ভারতে গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে পারে কাশ্মীর ও আসামে বিজেপির কর্মকাণ্ড

পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, আসামে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দেশে ‘রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ’ বেঁধে যেতে পারে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) মমতার রাজ্যে এনআরসি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে বলে তিনি এই অতিরঞ্জিত মন্তব্য করেছেন – এমন চিন্তা থেকে এই কথা নাকচ করে দেয়াটা ভুল হবে।

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক হুমকি থেকে ভারতকে মুক্ত করার এজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি, কিন্তু তাদের রাজনীতি নিজেই সম্ভবত দেশে একটা অস্থিরতা তৈরি করতে যাচ্ছে। মোদি সরকার দেশে এক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন, সেটা এরই মধ্যে আসাম এবং জম্মু ও কাশ্মীরে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই দল ও তাদের সরকার যেন তাদের নিজেদের আশঙ্কার শিকার নিজেরাই হয়েছে।

অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের নিয়ে বিজেপির যে মনোভাব, সেটা শুধু আসামে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৯৫ সালে নিজেদের সম-আদর্শের দল শিব সেনাকে সাথে নিয়ে মুম্বাই থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের বের করে দেয়ার চেষ্টা করেছিল বিজেপি। দিল্লী থেকেও বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়ার একই দাবি করেছে দলটি। পশ্চিম বঙ্গ থেকে ‘বহিরাগতদের’ বের করে দেয়ার জন্য এখন বিজেপি যে দাবি করছে, এর স্বল্পমেয়াদি কারণ হয়তো ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচন। তারা আসামের মতো এখানেও ভোটারদের মধ্যে মেরুকরণের চেষ্টা করছে। বিজেপি এখন সারা ভারতেই এনআরসির মতো একটা নাগরিক তালিকার দাবি করছে, যেটা সম্ভবত হবে ন্যাশনাল পপুলেশান রেজিস্টার হিসেবে। শুধু দিল্লীতে নয়, তারা অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা, মহারাস্ট্র ও কর্নাটকেও এটা তৈরির দাবি করছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সবগুলো রাজ্য এনআরসি ধরনের একটি তালিকা তৈরির পক্ষে।

এই ধারণা সঠিক নয় যে, আসামের উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতা সেক্যুলার মানসিকতা থেকে পরিচালিত, এবং ধর্মের উর্ধে সকল বহিরাগতকে (পড়ুন বাংলাদেশী) এখানে একই দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। বরং রাজ্যের বিজেপি সরকার হতাশ হয়েছে কারণ বহু বাংলাভাষী হিন্দু এনআরসি থেকে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কিছু বেসরকারী হিসেব মতে, যারা বাদ পড়েছে, তাদের প্রায় অর্ধেই হিন্দু বাঙালি। সে কারণে বিজেপি এনআরসি তালিকা রিভিউ করার দাবি তুলছে।

জম্মু ও কাশ্মীরে যদি রাজ্যের অধিবাসীদের সুরক্ষার ব্যবস্থাকে একতরফাভাবে প্রত্যাহার করা হয়ে থাকে, তাহলে আসামেও আমলাতন্ত্র, নির্বাহী বিভাগ এবং প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গোগোইয়ের অধীনস্থ সুপ্রিম কোর্ট সেখানকার নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। আসামের এনআরসি থেকে যে ১৯ লাখ লোক বাদ পড়েছে, তাদের কাছে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা ভাগাভাগির কোন অর্থ নেই কারণ তাদের নাগরিকত্বটাই সন্দেহের মধ্যে পড়ে আছে। কল্পনা করে দেখুন প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য রাজ্যের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় দৌড়াদৌড়ি করছে। তাদেরকে তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ স্বরূপ কাগজপত্র উপস্থাপন করতে বলা হচ্ছে, যেখানে দেশের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে তাদের স্কুল পাশ বা স্কুল ত্যাগের কাগজপত্র দেখাতে পারেন না।

তবে, জম্মু ও কাশ্মীরে যেমনটা হয়েছে, আসামেও তেমনি দেখা যাচ্ছে যে, হঠাৎ করে যারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছে, তাদের প্রতি দেশের সহ-নাগরিকদের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। দেশের উপর যেন একটা মানসিক অসারতা ভর করেছে, যেখানে নাগরিকরা তাদের সহ-নাগরিকদের কোন যন্ত্রণাকেই অনুভব করতে পারছেন না। আর সে কারণেই সরকারের দাবির ব্যাপারে যেন যুক্তি তৈরি হয়েছে যে, এরা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠি এবং তাদেরকে স্থায়ী নজরদারিতে রাখতে হবে এবং তাদের কখনও বিশ্বাস করা যায় না। সে কারণে কাশ্মীরের প্রায় ৯০ লাখ মানুষের উপর এক মাস ধরে ষাঁড়াশি অভিযান চালানো হলেও জনগণের নৈতিকতার কোন হেরফের হয়নি। মনে হচ্ছে সরকার আসামের যে ১৯ লাখ বাদ পড়া মানুষকে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে, সেটাই যেন তাদের জন্য অনেক কিছু। যদিও দেশের বাকি নাগরিকদের সবাই জানেন যে, বিচারিক প্রক্রিয়া কতটা যন্ত্রণাদায়ক, সেখানে সবকিছু কতটা জটিল, ব্যয়বহুল ও ধীরগতির।

আসাম ও মুসলিম প্রধান কাশ্মীর উপত্যকা – উভয় জায়গাতেই স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেদেরকে সাংবিধানিক ও আইনি নিরাপত্তার ব্যর্থতার শিকার হিসেবে দেখছে। একই সাথে নিজেদের সহ-নাগরিকদের মধ্যেও তারা একটা আবেগহীন আচরণের বহিপ্রকাশ দেখছেন। যদি এমন কোন নেতা বেরিয়ে আসেন, যিনি এই ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠির নড়বড়ে মানসিকতায় নাড়া দিতে পারেন, তাহলে পরিস্থিতি সহজেই সহিংস হয়ে উঠবে।

অ্যাডলফ হিটলারের কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ওয়াল্টার ল্যাঙ্গার লিখেছিলেন, “এটা শুধু উন্মাদ হিটলার নয় যে জার্মান উন্মাদনা তৈরি করেছিল, বরং জার্মান উন্মাদনার কারণে হিটলারের সৃষ্টি হয়েছিল”। আজকের ভারতের জন্য তার ব্যাখ্যাটা অত্যন্ত উপযুক্ত। ভারতের সম্মিলিত অশুভ নাগরিক শক্তিই যে বর্বর ও নির্দয় রাষ্ট্রক্ষমতা সৃষ্টি করেছে, সেই শক্তিই আজ দেশের নাগরিকদের উপর চড়াও হয়েছে।

print

LEAVE A REPLY