পানিতে ভাসছে চট্টগ্রাম: প্রতিদিন ক্ষতি শত কোটি টাকা

পানিতে ভাসছে বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত চট্টগ্রামের চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ এলাকা। এতে করে নগরীর ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন শত কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে গত ৮ই জুলাই থেকে চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় বৃষ্টির পানি জমে পুরো চট্টগ্রামের সঙ্গে দেশের সর্ববৃহৎ পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের অধিকাংশ দোকানপাট ডুবে যায়। রোববার বৃষ্টি কমে আসার পর পানি নেমে গেলেও দুপুর ২টার দিকে আবার প্রবল বৃষ্টি ও বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ এলাকা। সোমবার দিনভর কোনো বৃষ্টি না হলেও দুপুর ২টার দিকে আবারো চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পুরো এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি সোলায়মান বাদশা জানান, রোববার ও সোমবার দু’দিন জোয়ারের পানিতে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ৯০ শতাংশেরও বেশি দোকান ও আড়ত পানিতে তলিয়ে যায়।

এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পিয়াজ, রসুন, আদা এবং মসলাসহ বিভিন্ন পণ্য পানিতে নষ্ট হয়ে প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে প্রতিদিন ১ হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার কোটি টাকার মতো লেনদেন হয়। কিন্তু জোয়ারের কারণে তা কমে ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, চাক্তাই খাল একসময় পণ্য পরিবহনে বাণিজ্যিক লাইফলাইন ছিল। কিন্তু আজ তা পরিণত হয়েছে ব্যবসায়ীদের মরণফাঁদে। গত ৪-৫ বছর ধরে এ খাল দিয়ে জোয়ারের পানি উঠে। কিন্তু নামে না। আবর্জনায় খালের তলদেশ প্রায় ১০ ফুটের মতো ভরাট হয়ে গেছে। এতে জোয়ারের পানি খাল উপচে বাজারে প্রবেশ করে। ফলে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পুরো বাজার থাকে পানির নিচে। এ সময় বাজারে পণ্য নিয়ে কোনো যানবাহন তো আসতেই পারে না। খুচরা ব্যবসায়ীদেরও পণ্য কিনতে আসা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তিনি আরো বলেন, চলতি পূর্ণিমা তিথিতে আগামী আরো ১৫ দিন প্রবল জোয়ার সৃষ্টি হতে পারে। এতে প্রতি বছর বর্ষার সবরকম ক্ষয়ক্ষতির রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবার আশঙ্কায় দিনাতিপাত করছে পাইকারি ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা। সরজমিন দেখা যায়, জোয়ারের সময় খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ বাজার, আমির মার্কেট, আসাদগঞ্জ, শুঁটকিপট্টি এবং কোরবানিগঞ্জের দোকানগুলোতে পানি থৈ থৈ করছে। ব্যবসায়ীরা দোকানের পণ্য রক্ষায় ব্যস্ত। নেই কোনোরকম কেনাকাটা। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমদ বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ৫ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। জোয়ারের কারণে এখানকার ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন। বেচা-বিক্রি নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, জোয়ারের পানি যেন এখানকার ব্যবসাকে প্রভাবিত করতে না পারে এজন্য কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। আরএস জরিপের গভীরতা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। কর্ণফুলীর নদীর শাখা-প্রশাখার খালগুলো খনন করা প্রয়োজন। খাতুনগঞ্জের ড্রেনগুলো প্রশস্ত করলে জোয়ারের পানি থেকে ব্যবসায়ীরা রক্ষা পেতে পারেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ করছে সিডিএ। ২০১৮ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজ এক বছরে মাত্র ১৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১৬টি খালের আবর্জনা পরিষ্কার ও খননের কাজ। বন্যার পানি সংরক্ষণে ৩টি জলাধার, ৬টি আরসিসি কালভার্ট প্রতিস্থাপন, ৫টি টাইডাল রেগুলেটর, ১২টি পাম্প হাউস স্থাপন, ৪২টি সিল্টট্রেপ স্থাপন, ২০০টি ক্রস ড্রেন কালভার্ট নির্মাণ। ১৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার রোড সাইড ড্রেনের সমপ্রসারণ, ২ হাজার বৈদ্যুতিক পুল স্থানান্তর, ৮৮০টি স্ট্রিট লাইট স্থাপন এবং ৯২টি ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের কথা রয়েছে।

উৎসঃ   মানবজমিন
print

LEAVE A REPLY