‘হবিগঞ্জে জমির জন্য ভাতিজাকে খুন’

হবিগঞ্জে এক খণ্ড জমির জন্য ভাতিজা দুলাল মিয়াকে খুন করে নদীতে মরদেহ ফেলে দেন চাচা সাদেক মিয়া। পরে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসেবে ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে দাফন করে। কিন্তু এক কিশোরের তোলা মাইক্রোবাসের ছবির ওপর ভিত্তি করে হত্যা রহস্য উদঘাটন করল চুনারুঘাট পুলিশ।

এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুইজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। আর অপর দুই পেশাদার খুনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নজরদারিতে রাখা হয়েছে সাদেক মিয়াকে।

বুধবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা।

আসামিদের দেয়া স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, চুনারুঘাট উপজেলার পাট্টাশরিফ গ্রামের দুলাল মিয়া তার চাচা সাদেক মিয়ার বাড়ির সামনের ৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। জমিটির ওপর সাদেক মিয়ার লোভ ছিল। জমিটি পেতে তিনি ভাতিজার বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমাও করেন। শেষ পর্যন্ত কোনো ফল না পেয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ঢাকায় তার পরিচিত কিলারদের সঙ্গে কথা বলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৭ জুন একটি মাইক্রোবাসযোগে কিলারদের চুনারুঘাটের পাট্টাশরিফ গ্রামে পাঠানো হয়। সেখানে তাদের সহযোগিতা করে সাদেক মিয়ার ভাগনে আফরাজ মিয়া।

ঘটনার সময় হত্যার শিকার দুলাল মিয়া একটি টমটমযোগে (ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক) স্থানীয় শাকির মোহাম্মদ বাজারে যাচ্ছিলেন। পথে আসামিরা তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে অপহরণ করে নেয়। এ সময় গ্রামে মাইক্রোবাস দেখে এক কিশোর গাড়িটির ছবি তুলে। পথে দুলা মিয়া পানি পান করতে চাইলে তাতে ঘুমের বড়ি মিশিয়ে খাইয়ে দেয়া হয়। পরে ঢাকার হাজারীবাগে সিকদার মেডিকেলের পেছনে নিয়ে গলায় দড়ি দিয়ে হত্যার পর মরদেহ বস্তায় ভরে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয় তারা। পরে ১৮ জুন নদীতে মরদেহ পড়ে আছে খবর পেয়ে হাজারীবাগ থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় না পেয়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে অজ্ঞাতনামা হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে দুলাল মিয়াকে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় হাজারীবাগ থানায় পুলিশ একটি হত্যা মামলা করে। এর আগে ১৯ জুন নিহত দুলাল মিয়ার ছোট ভাই ইদু মিয়া বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে চুনারুঘাট থানায় অপহরণ মামলা করেন। নিহত দুলাল মিয়া পাঁচ মেয়ের জনক।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা আরও জানান, অপহরণ মামলাটির খবর নেয়ার পর নিহতের পরিবারের অবস্থা জেনে বিষয়টি তাকে বেশ পীড়া দিয়েছে। কোনো ক্লু না পেয়ে মানসিকভাবে বেশ অশান্তিতেও ছিলেন। তিনি তদন্তটি সম্পূর্ণ নিজে তত্ত্বাবধান করেন। অবশেষে ওই গ্রামের এক কিশোরের তোলা গাড়ির ছবির বিষয়টি জানতে পারেন। তার কাছ থেকে ছবি নিয়ে মহাসড়কে বিভিন্ন টোল প্লাজার সিসি টিভির ফোটেজ সংগ্রহ করা হয়। ভৈরব সেতুর সিসি টিভির ফুটেজে পাওয়া একটি গাড়ির সঙ্গে ছবির গাড়িটির মিল পাওয়া যায়। সে সূত্র ধরে চুনারুঘাট থানার অফিসার ওসি শেখ নাজমুল হকের নেতৃত্বে ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নাজমুল ইসলামসহ একদল পুলিশ মাইক্রোবাসের চালক ভোলা জেলার লালমোহন থানার টিটিয়া গ্রামের ইউসুফ সরদারকে ১৪ জুলাই ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী ঢাকার রায়ের বাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ থানার টামনিকোনাপাড়া গ্রামের মামুন মিয়াকে।

তারা উভয়েই ১৫ জুলাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ১৬ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয় ভাড়াটিয়া খুনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের জসিম উদ্দিন ও বরিশালের গৌরনদী উপজেলার গৌরবর্ধন গ্রামের শামীম সরদারকে।

এর আগে ৩০ জুন সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল অপহরণের অন্যতম সহযোগী সাদেক মিয়ার ভাগনে আফরাজ মিয়াকে।

চুনারুঘাট থানার ওসি শেখ নাজমুল হক জানান, আমি মাত্র কয়েকদিন হয় এই থানায় যোগদান করেছি। যোগদানের পর পরই পুলিশের সুপারের দিক নির্দেশনা মতে এই অপহরণ রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামি। মাত্র ৭২ ঘন্টার মধ্যেই অপহরণের পর হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হই। একই সাথে সংশ্লিষ্ট সকল অপরাধীদের গ্রেপ্তার করি। এর সাথে আরো কেউ জড়িত আছে কিনা তাও গুরুত্বসহ দেখা হচ্ছে।

ঢা-টা

print

LEAVE A REPLY