১৫০০ কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে নানা প্রশ্ন

সারা দেশের ৬২০০ সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের দরপত্র নিয়ে চলছে নানা কথা। রাতে টেন্ডার ডকুমেন্ট পাঠিয়ে এক দিনেই সব দরপত্র বিক্রি দেখানো হয়। তবে দরপত্র জমা পড়ার হার হতাশাজনক। এখন চলছে দরপত্র যাচাই-বাছাই পরবর্তী কার্যক্রম। তড়িঘড়ি করে দেড় হাজার কোটি টাকার এসব সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পকে অনেকে পকেট ভারির প্রকল্প বলে মনে করছেন। এসব সেতুর মান কেমন হবে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন শুরু হয়েছে। প্রভাবশালীরা এসব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করায় সেতুগুলো আদতে হবে কিনা এনিয়েও রয়েছে হাজারো প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবেক চার দলীয় জোট সরকারের আমলে সারা দেশে অহেতুক কিছু সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছিল।

মিডিয়ার রিপোর্টে দেখা যায়, রাস্তা নেই, অথচ ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এবারও কি ওই রকম কিছু হবে? অভিযোগ রয়েছে, অনেক ঠিকাদার ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ দরপত্রের বিষয়ে কিছুই জানতে পারেননি। আবার যাঁরা জেনেছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে দরপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রভাবশালীদের কারণে দরপত্র কিনতে পারেননি। এ নিয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দেয়। সাধারণ ঠিকাদাররা জানান, মাত্র এক দিন সময় দেয়ায় অনেক ঠিকাদার দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি। এ সুযোগে প্রভাবশালী একটি মহল দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করছে।

দেশের বিভিন্ন উপজেলায় দরপত্র কিনতেই পারেননি সাধারণ ঠিকাদাররা। তারা জানান, এক দিন সময় দিয়ে কোনো দরপত্রের কার্যক্রম আগে হয়নি। এতে সাধারণ ঠিকাদাররা বেকায়দায় পড়েন। কাজ নিয়ে চরম নয়ছয় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন ‘গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু বা কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের’ আওতায় ১২ই মে একটি দরপত্র বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে সারা দেশের ৬৪ টি জেলার ৪৯২ টি উপজেলায় সেতু নির্মাণের কথা বলা হয়। সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে (এলটিএম) এ টেন্ডার আহবান করা হয়। দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, দরপত্র প্রচারের তারিখ ১৩ই মে বৃহস্পতিবার। পরের দুই দিন ১৪ ও ১৫ই মে সরকারি ছুটি।

এরপর দরপত্র বিক্রির শেষ তারিখ হিসেবে ১৬ ই মে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। ওই হিসেবে এক দিন দরপত্র বিক্রি করা হয়। দরপত্র গ্রহণের তারিখ ১৭ ই মে বেলা একটা পর্যন্ত নির্ধারণ করা ছিল। একই দিন বেলা চারটায় ঠিকাদারদের সামনে দরপত্র ডকুমেন্ট খোলা হয়। জেলা এবং উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ১৩ ই মে বৃহস্পতিবার সেতুর কথা উল্লেখ করে স্পেশাল মেসেজ (বিশেষ বার্তা) পাঠানো হয়। ওই বার্তায় ১৬ ই মে একদিন দরপত্র ডকুমেন্ট বিক্রির কথা জানানো হয়। এ রকম বিশেষ বার্তার চিঠি এর আগে কখনো পাননি বলে মানবজমিনকে জানান তারা। কুষ্টিয়া জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে জেলার ছয়টি উপজেলায় গ্রামীণ রাস্তায় সর্বোচ্চ ১৫ মিটার দীর্ঘ ১০৩টি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ আসে। ১২ ই মে রাতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে এ চিঠি দেয়া হয়। মাত্র এক দিনের মধ্যে সব প্রক্রিয়া শেষ করতে বলা হয়।

এর মধ্যে কুষ্টিয়া সদরে ২০টি, মিরপুরে ২৬টি, ভেড়ামারায় ৬টি, খোকসায় ১৩টি, দৌলতপুরে ২০টি ও কুমারখালী উপজেলায় ১৮টি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা টাকা। কুষ্টিয়া উপজেলার এক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জানান, কমপক্ষে ১০ দিন আগে টেন্ডার সংক্রান্ত এ ধরনের চিঠি আসে। সময় দিয়ে এসব কাজ করতে হয়। না হলে নানা সমস্যা হয়। এক দিনের মধ্যে এত কিছু করা, এবারই প্রথম দেখলাম। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বুরো সূত্রে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৭টি সেতু বা কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের বিপরীতে সিডিউল বিক্রি হয় ৩০৪টি। টেন্ডার সিডিউল সংখ্যায় অনেক হলেও এগুলো জমা দেয়া নিয়ে সরকার দলীয় লোকজনের মধ্যে দরকষাকষির অভিযোগ রয়েছে। ২৬টি ঠিকাদারি লাইসেন্সের বিপরীতে বিক্রি হয় ৩০৪টি সিডিউল। তবে সব সিডিউল বিক্রি হয়নি। সারা দেশে একই চিত্র পাওয়া গেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এবং ‘গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু বা কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের’ প্রকল্প পরিচালক মানবজমিনকে বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে তিন বছরে সারা দেশে ১৩ হাজার সেতু নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে বর্তমান অর্থ বছরে ছয় হাজারের কিছু বেশি সেতু নির্মাণ করা হবে। এসব সেতু নির্মাণ করতে লাগবে দেড় হাজার কোটি টাকা।

mzamin

print

LEAVE A REPLY