কাশ্মীরে ভারতের দস্যুতা ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধে বিশ্বকে ব্যবস্থা নিতে হবে

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতির উপর যারা নজর রাখেন, ‘কাশ্মীর’ শব্দটা তাদের সবাইকে সচকিত করবেই।

তবে, যে কারণেই হোক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিডিয়া এ বিষয়ে যথার্থ মনোযোগ দিচ্ছে না। এখানে কাশ্মীর বিবাদের বিষয়ে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করবো আমি।

১৪ শতক থেকে মুসলিম শাসনের অধীনে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে বিদ্যমান ছিল কাশ্মীর। পরে শিখ শাসক রঞ্জিত সিং ১৯ শতকে এটাকে দখল করেন।

পরে ব্রিটিশরা কাশ্মীর দখল করে এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর শিখ কর্মকর্তা মহারাজা গুলাব সিংয়ের কাছে এটাকে বিক্রি করে।

ব্রিটিশের অধীনে ভারত ভাগের সময় কাশ্মীরকে সুযোগ দেয়া হয় নিজেদের দেশ বেছে নেয়ার – পাকিস্তান না ভারত, কাদের সাথে তারা থাকতে চায়। কিন্তু কাশ্মীরের শাসক মহারাজা হরি সিংয়ের সাথে গোপন চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরকে দখল করে ভারত।

কাশ্মীরীদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিবাদের কারণে কাশ্মীরের একটা অংশ ভারতীয় হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা পায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে নিয়ে যান। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৪৮ সালের আগস্ট এবং ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে গৃহীত প্রস্তাবে সুপারিশ করেন যে, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হবে এবং একটা গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরী জনগণকে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দিতে হবে।

তখন থেকেই ভারত জাতিসংঘের প্রস্তাবনা লঙ্ঘন করে আসছে এবং কাশ্মীরে গণভোটের আয়োজনে নিরাপত্তা পরিষদের বেশ কিছু প্রস্তাবের ব্যাপারেও একগুঁয়ে অবস্থান নিয়েছে।

সেই সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বিবাদ মীমাংসার জন্য ভারত দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর খেলাও খেলে যাচ্ছে। তবে, কাশ্মীরের বিবাদ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও সংশ্লিষ্টতা দূরে রাখার জন্যই এই মিথ্যা আওড়ে যাচ্ছে তারা।

আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জেনোসাইড ওয়াচ সারা বিশ্বের গণহত্যা পরিস্থিতির উপর নজর রাখে। সম্প্রতি তারা ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে জাতিগত নির্মূল অভিযানের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। কাশ্মীরের জনসংখ্যার চেহারা বদলে দেয়ার জন্যেই ভারত সংবিধান থেকে ৩৭০ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদ বাতিল করেছে।

কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব নীরব থাকতে পারে না, যেটা বিগত সপ্তাহ ও দিনগুলোতে ঘটছে। গত মাসের শুরুর দিক থেকে ভারত এখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করেছে।

ভারত একইসাথে সেখানে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার উপর সেখানকার খবর প্রকাশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এরপরও, সেখানে ভারতের বর্বরতার খবর বেরিয়ে আসছে।

একবিংশ শতাব্দীকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে আলোকিত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিশ্বকে ভারতের এই নতুন দস্যুতা ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

কাশ্মীর ইস্যুর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা রয়েছে: মানবাধিকার লঙ্ঘন, জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রস্তাবের বৈধতা, এবং এ অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি ক্রমবর্ধমান হুমকি। পারমাণবিক শক্তি:র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সঙ্ঘাতের একটা প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাশ্মীর। দুই দেশই এর আগে কাশ্মীর নিয়ে দুইবার যুদ্ধ করেছে।

ভারত এরই মধ্যে পাতানো অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানকে উসকানি দেয়ার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। পাকিস্তান যেহেতু জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রস্তাবনার একটি পক্ষ, তাই তারা এই বিবাদের একটা স্থায়ী সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং আলোচনার মাধ্যমে টেকসই সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কাশ্মীরীদের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখবে। পাকিস্তান এই সমাধানেরই প্রত্যাশী।

বাস্তবতা হলো কাশ্মীরের বিবাদ একটি আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত সঙ্ঘাত, যেটা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রস্তাবনা পাস করেছে এবং অবশ্যই কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী যেটার সমাধান হতে হবে।

সবশেষে, আমি এটা মনে করিয়ে দিতে চাই যে, মুক্তির আন্দোলনটি একটা অন্তহীন প্রক্রিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সেটার প্রমাণ দিয়েছে।

ড. সোহাইল খান ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের হাই কমিশনার

print

LEAVE A REPLY