কাশ্মীরের ভারতভুক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বিজয়

গত দুই সপ্তাহ ধরে ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য কাশ্মীর অস্তিত্বহীনতার এক পরাবাস্তব পর্যায়ে অবস্থান করছে। প্রেসিডেন্টের এক ডিক্রিতে রাজ্যটি বিলুপ্ত হয়েছে। বাতিল হয়েছে স্বায়ত্তশাসন। রাজ্যটিকে দু’টুকরো করা হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ, মোবাইল নেটওয়ার্ক অকেজো করে সীমান্ত পারাপারও বন্ধ হয়ে গেছে।
কাশ্মীরে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করে কারফিউ জারি রয়েছে। কিছু কিছু গ্রামে প্রতিটি বাড়ির সামনে একজন করে সৈন্য অবস্থান করছে। এভাবে রাজ্যের ৮০ লাখ মানুষকে বিশ্ব এবং পরস্পরের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। রাজ্যের ফার্মেসীগুলোতে ওষুধ নেই। ঘরে খাবার নেই। হাসপাতালগুলো আহত রোগীতে পূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জোর দিয়ে বলছেন, এ সবই কাশ্মীরীদের কল্যাণের জন্য করা হচ্ছে। কাশ্মীরের উপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ বরাবরই জোরালো ছিল আর কাশ্মীরীদের উপর ছিল কঠোর নজরদারি।
কাশ্মীরকে গ্রাস করার আকস্মিক পদক্ষেপ হচ্ছে ভারতকে এক জাতি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। মোদির স্বপ্নের কাছে একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটিকে আত্মসমর্পণ করানোর মাধ্যমে সুদীর্ঘদিনের মতাদর্শগত অভিসন্ধি পূরণ। একই সাথে তা হচ্ছে বাকি ভারতকে এ কথা জানিয়ে দেয়া যে উপমহাদেশে তিনি যে হিন্দু শক্তি-স্বর্গ প্রতিষ্ঠা করতে চান যে তা থেকে বিভিন্ন রাজ্যের এ ইউনিয়নের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। কোনো রাজ্য যদি এ স্বপ্ন থেকে দূরে সরে যেতে চায় তবে তাকে ‘ঐক্যে’র নামে দিল্লির মুঠোর মধ্যে পুরে ফেলা হবে।

যারা মনে করেন যে ভারতে এ রকম দিন কখনো আসবে না। কারণ ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা তাদের শক্তি হিসেবে রয়েছে। তারা এ কথাও কখনো ভাবেননি যে মোদির মত একজন লোক দেশের নেতৃত্ব দেবেন। ধারণা করা যায় যে মোদি একদিন এক ধর্মান্ধ প্রত্মবস্তু হিসেবে ইতিহাসের অন্ধকারে বিলীন হবেন।

গুজরাটের নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রীর মত একদিন মোদি ২০০২ সালে গুজরাটে কয়েক সপ্তাহ ধরে সংঘটিত ভারতের অন্যতম ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় সভাপতিত্ব করেন। যখন একেবারে রক্ষণশীল হিসেবেও তলোয়ারধারী হিন্দুরা কমপক্ষে এক হাজার মুসলমানকে জবাই করে (অন্যান্য সূত্রে দাঙ্গায় নিহতের সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি বলা হয়েছে)।
কারো কারো অভিযোগ, যে মোদি হিন্দু খুনি জনতার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। অন্যরা বলেন তিনি তাদের তৎপরতার ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। উদারপন্থী হিন্দুরা তাকে হিটলারের সাথে তুলনা করেন। এ ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে সে দেশ সফরের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাকে বর্জন করে।

কিন্তু মোদি ভারতের ধর্মীয় সংখ্যাগুরু হিন্দুদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার ও তার অবস্থান সংহত করতে সক্ষম হন। এ হিন্দুদেরকে তারা শত শত বছর ধরে মুসলিম আগ্রাসনের শিকার হয়েছে বলে দশকের পর দশক ধরে বলা হচ্ছিল। মোদি তার উপরে ওঠার পথ হিসেবে তিনটি শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করলেন।

প্রথমটি হচ্ছে ধর্ষকাম (স্যাডিজম), যার ইঙ্গিত হচ্ছে তার অধীনে হিন্দু উগ্রপন্থীরা রক্তপাত ঘটাতে নিয়োজিত হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, ২০০৭ সালে পুলিশ হেফাজতে এক মুসলিমকে হত্যার পর মোদি এক সমাবেশে তার পক্ষে সাফাই গাইলেন। বললেন, যে কোনো ব্যক্তির বাড়িতে যদি একে-৫৭ রাইফেল পাওয়া যায় তাহলে আমি তাকে হত্যা করব না? (জনতা গর্জে উঠে জবাব দেয়, হত্যা করুন, হত্যা করুন)।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে মুসলমানদের দুর্দশার মধ্যে নিক্ষেপ অর্থাৎ প্রতিরোধহীন মুসলিমদের নির্যাতন, নিপীড়ন করে উল্লাস বোধ করা। আরো আগে ২০০২ সালের এক সমাবেশে গুজরাটের সাম্প্রতিক দাঙ্গায় গৃহহীন মুসলমানদের দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করে মোদি বলেন, আমাদের কি করা উচিত? তাদের জন্য ত্রাণ শিবির চালাব? আমরা কি মুসলিম শিশু জন্মদান কেন্দ্র খুলতে চাই? এ কথা শুনে তার শ্রোতারা হাসিতে ফেটে পড়ে। মোদি তখন বলেন, যারা বিপজ্জনক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করছে তাদেরকে আমাদের শিক্ষা দিতে হবে।

তৃতীয় ও শেষ হল আত্মকরুণা যা হচ্ছে হিন্দুদের নিজেদের নিগ্রহের শিকার বলে উপলব্ধি করা। মোদি লোকসভায় বলেন যে ভারত এক হাজার বছরেরও বেশি দাসত্বের অধীনে ছিল। তিনি দাবি করেন, তাকে হত্যার জন্য শত্রুরা ঘুরছে।
২০১৪ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ধর্মান্ধতা বিজেপি নেতাদের আত্মকথনের এক জোরালো স্বাস্থ্যকর প্রকরণ হয়ে উঠেছে। (দুই পর্বের প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব ছাপা হলো।

(কাল শেষ পর্ব)

ইনকিলাব

print

LEAVE A REPLY