কাশ্মীরকে ভারতের সাথে সংযুক্ত করায় শিমলা চুক্তি বাতিল হয়ে গেছে

সালমান রাফি শেখ
১৯৭১ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে শিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সে চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে যে কোন সঙ্ঘাত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত অঞ্চল কাশ্মীরকে একতরফাভাবে ভারতের সাথে সংযুক্ত করার কারণে ওই চুক্তি মূলত বাতিল হয়ে গেছে।
সে কারণে পাকিস্তান এখন কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণ করতে পারে, যেটাকে ভারত ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছে।
মজার ব্যাপার হলো, পাকিস্তান যখন এই ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রচেষ্টা চালিয়েছে, ভারত তখন জোর দিয়ে বলে এসেছে যে, দ্বিপাক্ষিকভাবে এটার সমাধান হতে হবে। তবে, ৫ আগস্ট ভারত একতরফাভাবে কাশ্মীরকে সংযুক্ত করার পর দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রশ্নটির গুরুত্ব শেষ হয়ে গেছে।
অন্যভাবে বললে, কাশ্মীর যেখানে বিতর্কিত অঞ্চল ছিল এবং এখনও আছে এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এটা সমাধানের কথা ছিল এবং এখনও আছে, কিন্তু ভারতই সেটা অন্যভাবে করতে চেয়েছে; আর সেখানেই পাকিস্তানের পক্ষে ইস্যুটির আন্তর্জাতিকীকরণের যৌক্তিকতা। পাকিস্তান এখন যৌক্তিকভাবেই বিশ্বকে জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের একতরফা পদক্ষেপের পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করছে এবং ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত এ অঞ্চলকে কিভাবে অস্থিতিশীল করে তুলবে, সেটা বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে। অথচ এ অঞ্চল আফগানিস্তানে ১৯ বছরের মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ থেকে মাত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সন্ত্রাসের ভয়াবহতা কমতে শুরু করেছে।
গোটা বিশ্ব, বিশেষভাবে প্রধান আঞ্চলিক শক্তি রাশিয়া ও চীন – যারা তাদের আঞ্চলিক সংযোগ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে – তারা চায় না যে, দু্টো পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যাক, অথবা কাশ্মীর উপত্যকায় বড় ধরনের সামরিক সঙ্ঘাত বা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হোক। কাশ্মীরে ভারত যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মাধ্যমে এরই মধ্যে এই দুটো সম্ভাবনার বীজ বপন করা হয়ে গেছে।
একদিকে, এই সংযুক্তিটি শুধু বিতর্কিত একটি ভূখণ্ড নিয়ে সমস্যার সমাধান নয়; এটা মূলত একটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য যে বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে, সেটি বাতিল করে হিন্দুবাদী আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য মোদি সরকারের পরিকল্পনার অংশ।
কাশ্মীরে হিন্দুদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের এবং ভিটেমাটি ছাড়া হওয়ার একটা মারাত্মক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে কাশ্মীরীদের মধ্যে। সে কারণে, যে মূল প্রশ্নটির দিকে এখন বিশ্বের মনোযোগ দেয়া দরকার, সেটা হলো: কাশ্মীরীরা কি করবে এবং কিভাবে তারা হিন্দু জনসংখ্যাগত আগ্রাসনের জবাব দেবে?
যেহেতু কাশ্মীরকে সংযুক্ত করার পদক্ষেপের সাথে খুবই স্পষ্ট ও খোলামেলাভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ছাপ রয়েছে, তাই ধর্মীয় অনুভূতি এখানে সরাসরি জড়িত, নিপীড়িত কাশ্মীরীদের জন্য এর অর্থ হলো – হিন্দুদের অবাধ অনুপ্রবেশের মাধ্যমে শুধু সেখানকার জনসংখ্যার চেহারাই বদলাবে না, বরং মুসলিমদের উপর হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এখানে, যেখানে বিগত ৭০ বছর কাশ্মীরে কোন ধরনের হিন্দু আধিপত্য ছিল না। যদিও তাদের যে সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসন ছিল, সামরিক দখলদারিত্বের কারণে সেটা আসলে ছিল অর্থহীন।
কাশ্মীরকে সংযুক্ত করার সময় থেকে সেখানে আরও ১৫০,০০০ অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ভারত এবং এর মাধ্যমে এ অঞ্চলকে অপ্রত্যাশিত মাত্রায় সামরিকীকরণ করেছে।
এই ইস্যুর যে ধর্মীয়/সাম্প্রদায়িক দিক রয়েছে, সেটা বিবেচনায় নিলে বলা যায় উপত্যকায় ধর্ম প্রভাবিত সহিংসতা ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেখানে এক পক্ষ আগ্রাসীদের মোকাবেলা করবে আর অন্যপক্ষ আগ্রাসন চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে।
এটা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে ইরাকেও ঠিক একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে ইরাকের সুন্নী জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে মার্কিন-মদদপুষ্ট শিয়া অভিজাত শ্রেণীর দ্বন্দ্বে আইসিস/দায়েশের মতো সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে এবং এ অঞ্চলে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেটার জের সেখানে চলতেই থাকবে।
বিশ্ব নিশ্চয়ই দক্ষিণ এশিয়াতে একই পরিস্থিতি দেখতে চায় না। সে কারণে, পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক রিপোর্ট অনুসারে, “[কাশ্মীর উপত্যকায়] যে নজিরবিহীন পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেটা কাশ্মীরীদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করবে যে, [হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রভাবিত] ভারত এখানে দখলদার শক্তির মতো আচরণ করছে এবং সে কারণে তাদের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভ ও চরমপন্থার জন্ম হবে”।
উপত্যকায় ধর্ম-ভিত্তিক সহিংসতার হুমকি সৃষ্টি হয়েছে এবং ভারত নিজেই যেহেতু ১৯৭২ সালের ২ জুলাই স্বাক্ষরিত শিমলা চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে, সে কারণে কাশ্মীর ইস্যুটি আবার ১৯৪৭ সালের পর্যায়ে ফিরে গেছে এবং পরে ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘ সেখানে গণভোটের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব পাশ করেছে। এর অর্থ হলো পাকিস্তান এখন অবশ্যই আর দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবে না এবং এখন গণভোটের মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে তাকে। যেটা নিঃসন্দেহে এবং বাস্তবিক অর্থেই ইস্যুর সমাধান করে দেবে।
এই যখন পরিস্থিতি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) আসন্ন অধিবেশনে ইমরান খানকে অবশ্যই এটার উপর জোর দিতে হবে যে, ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত ১৯৭২ সালের চুক্তিকে বাতিল করে দিয়েছে এবং কিভাবে এটা আবার ১৯৪৯ সালের পরিস্থিতিতে ফিরে গেছে যখন ভারত ইস্যুটিকে জাতিসংঘে নিয়ে গিয়েছিল।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ তাদের প্রস্তাবনার মাধ্যমে স্বীকার করেছে যে কাশ্মীর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি বিতর্কিত অঞ্চল; তারা কাশ্মীরীদের স্বাধিকারের বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ঘোষণা দিয়েছে যে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের মানুষ তাদের বিতর্কের সমাধান করবে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দুটো প্রস্তাবনা এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে। সে কারণে এই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানোর জন্য এখনকার চেয়ে উত্তম সময় আর নেই, যখন বহু মিলিয়ন কাশ্মীরীরা অবরুদ্ধ আছে এবং আগ্রাসী হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা বড় ধরনের মানবিক ট্রাজেডির ঝুঁকির মধ্যে তারা বাস করছে।
বিশ্ব কি এটার জন্য অপেক্ষা করবে আর তারপর পদক্ষেপ নেবে? কাশ্মীর একটা বড় ধরনের সহিংস জায়গা হয়ে উঠছে – শুধু এ কারণে নয় যে পাকিস্তান এই অঞ্চল নিয়ে ভারতের সাথে তিনবার যুদ্ধ করেছে, বরং এটা ক্রমেই উগ্রবাদী হয়ে উঠছে এবং সেটা অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
এ অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলা তৎপরতা এবং হিন্দুবাদী দখলদারী পরিকল্পনা বাকি ভারতের উপরও প্রভাব ফেলবে, যেখানে হিন্দু ব্রিগেডগুলো এরই মধ্যে ভারতের সাথে কাশ্মীরের সংযুক্তকরণকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে এবং এভাবে পুরো ভারতেই মুসলিমদেরকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
অন্যভাবে বললে, কাশ্মীর ইস্যুটি যতটুকু দেখা যাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বড়, এবং পাকিস্তানকে কূটনীতির সম্ভাব্য সকল জায়গায় এই ইস্যুটির গুরুত্বের দিকটি তুলে ধরতে হবে। আর সে বিবেচনা থেকেই আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

print

LEAVE A REPLY