লেবাননের সমুদ্র রক্ষায় নৌবাহিনীর ‘বিজয়’

লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন রোধ, তাদের নিরাপত্তা ও সমুদ্রসম্পদ রক্ষায় কাজ করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বিএনএস বিজয়। ভূমধ্যসাগরের পাড়ে অবস্থিত বৈরুত বন্দরে বিজয়ের মাস্তুলে উড়ছে বাংলার গৌরবের লাল সবুজ পতাকা। গত নয় বছর ধরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শত শত নাবিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছয় হাজার নটিক্যাল মাইল দূরের এই আরব দেশটিকে সহায়তা করে আসছে। জাতিসংঘ মেরিটাইম টাস্কফোর্সের (এমটিএফ) আওতায় ২০১০ সাল থেকে লেবাননে দুটি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে প্রতিকূল পরিবেশ জয় করছেন নৌবাহিনীর নাবিকরা। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ১১৬ জন। শত্রু জাহাজ চিহ্নিত ও মোকাবিলা করার মতো রাডার ও মিসাইল বহনকারী এতবড় যুদ্ধজাহাজ লেবাননের নেই। তাদের নৌবাহিনীর শক্তি-সামর্থ্যও সীমিত। এজন্য বাংলাদেশকে আলাদা সমীহের চোখে দেখে সাধারণ  লেবানিজসহ তাদের সরকার। তারা জানে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর শিপইয়ার্ডে এখন এরকম যুদ্ধজাহাজ বানাতেও পারে। ফলে প্রায়  দেড় লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের দেশটিতে গত কয়েক বছরে বাংলদেশকে নতুন করে চিনছে লেবানিজরা। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যদের অক্লান্ত ভূমিকার কারণে লেবাননের মানুষ বাংলাদেশকে আলাদা শ্রদ্ধা ও সমীহের চোখে দেখে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী লেবাননের সমুদ্রসীমায় চোরাচালান রোধ, অনাকাক্সিক্ষত জাহাজ চিহ্নিত করা, প্রয়োজনে অপারেশনে সহায়তা করাসহ বিভিন্নভাবে লেবাননকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নৌবাহিনীর এই অসামান্য বীরত্বগাথা দেখতে দুই বছরের মাথায় আবার এলাম অপূর্ব সৌন্দর্যমি ত দেশ লেবাননে। আগামী মাসে নৌবাহিনীর বর্তমান সদস্যরা দেশে ফিরে যাবেন। তার আগেই যোগ দেবে সমপরিমাণ সদস্যের নতুন টিম।

বিদায়ের আগে কাল  বৈরুত বন্দরে হবে মেডেল প্যারেড। এজন্য নৌবাহিনী সদর দফতর থেকে একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল এসেছে কমোডর মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে। সঙ্গে আছেন কমান্ডার শাহ তারিক মাহমুদ চৌধুরী ও লে. কমান্ডার শহীদ আল আহসান। তিন সদস্যের অডিট টিমের নেতৃত্বে আছেন ক্যাপ্টেন এম শরিফ উদ্দিন ভূইয়া। সঙ্গে আছেন কমান্ডার মোহাম্মদ তৌহিদ সাগর ও পরিচালক হাফিজুর রহমান। এ ছাড়া নৌবাহিনী সদর দফতরের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আবদুল্লাহ আল মারুফের নেতৃত্বে তিন সদস্যের মিডিয়া টিমে আরও আছেন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের টেলিভিশন নিউজ টোয়েন্টিফোরের স্টাফ রিপোর্টার মৌ খন্দকার ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট আদিলুর রহমান মিয়া। বিস্তারিত কর্মসূচির প্রথম দিন গতকাল সকালে বিএনএস বিজয় এ মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এখন বিশে^র টপ র‌্যাঙ্কিং বাহিনী। সারা বিশে^র মাত্র ছয়টি দেশের নেভাল ফোর্স এখানে কাজ করছে। তার মধ্যে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছি। এরপর আমরা যাই লেবাননের নৌসদর দফতরে। লেবানিজ নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল হোসনি দাহের বলেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্দরের নিরাপত্তা, নেভি সদস্যদের প্রশিক্ষণ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ রোধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। লেবানিজ নৌপ্রধানের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমোডর মোজাম্মেল হক বলেন, আমরা বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট পরিচালনা করি। বিশে^র অধিকাংশ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আমাদের এখানে ট্রেনিং নেয়। লেবাননও আরও বেশি সংখ্যক সদস্য বাংলাদেশে পাঠাতে পারে। এ সময় কমান্ডার এম শরিফ উদ্দিন ভূইয়া লেবানিজ নৌবাহিনী প্রধানকে বলেন, বাংলাদেশে আর্মি ও নেভির অনেক রিটায়ার অফিসার আছেন যাদের বয়স ৪০-৫০ বছরের মধ্যে। তারা অত্যন্ত দক্ষ ও কর্মোদ্যমী। তারা লেবাননের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

ব্যানকন-৯ এর কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ও বিএনএস বিজয় এর কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন এম নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের সদস্যরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে জাতিসংঘের অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্পন্ন করি। দুপুরে লেবাননের বাংলাদেশ দূতাবাসে ছিল প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের রাষ্ট্র্রদূত আবদুল মোতালেব সরকার বলেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ দূতাবাস লেবাননে বাংলাদেশের ইমেজ বৃদ্ধিতে কাজ করছে। একসময় প্রবাসীদের খুব খারাপ অবস্থা ছিল এখানে। বর্তমানে তারা দূতাবাস ও নৌবাহিনীর ভূমিকার কারণে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করছে। লেবানিজদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নীত করতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এরপর আমরা জাতিসংঘের মেরিটাইম টাস্কফোর্সের (এমটিএফ) কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলি। ট্রাস্কফোর্স কমান্ডার ব্রাজিল নেভির রিয়ার অ্যাডমিরাল এডওয়ার্ড অগস্টো উইল্যান্ড বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ নেভি এখানে চমৎকার কাজ করছে। আমরা তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। উল্লেখ্য, প্রথম ২০১০ সালে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ওসমান ও মধুমতি লেবাননের শান্তিরক্ষা মিশনে (ইউনিফিল) অংশ নেয়। জাতিসংঘের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা নিয়ে ভূমধ্যসাগরে টহল দিত বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

ইসরায়েলের জলসীমার কাছে নিয়মিত মহড়ায় অংশ নিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১৯৯৩ সাল থেকে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশ্ব শান্তি রক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বর্তমানে লেবাননে দায়িত্ব পালন করছে বিএনএস বিজয়। লেবাননে বাংলাদেশ, ব্রাজিল, জার্মানি, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া তুরস্ক-এই ৬টি  দেশ জাতিসংঘ মেরিটাইম টাস্কফোর্সের হয়ে কাজ করছে। তার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী এগিয়ে রয়েছে সবার চেয়ে বেশি।

print

LEAVE A REPLY