ভারতীয় সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ একটি প্রতারণা মাত্র

১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধানে ১৫ অনুচ্ছেদ যুক্ত হয়, যেটা মোটামুটি এ রকম: রাষ্ট্র কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থানের ভিত্তিতে কোন বৈষম্য করবে না“।

পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (আইএনসি) এবং ভারতের যুক্তি ছিল যে, মুসলিম জাতি বলতে ভারতীয়দের মধ্যে কিছু নেই এবং ভারতীয়রা সম্মিলিতভাবে এক জাতি এবং একটা সেক্যুলার ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য তাদের জাত, লিঙ্গ বা ধর্ম কোন বাধা হবে না। সে কারণে ভারত বিভক্ত করার কোন যুক্তি নেই এবং পাকিস্তান বা অন্য কোন নামে আলাদা দেশ গঠনের কোন প্রয়োজন নেই। ভারতীয় মুসলিমদের প্রায় অর্ধেকই কংগ্রেস এবং তাদের নেতা এবং জওহরলাল নেহরুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবুল কালাম আজাদের এই প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করেছিল। এমনকি কাশ্মীরী মুসলিমরাও ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্ত হওয়াটাকে ইতিবাচক হিসেবে বিশ্বাস করেছিল। তবে মুসলিম নেতা আজাদ ও শেখ আব্দুল্লাহ শিগগিরই বুঝতে পারেন যে, তাদের ধারণা ভুল ছিল। দুই মুসলিম নেতাই পঞ্চাশের দশকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতকে তারা যেমনভাবে ভেবেছিলেন, বাস্তবতা সেটা নয় এবং কংগ্রেস তাদেরকে হতাশ করেছে। আজাদ হতাশা নিয়েই ১৯৫৮ সালে মারা যান যদিও তিনি ভারতের বাস্তবতা নিয়ে তার হতাশার কথা কখনও বলে যাননি। তার সম্পর্কে আমরা জানতে পারি তার বন্ধু আনসার হাভানির কথা থেকে। তিনি ১৯৯২ সালে বলেছিলেন যে, ‘আজাদ অনেক হতাশা নিয়ে মারা গেছেন’। শেখ আব্দুল্লাহকে তার বন্ধু নেহরু ১০ বছরের জন্য জেলে পাঠিয়েছিলেন কারণ দিল্লী যেভাবে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনকে তাচ্ছিল্য করতো, সেটা তিনি পছন্দ করেননি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশটি সারা বিশ্বে ঘোষণা করে বেড়ায় যে, তাদের সংবিধানে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য কি অধিকার ও স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের পরিস্থিতি যদিওবা বিগত বছরগুলোতে সামান্য উন্নতি হয়েছে, তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কিছুই হয়নি। পঞ্চাশের দশক থেকে যে কংগ্রেসের শাসন ছিল, তখনও পরিস্থিতি একই রকম ছিল। আশির দশকে যখন হিন্দু ডানপন্থীদের আদর্শ ও সংগঠনগুলোর উত্থান হচ্ছিল এবং যখন বাবরি মসজিদ/রাম জন্মভূমি ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিভাজনকে বাড়ানো হচ্ছিল, তখন থেকেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ভারতের মুসলিমদেরকে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, যেটার যথেষ্ট প্রমাণ রয়ে গেছে ২০০৬ সালের সাচার কমিটি রিপোর্ট এবং ২০০৭ সালের মিশ্র কমিশন রিপোর্টে। এই রিপোর্টগুলোতে দেখা গেছে অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠিগুলোর চেয়ে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে অনেক বেশি। নীতি প্রণেতাদের পর্যায়ে এই বৈষম্য দূর করার জন্য খুব সামান্যই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতির শুধু অবনতিই হয়েছে ক্রমাগত।

মুসলিম ও খ্রিস্টানসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া বিশেষ করে বিজেপি ও মরিয়মের আঙ্কল মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আরও বেড়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং তাদের অংশীদার সংগঠন ‘সঙ্ঘ পরিবার’ সম্মিলিতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং বিশেষ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে। ‘ওপেন ডোরস’-এর মতো আন্তর্জাতিক সংগঠন বলেছে যে, বিগত চার বছরে ভারতে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে হামলার মাত্রা বহুগুণে বেড়েছে এবং এটা একটা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ওপেন ডোরস বিভিন্ন ঘটনার যে বিশ্লেষণ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে খ্রিস্টান, মুসলিম ও উপজাতীয় দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে।

ভারতের খ্রিস্টানদের জন্যও পরিস্থিতি সুখকর নয়। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের সর্বত্র খ্রিস্টানদের উপর যে ভয়াবহ হামলা হয়েছে, সেগুলো দেখে ধারণা করা যায় যে, ১.৩ বিলিয়ন মানুষের দেশে ৬৫ মিলিয়ন খ্রিস্টান কিভাবে বসবাস করছে। খ্রিস্টানদের জন্য বিশ্বে বিপজ্জনক দেশের তালিকায় ২০১৯ সালে ভারতের অবস্থান হলো ১০ম। ২০১৮ সালে এটা ১১তম এবং ২০১৭ সালে ১৫তম ছিল। ওপেন ডোরসের ওয়ার্ল্ড ওয়াচ লিস্টের গবেষণায় দেখা গেছে ২০১৮ সালে ১২,০০০ এর বেশি খ্রিস্টানের উপর হামলা হয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন, এটা আসল অপরাধের একটা অংশ মাত্র, কারণ অধিকাংশ হামলার ঘটনা প্রকাশিত হয় না। ভারতে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ঘটনা ভারতীয় মিডিয়ায় খুব সামান্যই স্থান পায়। সবচেয়ে বেশি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে ভারতের ছত্তিশগড় ও মহারাষ্ট্রে, এবং এর পরেই রয়েছে উরিষ্যা, মধ্য প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও ঝাড়খান্ড।

এর পর থেকে সংখ্যালঘুদের জন্য পরিস্থিতির শুধু অবনতিই হয়েছে, বিশেষ করে বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রী মোদি পুনর্নির্বাচিত হয়ে আসার পর। চলতি বছরের জুনে জার্মান আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ডয়চে ভেলে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়েছে যে, মোদির অধীনে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ক্রমাগত বাড়ছে। রিপোর্টে এক ব্যক্তির উপর হামলা করে তাকে হত্যার ভিডিওর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যে ভিডিওটি ভারতীয় মুসলিমদের নাড়িয়ে দিয়েছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খান্ডে একদল মানুষ ২২ বছর বয়সী মুসলিম যুবক তাবরেজ আনসারিকে পেটাচ্ছে। জনতা তাকে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করে, যেটা হিন্দু উগ্রপন্থীদের শ্লোগান। এ সময় একটা পিলারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল। এরপর কথিত চুরির অভিযোগে তাকে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। ওই দিনই হাসপাতালে মারা যায় আনসারী। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আন্তর্জাতীয় ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক রিপোর্টে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এক অন্ধকার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই রিপোর্ট প্রকাশের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন যে, ভারতের নাগরিকদের সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত অধিকার নিয়ে কোন বাইরের দেশের মন্তব্য করার অধিকার নেই কারণ এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

কোন সন্দেহ নেই যে, ভারতের ঘোষিত সেক্যুলারিজম এবং সেখানকার সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়টি পুরোটাই প্রতারণা। সংবিধানে ভারতীয় নাগরিকদের যে অধিকারের কথা বলা আছে, প্রথম দিন থেকেই সেটা লঙ্ঘিত হয়েছে। এই ধারবাহিকতায় ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করাটা সর্বসাম্প্রতিক একটা সংযোজন মাত্র।

লেখক, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সাউথ এশিয়ান মনিটর

print

LEAVE A REPLY