প্রকাশ হচ্ছে মাসিক পত্রিকা ‘হরেকৃষ্ণের সমাচার’ ও ২৩ বছর ধরে প্রকাশ হচ্ছে ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘অমৃতের সন্ধানে’।

উৎসঃ   সাউথ এশিয়ান মনিটর
print

LEAVE A REPLY