১ ঘণ্টার মধ্যে বনি ইসরাইলের ৭০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল

প্লেগ রোগের মহামারীতে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে বনি ইসরাইল জাতির ৭০ হাজার লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল। পাপিষ্ঠ ফেরাউন ও নমরুদকে আল্লাহ তখনই ধরেছেন, যখন সে নিজেকে প্রভু বলে দাবি করেছে। আদ, সামুদ প্রভৃতি জাতিকে তাদের সীমাহীন পাপাচারের কারণে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

এ কারনেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্তক করে দিয়েছেন যে, “যখন সরকারি মালকে নিজের মাল মনে করা হয়, আমানতের মালকে নিজের মালের মতো ব্যবহার করা হয়, জাকাতকে জরিমানা মনে করা হয়, ইসলামী আকিদাবর্জিত বিদ্যা শিক্ষা করা হয়, পুরুষ স্ত্রীর অনুগত হয়, মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়, বন্ধুদের আপন মনে করা হয়, বাবাকে পর ভাবা হয়, মসজিদে শোরগোল করা হয়, পাপী লোক গোত্রের নেতা হয়, অসৎ ও নিকৃষ্ট লোক জাতির চালক হয়, ক্ষতির ভয়ে কোনো লোককে সম্মান করা হয়, গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন অধিক হয়, মদ্য পানের আধিক্য ঘটে, পরবর্তী সময় লোকেরা পূর্ববর্তী লোকদের বদনাম করে—তখন যেন তারা অপেক্ষা করে লু হাওয়া (গরম বাতাস), ভূমিকম্প, ভূমিধস, মানব আকৃতি বিকৃতি, শিলাবৃষ্টি, রক্তবৃষ্টি ইত্যাদি কঠিন আজাবের।যা একটার পর আরেকটা আসতে থাকবে।যেমন হারের সুতা ছিঁড়ে গেলে মুক্তার দানাগুলো একটার পর একটা পড়তে থাকে।” (তিরমিজি)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “কোনো সম্প্রদায়ে জিনা-ব্যভিচার বৃদ্ধি পেলে তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায়।” (মুয়াত্তা মালেক, মিশকাত : পৃ. ৪৫৯)

এখন স্বভাবতই আমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে।সাম্প্রতিককালে যেহারে দেশব্যাপী ধর্ষণ, গণধর্ষন, ব্যভিচার, পর্ণো আসক্তি, পরকীয়া ও অবাধ যৌনাচার চলছে। এই মহামারী কি আমাদের পাপের গজব? প্রশ্ন আসতে পারে। আল্লাহ কেন এই নিরপরাধ মানুষগুলোকে এভাবে যন্ত্রণা দিলেন। কষ্ট দিলেন, মৃত্যু দিলেন?

ঠিক এই রকমের মুহুর্তগুলির জন্যই শয়তান অপেক্ষা করে। শয়তান তো এটাই চায় যে, এই সব প্রশ্ন যাতে আমাদের অন্তরে জাগ্রত হয়।

আর আমাদের ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে এবং ঈমানী দূর্বলতার কারনে আমরা বুঝতে পারি না, কোনটা গজব আর কোনটা পরীক্ষা! আল্লাহ আমাদেরকে যে বিপদগুলি দেন সেগুলি দুই ধরনের। এক হলো শাস্তি, যেটাকে আমরা অনেক সময় ‘গজব’ বলি। আর দ্বিতীয়টা হলো পরীক্ষা।

আল্লাহ মানুষের উপর তখনই গজব পাঠান যখন মানুষ পাপ কাজ করে। অন্যদিকে, আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে। এই পরীক্ষাও দুই ভাবে আসে। অনেক সময় সুখের আকারে আসে। আবার অনেক সময় আসে বিপদের আকারে।

গজব প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা কোরআনে বলেন: “তোমার যা কিছু মঙ্গল হয় তা আল্লাহর তরফ থেকে আসে, কিন্তু তোমার যা কিছু অমঙ্গল হয় তা তোমার নিজের কারণেই।” – (সূরা নিসা:৭৯)
“তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন (অর্থাৎ না হলে তোমাদের আরো অনেক বিপদ আসত)।” – (সূরা শূরা:৩০)

অন্যদিকে আল্লাহর পরীক্ষা সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: “আল্লাহ যখন কাউকে ভালবাসেন, তখন তাকে পরীক্ষা করেন। যার ধৈর্য আছে, সে ধৈর্য ধরবে। আর যে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে।” (আহমাদ)

যদি আপনি আল্লাহর কোনও হুকুম পালন করতে যেয়ে বিপদের সম্মুখীন হোন তো এটা ‘পরীক্ষা’। অন্যদিকে, যদি আপনি কোনও পাপ কাজ করতে যেয়ে বিপদে পড়েন তাহলে এটা আল্লাহর ‘গজব’। আবার, একই ঘটনা একজনের জন্য গজব আর আরেকজনের জন্য পরীক্ষা হতে পারে। যেমন – ডেঙ্গু দূর্নীতিবাজ দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য গজব। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের জন্য হয়তো আল্লাহর তরফ থেকে পরীক্ষা।

একটা উদাহরণ দেই। আপনি যেমন দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আপনার বাচ্চাটাকে টিকা দিয়ে সাময়িকভাবে কষ্টের মধ্যে ফেলেন। দয়াময় আল্লাহও ঠিক তেমনিভাবে মু’মিন বান্দাদের এবং অনেক ক্ষেত্রে অবুঝ শিশুদেরকেও ভয়ংকর অসুখ দেন। কষ্ট দেন। এর ফলে তারা এই ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীতে কিছুদিনের জন্য হয়ত কষ্ট করবে। কিন্তু এর বিনিময়ে পাবে চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই, ডেঙ্গু মহামারীতে পড়ে যে সব মুসলমান নিহত হয়েছেন ইনশাআল্লাহ তাঁরা শহীদের মর্যাদা পাবেন এবং পরকালে জান্নাতবাসী হবেন। আর যারা আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন। আল্লাহ তাদের সব গুনাহ মাফ করে তাদেরকে নিষ্পাপ করে দিচ্ছেন।

কেননা, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন – “যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয় সে শহীদ, যে ব্যক্তি ভবন ধ্বসে মারা যায় সে শহীদ, যে ব্যক্তি মহামারীতে মারা যায় সে শহীদ, যে ব্যক্তি পেটের পীড়ায় মারা যায় সে শহীদ, যে ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যায় সে শহীদ।” (মুসলিম, মিশকাতঃ ৩৮১১)

“কোনও ঈমানদারের উপর যখন কোনো ক্লান্তি, অসুখ, দু:খ, বেদনা, আঘাত, যন্ত্রণা আসে, এমনকি তার যদি একটা কাঁটার খোঁচাও লাগে – এর জন্যও আল্লাহ তার কিছু গুনাহ মাফ করে দেন।” (সহীহ বুখারী)

আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজেদের পাপের জন্য তওবা করি। প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। পাপের রাস্তা থেকে ফিরে আসি। ডেঙ্গু মহামারী মোকাবেলায় নিজেদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করি। আক্রান্তদের জন্য দু’আ করি। সেবা করি। দোষী ব্যক্তিদের যাতে শাস্তি হয়, সেই বিচারের জোড় দাবী জানাই। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো, এই মানুষগুলোর কষ্ট, মানুষগুলোর মৃত্যু থেকে শিক্ষাগ্রহণ করি। আমি-আপনিও যে কোন সময় হয়তো হাসপাতাল থেকে আর বাসায় না ফিরতে পারি। আমার আপনার সবচেয়ে প্রিয় কেউ। সবচেয়ে আপনজন যাতে এই মরণঘাতি মহামারীর শিকার না হয়- সেই দোয়া চাই। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। এটা আমাদের সবার জন্য চরমতম পরীক্ষার সময়। মানুষের মৃত্যু নিয়ে হাসিঠাট্টা ও লোকদেখানো হাস্যরস করার সময় নয়। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।

print

LEAVE A REPLY