বালিশ, পর্দা, হলমার্ক ও ‘সরল বিশ্বাস’ তত্ত্ব

ডা. জাহেদ উর রহমান

একটি মোবাইলফোনের বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়লো। তখন মোবাইলফোনের রিংটোন মাত্রই মনোফোনিক, একটি মাত্র যন্ত্রের সুর বাজতো। তারা প্রথম পলিফোনিক রিংটোনের একটি ফোন এনেছিল। বাসস্টপে একজনের ফোন বেজে ওঠে আর সেই পলিফোনিক মিউজিকের তালে সবাই নাচতে শুরু করে। মোবাইলফোনে এ রকম পলিফোনিক টোন হতে পারে দেখে আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম। আজ শুনতে ভীষণ অবাক লাগতে পারে, একটি মোবাইলফোন বিক্রির জন্য তার ইউনিক সেলিং পয়েন্ট (ইউএসপি) রিংটোন হতে পারে– এটি আজকের একজন শিশু শুনলে ভীষণ অবাক হবে, কিংবা হবে না হয়তো।

ছোটবেলায় বিজ্ঞানের জয়যাত্রা/বিজ্ঞানের অবদান জাতীয় রচনায় একটি কথা লিখতাম– বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে এটি আমাদের বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে। আমরা এখন কোনও আবিষ্কার দেখেই আর বিস্মিত হই না। মাত্র ১৫/২০ বছরে চোখের সামনে মোবাইলফোন যেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেটি ১৫/২০ বছর আগে কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। কিন্তু আজ সেই মোবাইলফোনটির ক্ষমতা দেখে আমরা অবাক হই না। তেমনি আজ থেকে ২০ বছর পরের মোবাইল ফোন যদি থাকে, সেটা যা যা করতে পারবে, সেটা দেখেও অবাক হবো না।

রূপপুরের বালিশ (কেনা আর ওপরে ওঠানোর খরচ) এই রাষ্ট্রের আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। সেই বালিশকাণ্ডের রেশ কেটে গেছে বেশ কিছুদিন হলো, এবার সামনে এলো ফরিদপুরের পর্দাকাণ্ড। ৩৭ লাখ টাকা মূল্যে ওটির পর্দা, ১ লাখ ১২ হাজার টাকায় স্টেথোস্কোপ, ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ভ্যাকিউম প্ল্যান্ট ইত্যাদি মিলিয়ে সবমিলিয়ে ১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বাজারমূল্যের যন্ত্রপাতি ৫২ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে দেখে আমরা অবাক হলাম, আমরা মেতে উঠলাম। ফেসবুকে আমরা দেখাচ্ছি নানা রকম প্রতিক্রিয়া–কেউ দেখাচ্ছি বিক্ষুব্ধতা, আর কেউ করছি নানা রকম ট্রল। যেটি এখন আমাদের এক ধরনের জাতীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এটি মানতেই হয়, পর্দাকাণ্ড সবশেষ বালিশ কাণ্ডকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেছে।

এই খবরে আমি মোটেও বিস্মিত হইনি। একটু আগে যেমন বললাম, বিজ্ঞান যেমন আমাদের বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে, তেমনি এই সরকার‌ও দুর্নীতির বিষয়ে আমার বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে। আমি এখন যে কোনও ক্ষেত্রে যে কোনও অঙ্কের দুর্নীতিকে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাপার বলে মনে করি, আমি একটুও বিস্মিত হই না। এ জন্যই যারা এই দেশের কোনও দুর্নীতিকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করে অবাক হন, তাদের দেখেই আমি অবাক হই। এই দেশে বছরের পর বছর বসবাস করে এই দেশের ন্যূনতম কিছু খোঁজ-খবর রেখে দুর্নীতির পরিমাণ আরও ব্যাপ্তি নিয়ে অবাক হওয়ার তো কথা ছিল না।

২০১২ সালে বাংলাদেশের দুর্নীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক স্থাপিত হয়। মাইলফলক স্থাপনকারী হলমার্ক গ্রুপ আমাদের স্মৃতিতে আরও বহুদিন থাকবে নিশ্চয়ই। তাদের মেরে দেওয়া প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকাকে সাবেক অর্থমন্ত্রী ‘পিনাট’ বললেও এই দেশের জনগণ ধাক্কা খেয়েছিল।

এই ঘটনায় হলমার্ক গ্রুপের মালিক-দম্পতি তানভীর ও জেসমিন জেলে যান। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারপারসন জেসমিন ২০১৩ সালের আগস্ট মাসের জামিনে মুক্তি পান এই শর্তে যে, তিনি মাসে ১০০ কোটি টাকা করে ঋণ পরিশোধ করবেন। ৬৭ মাস জামিনে থাকলেও এক টাকাও তিনি পরিশোধ করেননি। এরপর তার জামিন বাতিল করে আবার জেলে পাঠানো হয়। আমরা কীভাবে ভাবতে পারি, যে মানুষগুলো স্রেফ জালিয়াতি করে ঋণের টাকা মেরে দিয়েছেন, সেই টাকা তারা ফেরত দেবেন? সেই টাকার পুরোটাও কি আদৌ তাদের কাছে আছে? খুব সামান্যই হয়তো সামনের এই দুইজন মানুষ ভোগ করেছেন, বাকিটা গেছে বহুদূর পর্যন্ত।

বেশ কিছুদিন হলো দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার সমর্থক অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার ড. মইনুল ইসলাম, খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এই ধরনের পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’ জারি করে। ওই সার্কুলারের ওপর স্থিতাবস্থার আদেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর চেম্বার আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল পদ্ধতিটা চালু করে সরকার। এই প্রক্রিয়ায় ঋণ পুনঃতফসিল করার মূল শর্ত ছিল, ভালো ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ পাবেন, যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যবসায়ের কোনও ক্ষতির কারণে ঋণ খেলাপি হয়েছেন।

সম্প্রতি এই হলমার্ক আবার আলোচনায় এসেছে। এবার হলমার্ককে তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়ায় এই আলোচনার সূত্রপাত। হলমার্ক এই পুনঃতফসিল করার সুবিধা পেতে যাচ্ছে। বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ অন্যান্য ঋণ জালিয়াতি করা গ্রুপগুলোকেও এই সুবিধা দেওয়া হবে। এই তথ্যটা দেওয়ার আগে আগে অনেকেই হয়তো লিখতেন, ‘অবিশ্বাস্যভাবে’। সেটি আমি লিখিনি। কারণ আমার কাছে এসব কোনও বিষয় আর মোটেও ‘অবিশ্বাস্য’ নয়।

ডিসি সম্মেলনে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান বলেছেন, ‘‘পাবলিক সার্ভিস অ্যাক্টে বলা হয়েছিল, সরল বিশ্বাসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি কিছু ‘ইয়ে’ করে, তাহলে সেটা ইনক্লুড না করা…’’। তিনি এখানে ‘সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি’ করাকেই বুঝিয়েছেন বলে আমি করি। এই অদ্ভুত দেশে যেহেতু ‘সরল বিশ্বাসে’ দুর্নীতিও করা সম্ভব, তাহলে ‘সরল বিশ্বাসে’ ঋণ জালিয়াতিও করা সম্ভব। যেহেতু হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো গ্রুপগুলো ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধাটা পাচ্ছে, তাই আমরা ধরে নিতে পারি, সরকার এটি মনে করছে হলমার্ক ‘সরল বিশ্বাসে’ ঋণখেলাপি (পড়ুন জালিয়াত) হয়েছে।

যে দেশে ভয়ঙ্কর জালিয়াত ও দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেওয়া তো দূরে থাকুক, এই রকম সুবিধা দেওয়া হয়, সেই দেশে পৃথিবীর যে কোনও দেশের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যয় ফ্লাইওভার, সেতু, রাস্তা, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হওয়া কিংবা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশ অথবা ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের পর্দাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটার‌ই কথা।

আমাদের এটা ভাবা উচিত দাম হোক ৩৭ লাখ টাকা, কিন্তু একটা পর্দা তো তারা দিয়েছে সেটার বিনিময়ে। এই দেশে বসবাস করে আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত ভবিষ্যতে কোনোদিন আমরা এমন রিপোর্ট দেখবো—বিরাট বিল তুলে নেওয়া হয়েছে কোনও জিনিস বাবদ। কিন্তু সে জিনিসটা আদৌ সরবরাহ করা হয়নি।

পাদটীকা: ২০১৮ সালের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রস্তুতকৃত ২০১৯ সালে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ আগের বছরের চাইতে ছয় ধাপ পিছিয়ে ১৪৯ এ অবস্থান করেছে।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

উৎসঃ বাংলা ট্রিবিউন

print

LEAVE A REPLY