এটাই কি আমাদের শিক্ষা?

‘আমরা শিক্ষিত’ এই দাবিটা আমরা বেশির ভাগ মানুষ করি। আবার বলি আমরা শিক্ষিত জাতি। ধরে নিলাম আমরা তাই। তবে মাঝে মাঝে যখন বিভিন্ন মিডিয়াতে আমাদের কুকর্মগুলো দেখি, তখন অনেক প্রশ্নই মনে জাগে, আসলেই কি আমরা শিক্ষিত? নাকি আমরা শিক্ষা নামক শব্দটিকে ব্যবহার করছি?

শিক্ষিত বা শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি? শিক্ষা হলো একজন মানুষকে পরিপূর্ণভাবে তৈরি করবে। মনকে সুন্দর করবে। মানসিকতাকে মানবিকতায় পরিপূর্ণ করবে। অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসবে। এক কথায় আমাদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

কিন্তু বাস্তব চিত্রটা হল তার বিপরীত। আমরা খুব সহজেই নিজেকে শিক্ষিত বলে দাবি করি। কিন্তু সেখানে শিক্ষা নামক শব্দটাই থাকে না। এই যে ধরুন, আমরা প্রতিদিন বাসে বা বিভিন্ন যানবাহনে যাতায়াত করি, সেখানে নারী এবং পুরুষ উভয়ই থাকেন। কিন্তু দেখা যায়, সেখানে নারীরা কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এগুলো কারা করছে? আপনি আমি প্রায় সবাই।

আবার আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছি তাদের কথাই ধরুন না, আমরা কী করছি? আমরা নিজেদের ছাত্র বলে পরিচয় দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের সহপাঠীদের বা আমাদের বন্ধুদের একে অন্যকে গালি দিচ্ছি। আবার যখন এক জায়গায় বসে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ একজন নারী বা মেয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছেন আমরা তাকে কটুক্তি করছি, যৌন হয়রানিমূলক কাজ করছি। আবার অনেক সময় বলে থাকি এগুলো নাকি আমাদের স্মার্টনেস। তবে একবার ভেবেই দেখুন না, এগুলো আমাদের শিক্ষার মধ্যে পড়ে কি না?

আবার আমাদের সমাজের কথাই যদি চিন্তা করি, কী করছি আমরা? সমাজের উঁচু-নিচু শ্রেণি নিয়ে ভেদাভেদ তৈরি করি। সমাজে নিম্ন পেশার মানুষদের শোষণ করে বাঁচি। ধরুন, আপনি একটি রিকশায় করে কোথাও ঘুরতে গেলেন। রিকশাওয়ালা আপনাকে আপনার গন্তব্যে নামিয়ে দিলো। কিন্ত আপনার-আর তার মধ্যে ভাড়া নিয়ে কথা হচ্ছে। হঠাৎ আপনি ভাড়া কম-বেশি হওয়ায় তাকে মারতে শুরু করলেন। কারণটা কী ছিল? ভাড়া। আচ্ছা, আপনি চিন্তা করুন, আপনি যদি নিজেকে শিক্ষিত দাবি করেন, আর এই জঘন্য কাজটি করেন। তাহলে আপনার শিক্ষার কী হলো?

এইতো কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখলাম, একজন মেয়ে এক বৃদ্ধকে মারছেন। আর সেখানে লোকটি ছিল রিকশাওয়ালা। আর মেয়েটি ছিলো উচ্চ পর্যায়ের কোনো পরিবারের মেয়ে। এখন বলুন, এখানে শিক্ষা কোথায় গেল? আর ‘আমরা শিক্ষিত ’ এই বাক্যটির অর্থ কী দাড়ালো?

আবার আমরা নুসরাতসহ বিভিন্ন হত্যা মামলা সম্পর্কে পত্রিকায় এবং টিভি মিডিয়ায় রিপোর্ট দেখেছি। কিন্ত কথা হলো নুসরাত কার শিকার হলো? তারই একজন শুরুজনের (প্রিন্সিপাল)। তিনি কিনা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং শিক্ষক। তার হাতে কিনা একটা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং দেশের আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব ছিল। আজকে তার অবস্থান এই। তাহলে আমাদের শিক্ষার কী হলো?

আবার দেখলাম, বাবা তার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। আবার তাকে পুলিশ গ্রেফতারও করেছে। তাহলে চিন্তা করুন, আমাদের মানসিকতা কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছে? আজকে আমাদের সমাজে বাবার কাছেও মেয়ে নিরাপদ নয়। তাহলে আমাদের শিক্ষার কী উন্নতি হলো?

পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়, শিক্ষক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে। আবার ছাত্র শিক্ষককে ধর্ষণ করছে। তাহলে আমাদের শিক্ষার শিক্ষা কোথায় গেল?

আজকে আমাদের সমাজে ছেলেকে বাবা-মা বড় করছেন। শিক্ষার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু ছেলে তার বাবা-মাকে ভরণপোষণ দিচ্ছেন না। তাহলে এখানে আমাদের শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কোথায় গেল?

আবার আমরা সামান্য কারণে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করি। তার সাথে মারামারিতে লিপ্ত হই। এইতো বছর খানেক আগে আমার নিজ গ্রামে তিনজন মানুষকে মেরে ফেলা হলো সামান্য কারণে। কারণটা ছিলো এক পক্ষের গরু অন্য পক্ষের জমির ধান খেয়েছিল। আচ্ছা এখানে বলুন তো আমাদের শিক্ষা কোথায় কাজ করলো?

আবার ধরুন, আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। সেখানে বসে একের পর এক দুর্নীতি ও অসৎ কাজ করে যাচ্ছি। নিম্ন শ্রেণির কর্মচারীদের উপর জুলুম করছি। আবার একজন অন্য জনকে সরিয়ে কীভাবে বড় পজিশনে যাওয়া যায়, তার জন্য দুর্নীতি করছি। পরনিন্দা করছি। কিন্তু ভাবুন একবার, আমাদের এগুলো শিক্ষার কোন স্তরে পড়েছে?

এভাবে প্রতিনিয়ত হাজারও জঘন্য ঘটনার জন্ম দিচ্ছি। আর নিজেকে শিক্ষিত বলে দাবি করছি। কিন্তু এগুলো আমাদের কোন শিক্ষার মধ্যে পড়েছে? মূল কথা হলো আমরা শিক্ষা নামক শব্দকে ব্যবহার করে শিক্ষিত নামক লোগো লাগিয়ে ঘুরছি। আর এর মারাত্মক ফলাফল হচ্ছে এই ঘটনাগুলো। সুতরাং আমাদের বাস্তবিক অর্থে শিক্ষিত হতে হলে এইগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেকে আসল শিক্ষার আলোতে আলোকিত করতে হবে। তাহলে আমাদের উন্নতি হবে, সাথে দেশের উন্নতি হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

রাইজিংবিডি

print

LEAVE A REPLY