আটক স্বজনের দেখা পেতে কাশ্মীরের কারাফটকে অপেক্ষায় বহু আশাহত পরিবার

মুগলি বেগমের চোখ দুটি আটকে আছে শ্রীনগরের প্রধান কারাগারের ফটকে, তার নম্বরটি পুলিশ ডাকবে- এই প্রতীক্ষায় আছেন তিনি।

তিনি বললেন, আমি সারা সকালে এক মুহূর্তের জন্যও নড়িনি। তারা হয়তো যেকোনো সময় আমার নম্বরটি ডাকবে। তার নম্বর ৪৬।

গত দুই সপ্তাহে তিনবার ব্যর্থ চেষ্টার পর দানদারখা-বাতমালু এলাকার ৬৯ বছর বয়স্ক নারী অবশেষে কারাগারে তার ছেলে মোহাম্মদ রফিক সুফির সাথে সাক্ষাতের অনুমতি পেয়েছেন।

তিনি নরম সুরে বললেন, আমি তাকে দেখার জন্য, তার চেহারা ছুঁয়ে দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তাকে হয়তো পুলিশ নির্যাতন করেছে, এই আশঙ্কায় ছিলাম আমি।

ভুল করে গ্রেফতার

মুগলি বেগমের মতে, ৩৯ বছর বয়স্ক সুফিকে ২১ আগস্ট মধ্যরাতে তাদের বাড়ি ঘেরাও করে পুলিশ আটক করে। স্থানীয় থানায় দু রাত আটকে রাখার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

মুগলি বেগম বলেন, আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। আল্লাহ জানে সে নিরাপরাধ। তারা তার ভাতিজাকে (সে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পাথর ছুঁড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে) পায়নি বলে তাকে গ্রেফতার করেছে।

পেশায় ওস্তাগার সুফি বিবাহিত, দুটি সন্তান আছে তার। একটি চার বছরের মেয়ে, একটি আট মাসের ছেলে। তার ভাতিজা একাদশ শ্রেণির ছাত্র, পাদশাহি বাগ এলাকায় পরিবারের সাথে বাস করে সে।

আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ছেলেটি কয়েক দিন সুফিদের বাড়িতে অবস্থান করেছিল।

মুগলি বেমগ বলেন, কয়েক দিন থেকেই সে চলে গিয়েছিল। তারপর থেকে তার কোনো খবর আমরা পাইনি।

তিনি জানালেন, তার ছেলেকে ভুল করে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের গ্রেফতারের ব্যাপারে কোনো আইন আছে কি? তারা একজনের বদলে অন্য জনকে কিভাবে গ্রেফতার করতে পারে? তারা কি অন্য কোথাও এভাবে গ্রেফতার করতে পারত?

গত ৫ আগস্ট ভারত সরকার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলুপ্ত করে। এতে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল হয়ে যায়। এর পর থেকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কেবল কাশ্মীর উপত্যকা থেকেই সাড়ে তিন হাজারের বেশি লোককে গ্রেফতার করে। এসব গ্রেফতারের ফলে সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমন করা সম্ভব হয়।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ শীর্ষ রাজনীতিবিদদের পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া স্বাধীনতাকামী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, তরুণ- কেউ বাদ পড়েনি গ্রেফতার হওয়া থেকে।

জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ জানিয়েছে, যেসব তরুণ পাথর নিক্ষেপ করেছ, তাদেরই কেবল জননিরাপত্তা আইনে (পিএসএ) গ্রেফতার করা হয়েছে। এই আইনে যে কাউকে বিনা বিচারে ছয় মাস পর্যন্ত আটক রাখা যায়।

তবে এভাবে গ্রেফতার এবং আটক ব্যক্তিদের কাশ্মীরের বাইরে আগ্রা, নয়া দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন কারাগারে পাঠানোর জন্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করা হচ্ছে।

মুগলি বেগমও আশঙ্কা করছেন, তার ছেলে সুফিকেও হয়তো সরিয়ে দেয়া হবে।

আমার ভাই ভেঙে পড়েছেন
প্রতি দিন সকালে মা-বাবা ও অন্য স্বজনেরা আটক ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাতের জন্য অত্যন্ত সুরক্ষিত কারাফটকের সামনে জড় হন। সাক্ষাতের সময় শুরু হয় সকাল ১০টায়, চলে ২টা পর্যন্ত।
কোনো বন্দীকে কারাগারে পাঠানোর পর তার তিনজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তার সাথে সাক্ষাতের জন্য নাম লেখাতে পারেন। বন্দী যে স্বজন তা প্রমাণের জন্য আধার কার্ড দেখাতে হয়।
আকরা সকালে কারাগারে এসেছেন তার ছোট বোনকে নিয়ে ভাই শহিদ মানজুরকে দেখার জন্য। তাকে আটক করা হয়েছে ১৭ আগস্ট।
খানইয়ার এলাকার অধিবাসী ১৯ বছরের মানজুর স্কুল থেকে ঝরে পড়া ছেলে। স্থানীয় একটি কার সার্ভিস স্টেশনে গাড়ি ধোয়ার কাজ করে। তাকে মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়।
মানজুরের পরিবার জানায়, তারা এ নিয়ে তার সাথে তৃতীয়বার সাক্ষাত করছে। গতবার বাবাকে নিয়ে সাক্ষাতের সময় মানজুর ভেঙে পড়েছিল। সে আকুতি জানাচ্ছিল, তাকে মুক্ত করার। আইনজীবীরা বলছেন, তারা এখন কিছুই করতে পারবেন না।

ক্যারিয়ার শেষ

কেন্দ্রীয় কারাগারের বাইরে কাথিদারওয়াজা এলাকায় তিনটি দোকান সারা দিন খোলা থাকে, যদিও কাশ্মীরের বেশির ভাগ দোকান বন্ধ। সেখানে স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করতে আসা লোকজন কিছু খাবার কেনে। দরু শাহাবাদ এলাকার প্রকৌশলের ছাত্র ইকবাল আহমদ তেলি জানান, তারা তাদের স্বজন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মুদাসির আহমদের সাথে সাক্ষাত করতে এসেছেন।
তিনি বরেন, ১৯ বছর বয়স্ক মুদাসিরকে আটক করা হয়েছে তরুণদের সঙ্ঘবদ্ধ করার অভিযোগে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরিবারটি এখন আশঙ্কা করছে, ছেলেটির নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা দেয়া হয়তো হবে না।
আহমদ বলেন, মুদাসির দশম শ্রেণিতে বৃত্তি নিয়ে পাস করেছিল। সে ডাক্তার হতে চেয়েছিল। এখন এই গ্রেফতার তার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে।

জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন ও পুলিশ গত ৩৬ দিনে ঠিক কতজনকে গ্রেফতার করেছে, তা প্রকাশ করেনি।

print

LEAVE A REPLY