সংসদ নির্বাচনে ২১৩ কেন্দ্রে শতভাগ ভোট, রাষ্ট্রপতির কাছে তদন্তের দাবি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে ‘বিস্ময়করভাবে শতভাগ ভোট পড়ার অনিয়ম’ তদন্তে রাষ্ট্রপ্রতি মো. আবদুল হামিদের প্রতি দাবি জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। এজন্য রাষ্ট্রপতিকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানান সুজন নেতৃবৃন্দ।

মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন থেকে দাবি জানান তারা।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুজন-সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান।

উপস্থিত ছিলেন সুজন-সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজন নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. তোফায়েল আহমেদ এবং ড. শাহদীন মালিক প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করেছি যে, ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার জন্য নির্ধারিত ৪০ হাজার ১৫৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। ৯৯% ভোট পড়েছে ১২৭ ভোটকেন্দ্রে, ৯৮% ভোট পড়েছে ২০৪টি ভোটকেন্দ্রে, ৯৭% ভোট পড়েছে ৩৫৮ ভোটকেন্দ্রে এবং ৯৬% ভোট পড়েছে ৫১৬ ভোটকেন্দ্রে। অর্থাৎ ৯৬-১০০% ভোট পড়েছে ১ হাজার ৪১৮টি কেন্দ্রে। এছাড়াও ৯০-৯৫ শতাংশ ভোট পড়েছে ৬ হাজার ৪৮৪ টি ভোটকেন্দ্রে, ৮০-৮৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১৫ হাজার ৭১৯টি ভোটকেন্দ্রে, ৭০-৭৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১০ হাজার ৭৩টি ভোটকেন্দ্রে।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮৭.১৩% ভোট পড়েছিল এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ৪০.০৪% ভোট পড়েছিল।

এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়, ভোটের জন্য নির্ধারিত সময়ে শতভাগ ভোটপড়া কি সম্ভব?’

তিনি বলেন, ‘শতভাগ ভোট পড়া কেন্দ্রসমূহ সম্পর্কে দলভিত্তিক অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় যে, ২১৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮১টি (৮৪.৯৭%) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে বিজয়ী ৯০ জন সংসদ সদস্যের, ২১টি (৯.৮৫%) জাতীয় পার্টি থেকে বিজয়ী ১০ জন সংসদ সদস্যের, ৮টি (৩.৭৫%) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে বিজয়ী ১ জন সংসদ সদস্যের, ২টি (০.৯৩%) বিকল্পধারা বাংলাদেশ থেকে বিজয়ী ১ জন সংসদ সদস্যের এবং ১টি (০.৪৬%) জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে বিজয়ী ১ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী আওতাভুক্ত।

যে ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, তাতে ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, নৌকা প্রতীকে ভোট পড়েছে বৈধ ভোটের ৭১.৮৩%, ধানের শীষ প্রতীকে পড়েছে ১৪.৬৩%, লাঙ্গল প্রতীকে পড়েছে ৭.১৯%, হাতপাখা প্রতীকে পড়েছে ১.১৭%, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ২.৪৪% এবং অন্যান্য দলসমূহ পেয়েছে ১ শতাংশের কম।’

দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘বিশ্লেষণে আরও দেখা গিয়েছে যে, ৭৫টি আসনের ৫৮৭টি কেন্দ্রের সকল (১০০%) বৈধ ভোট শুধুমাত্র একজন করে প্রার্থী পেয়েছেন। অন্য কোনো প্রার্থী ১ ভোটও পাননি। এই ৫৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫৮৬টিতে (৯৯.৮৩) সকল ভোট পেয়েছেন নৌকা প্রতীকের এবং ১টি কেন্দ্রের (০.১৭%) সকল ভোট পেয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী। এই ৭৫টি আসনের ৭৪টিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এবং ১টিতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধিক হারে ভোট পড়াকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন। অনেকের মতে নির্বাচনের দিনের চিত্রের সাথে ৫৮.৮২% ভোটকেন্দ্রে (২৩,৬২১টি) ৮০% এর অধিক ভোট পড়া স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তার পরেও দেখা যায় ৯০% এর অধিক ভোটপড়া কেন্দ্রের শতকরা হার ১৯.৬৭% (৭,৯০২টি) এবং শতভাগ ভোটপড়া কেন্দ্রের শতকরা হার ০.৫৩% (২১৩টি)।’

দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘কোনো ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার বিষয়টি যৌক্তিকও নয়, কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্যও নয়। কেননা তালিকাভূক্ত ভোটারের মৃত্যুবরণ, দেশের বাইরে অবস্থান, জরুরি কাজে এলাকার বাইরে অবস্থান, অসুস্থতা ইত্যাদি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তাই ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া যে কোনো যুক্তিতেই স্বাভাবিক নয়।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদাও একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন যে, শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের করার কিছু নেই।

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, যেহেতু শতভাগ ভোটের মধ্যে বাতিল ভোটও রয়েছে, তাই এটাকে শতভাগ ভোট পড়া বলা যাবে না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছেন।’

তিনি বলেন, আমরা জানি যে, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। দেশে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ তথা সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কোনোভাবেই এ কথা বলতে পারেন না। কেননা আমাদের সর্বোচ্চ আদালত (আপিল বিভাগ) একাধিক রায়ে নিশ্চিত করে বলেছে, ‘নির্বাচন ফেয়ার, জাস্টলি ও অনেস্টলি’ হলো কিনা তা খতিয়ে দেখার দায় নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশন যদি সন্তুষ্ট হয় যে, নির্বাচন অবাধ হয়নি, তবে কমিশনের ক্ষমতা আছে গোটা নির্বাচন তদন্ত সাপেক্ষে বাতিল করা এবং নতুন করে নির্বাচন করার।

তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনে অধিক হারে ভোট পড়া কেন্দ্রের সংখ্যা বেশি হলেও স্বল্প সংখ্যক ভোট পড়ার চিত্রও উল্লেখযোগ্য। দেখা গেছে যে, মোট ৯৩১ ভোটকেন্দ্রে (২.৩১%) ৫০% শতাংশের কম ভোট পড়েছে।

বিশ্লেষণে নিম্ন হারে ভোট পড়ার বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরও দেখা যায় যে, ৫টি আসনের ১১টি ভোটকেন্দ্রে ৫%-এর কম, ১০টি আসনের ২০টি ভোটকেন্দ্রে ৬-১৯%, ৪৮টি আসনের ৩০১টি ভোটকেন্দ্রে ২০-৩৯% এবং ৫৯৯ ভোটকেন্দ্রে ৪০-৪৯% ভোট পড়েছে।

দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ভোটপ্রাপ্তির দিক থেকে এই দুই জোটের মধ্যে ব্যাপক ফারাক লক্ষ করা যায়। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের ভোট প্রাপ্তির দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, ১,২৮৫টি কেন্দ্রে (৩.২০%) তারা কোনো ভোট পাননি (০ ভোট), নৌকা প্রতীকের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা মাত্র ২টি কেন্দ্র (০.০০০৪%)।

ধানের শীষের প্রার্থীরা ১% এর কম ভোট পেয়েছেন ৬,০৭৫টি (১৫.১৩%) ভোটকেন্দ্রে, পক্ষান্তরে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ১%-এর কম ভোট পেয়েছেন ২২টি (০.০৫%) ভোটকেন্দ্রে; ধানের শীষের প্রার্থীরা ২% ভোট পেয়েছেন ২,৫৩৫টি (৬.৩১%) ভোটকেন্দ্র্রে, পক্ষান্তরে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ২% ভোট পেয়েছেন ২৯টি (০.০৭%) ভোটকেন্দ্রে; ধানের শীষের প্রার্থীরা ৩% ভোট পেয়েছেন ১,৮৪৭টি (৪.৬%) ভোটকেন্দ্রে, পক্ষান্তরে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৩% ভোট পেয়েছেন ২৩টি (০.০৬%) ভোটকেন্দ্রে; ধানের শীষের প্রার্থীরা ৮১-৯০% ভোট পেয়েছেন ১৩৯টি (০.৩৫%) ভোটকেন্দ্রে, পক্ষান্তরে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৮১-৯০% ভোট পেয়েছেন ৬,০৭৭টি (১৫.১৩%) ভোটকেন্দ্রে; ধানের শীষের প্রার্থীরা ৯১-৯৯% ভোট পেয়েছেন ১৫টি (০.০৪%) ভোটকেন্দ্রে, পক্ষান্তরে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৯১-৯৯% ভোট পেয়েছেন ১৩,৮২৪টি (৩৪.৪৩%) ভোটকেন্দ্রে; ধানের শীষের প্রার্থীরা ১০০% ভোট পেয়েছেন ১টি (০.০০২%) ভোটকেন্দ্রে, পক্ষান্তরে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ১০০% ভোট পেয়েছেন ৫৮৬টি (১.৪৬%) ভোটকেন্দ্রে।

তিনি বলেন, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ১৮টি আসনে টানা ৪টি নির্বাচনে (১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ব্যতীত) বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২টি আসন ব্যতীত উক্ত আসনসমূহে বিএনপি প্রার্থীদের স্বল্প সংখ্যক ভোট প্রাপ্তি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকের মাঝেই প্রশ্ন জেগেছে, ঐ সকল এলাকার ভোটারদের মনস্তত্ব কি রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে গেল?’

তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফলাফল নিয়ে শুধু প্রশ্নই ওঠেনি, প্রাথমিক ফলাফলের সাথে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে কিছুটা অমিলও পরিলক্ষিত হয়েছে। আমরা সুজন-এর পক্ষ থেকে নির্বাচনের পর পরই রিটার্নিং অফিসার স্বাক্ষরিত আসনভিত্তিক ফলাফল সংগ্রহ করেছিলাম। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রকাশের পর পূর্বে প্রাপ্ত ফলাফলের সাথে কিছু আসনে পার্থক্য লক্ষ করা গিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘৬টি আসনে ইভিএম-এ ভোট পড়ার গড় ছিল-৫১.৪২%। তুলনা করলে দেখা যায়, ৩০০ আসনে গড়ে ৮০.২০% ভোট পড়লেও ইভিএম-এ ভোট পড়ার গড়-৫১.৪২%। ব্যালট পেপারে ভোট হয়েছে ২৯৪টি আসনে, সেখানে গড়ে ভোট পড়েছে ৮০.৮০%। দেখা যাচ্ছে যে, ৩০০ আসনের গড়ের সাথে ইভিএমএ গড়ের পার্থক্য ২৮.৭৮%। ব্যালট পেপারে ভোট হয়েছে যে ২৯৪টি আসনে তার সাথে ইভিএমএ ভোটের পার্থক্য ২৯.৩৮%। সকল আসনে নৌকা প্রতীকের ভোট প্রাপ্তির গড় ৭৬.৮৬% হলেও ইভিএম-এ ৫৪.৪৩%। একইভাবে সকল আসনে ধানের শীষ প্রতীকের ভোট প্রাপ্তির গড় ১৩.৩০% হলেও ইভিএম-এ ১৮.০১%। দেখা যায় যে, জাতীয় গড়ের তুলনায় ইভিএম-এ নৌকা প্রতীকে ভোট ২২.৪৩% কম এবং ধানের শীষে ৪.৭১% বেশি পড়েছে। ইভিএম-এ ভোটপড়ার হার কেন কম, এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা থাকা উচিৎ ছিল। ইভিএম ব্যবহারের ফলে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করতে না পারার কারণেই কি এমনটা ঘটেছে?’

উৎসঃ   পরিবর্তন
print

LEAVE A REPLY