কথিত ‘হিন্দু বিজ্ঞান’ নিয়ে বিচলিত ভারতের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়

সুবীর ভৌমিক
ভারতের অর্থনীতি রয়েছে ভয়াবহ পতনের দিকে এবং রাজনৈতিক সমর্থনপুষ্ট উচ্চ পর্যায়ের প্রতারকেরা বিলিয়ন বিলিয়ন ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়েই বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায়, ব্যাংকগুলো এখন সতর্ক।

কিন্তু এসব কিছু ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকারকে গো-মূত্র ও গোবর নিয়ে নতুন ব্যবসা চালু করার তহবিল সংস্থান থেকে বিরত রাখছে না।

হিন্দুরা গরুকে মা হিসেবে পূজা করে, এবং ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলিমদেরকে হিন্দু গোরক্ষাকারীদের পিটিয়ে হত্যা করতে দেখছে ভারত।

ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে প্যান প্যান করে মোদির বিজেপির রাজনীতিবিদেরা এমনকি এই দাবিও করেছে যে গো-মূত্র ক্যান্সারের মতো রোগও সারাতে পারে।

এখন একটি সরকারি তহবিল সংস্থা কামধেনু আয়োগ (ফেব্রুয়ারিতে সাবেক বিজেপি আইনপ্রণেতা বল্লভভাই কাঠিরিয়াকে প্রধান করে প্রতিষ্ঠিত) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে গো-মূত্র ও গোবর নিয়ে উদ্ভাবনমুখী ব্যবসা চালুর জন্য ৬০ ভাগ পর্যন্ত তহবিল দেয়া হবে।

বামপন্থী রাজনীতিবিদ শ্যামলাল রায় (তিনি আগে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন) মন্তব্য করেছেন যে এসব পণ্য রোগীদের জন্য উপকার করবে বলে আমরা নিশ্চিত নই, তবে বিজ্ঞানের বিপরীতে বিশ্বাসকে স্থাপন করা একটি বিপজ্জনক খেলা।

তিনি প্রশ্ন করেন, এসব পণ্য কাজ আসলেই কাজ না করলে, রোগী মারা গেলে কে দায়দায়িত্ব নেবে?

ভারতীয় বিজ্ঞানীরা ব্লকবাস্টার হলিউড মুভির চেয়েও কম খরচে চাঁদে মনুষ্যহীন অনুসন্ধান যান অবতরণ করিয়েছে, সফলভাবে পরমাণু বোমার পরীক্ষা করেছে, সেগুলোতে বসানোর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরী করেছে, মঙ্গলে মিশন পাঠিয়েছে। কিন্তু ছদ্মবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যকে বিজ্ঞান হিসেবে চালিয়ে দেয়ার নতুন ও অনেক সময় উদ্ভট ধারাতে উদ্বিগ্ন ও মর্মাহত।

দিল্লির এলিট রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের গবেষক অশোক কুমার সংস্কৃত ভাষার স্কলারদের নিয়োগ করেছেন কমায় থাকা রোগীদের কানে ‘মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র’ (মৃত্যু জয় করার হিন্দু মন্ত্র) আওড়াবার জন্য।

তার এই প্রয়াসের মতোই আরেক কাজ করেছেন ভারতের মানবসম্পদ মন্ত্রী রমেশ পখরিয়াল। তিনি সম্প্রতি দাবি করেছেন, শ্রীলঙ্কায় রাজা রাবণের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় হিন্দু পৌরাণিক বীর দেবতা রাম এই মন্ত্র আউড়িয়ে ছিলেন তার আহত সৈন্যদের আবার জীবিত করার জন্য।

পখরিয়াল আরো দাবি করেছেন যে রাম তার অপহৃত স্ত্রীকে উদ্ধারের জন্য পক প্রণালী পাড়ি দিয়ে রাবণের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। আর তখন রামের সেনাবাহিনীর জন্য সেতু নির্মাণ করে দিয়েছিলেন হিন্দু ইঞ্জিনিয়াররা।

অনেক ভারতীয় বিজ্ঞানী এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু তাতেও অশোক কুমার দমে যাননি।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের পেইড ফেলোশিপ পেয়ে অশোক কুমার ‘মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র’ আউড়িয়ে কমায় থাকা রোগীদের আবার জীবিত করার তার উচ্চাভিলাষী পরীক্ষা করে যাচ্ছেন।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা এই পরীক্ষাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ‘সময় ও অর্থের অপচয়’ হিসেবে খারিজ করে দিযেছেন।

ভারতের শীর্ষস্থানীয় নিউরো সার্জন আশিস ভট্টাচার্য বলেন, ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরির রোগীদের আবার জ্ঞান ফেরাতে মিউজিক থেরাপির একটি ভূমিকা সম্ভবত আছে। কিন্তু ধর্মীয় মন্ত্র কিভাবে তা করবে তা আমি বুঝতে পারছি না।

গত আগস্টে ভারতের শীর্ষস্থানীয় পরমাণু পদার্থবিদ বিকাশ সিনহা খড়গপুরে অভিজাত ইন্ডিয়ান ইনস্টিউট অব টেকনলজির কনভোকেশনে মন্ত্রী রমেশ পখরিয়ালের দাবির তীব্র সমালোচনা করেন। মন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে হিমালয় দাঁড়িয়ে আছে নীলকান্তের (হিন্দু দেবতা শিবের নীল গলা) মতো এবং উন্নত শিল্পায়িত দেশগুলোর দূষণ শুষে নিচ্ছে।

সিনহা সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাওয়ায় হিমালয় ক্ষয়ে যাচ্ছে। অথচ মন্ত্র পখরিয়াল মনে করছেন যে শিল্পন্নত দেশগুলোর দূষণ গলধঃকরণ করে হিমালয় দেবতা শিবের নীল গলায় পরিণত হচ্ছে। এখানে পুরাণকাহিনীকে বিজ্ঞান হিসেবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। মন্ত্রী এই মূর্খতাপ্রসূত কথাগুলো বলেছেন আইআইটিতে। অথচ এই প্রতিষ্ঠান দেশের সেরা ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোক্র্যাটদের তৈরী করছে।

ভারতের পরমাণু কর্মসূচিতে অবদানের জন্য ২০১০ সালে ভারতের শীর্ষস্থানীয় বেসামরিক পদক পদ্মভূষণে ভূষিত সিনহা পুরাণকাহিনীকে বিজ্ঞান হিসেবে চালিয়ে দেয়ার এই প্রবণতাকে ‘খুবই বিপজ্জনক’ হিসেবে অভিহিত করেন।

সিনহা বলেন, ভারতের ভবিষ্যত যে বৈজ্ঞানিক ভাবাবেগের ওপর নির্ভরশীল, আমাদের সেদিকে ধাবিত হওয়ার প্রয়াসের বিরুদ্ধে এটা করা হচ্ছে। আমরা যদি অব্যাহতভাবে পুরাণতত্ত্বকে বিজ্ঞানের সাথে মিশিয়ে ফেলি, তবে প্রথম শ্রেণির বিজ্ঞানী তৈরি করতে পারব না। মধ্যাকর্ষণ শক্তি স্যার আইজ্যাক নিউটন নয়, বরং প্রাচীন হিন্দুরা আবিষ্কার করেছিল বলে পখরিয়ালের আগের দাবিরও সমালোচনা করেন তিনি।

সিনহা বলেন, এটা চরম মূর্খতা। এই ফালতু দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেন না ওই মন্ত্রী।

ভারতের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় ক্রমবর্ধমান হারে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদদের সমর্থনপুষ্ট উদীয়মান ‘ছদ্ম বিজ্ঞানী’ বাহিনীর মুখোমুখি হচ্ছে। এসব ছদ্মবিজ্ঞানী কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রাচীন হিন্দুদের পুরাণকাহিনীকে গৌরবাজ্জ্বল বৈজ্ঞানিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রবণতা বেড়েছে। এই ধারায় দাবি করা হয় যে হিন্দু দেবতা গনেশ (মানব শরীরে হাতির মাথা যুক্ত) ছিলেন পৃথিবীর ‘প্রথম প্লাস্টিক সার্জারির প্রকৃত উদাহরণ।

গত ৬ জানুয়ারি গবেষকদের গ্রুপ ব্যাঙ্গালোর, কাচি, কলকাতা ও থিরুভানানথপুরামে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে অবৈজ্ঞানিক ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসে উপস্থাপন বন্ধ করার দাবি জানায়।

কলকাতার অলাভজনক ব্রেকথ্রো সায়েন্স সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক পদার্থবিদ সৌমিত্র ব্যানার্জি বলেন, ব্যক্তিগত বিশ্বাসভিত্তিক ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে যাচাই হয়নি, এমন কোনো কিছু বিজ্ঞান কংগ্রেসে উপস্থাপন করা উচিত নয়। এই সোসাইটিও বিক্ষোভের আয়োজন করে।

অবৈজ্ঞানিক দাবি যাচাই করতে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের সংগঠকেরা এখন বক্তাদের কাছে অনুরোধ করছে যে আগামী বছর থেকে যেন তাদের আলোচনার সারমর্ম আগেই দাখিল করে।

ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস হলো ভারতের বৃহত্তম বার্ষিক বিজ্ঞানী সমাবেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বক্তাদের প্রায়ই প্রাচীন হিন্দু বিজ্ঞান নিয়ে ভিত্তিহীন দাবি করতে দেখা যাচ্ছে।

গত ৪ জানুয়ারি বিজ্ঞান কংগ্রেসে আলোচনাকালে অন্ধ্র ইউনিভার্সিটির ভিসি জি নাগশ্বের রাও হাজার হাজার বছর আগে ভারতে কৃত্রিম প্রজনন ও স্টিম সেলের জ্ঞান থাকার প্রমাণ হিসেবে প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের শ্লোকের উদ্ধৃতি দেন।

অন্য বিজ্ঞানীরা তাকে থামিয়ে দেয়ার পর তিনি মিডিয়ার প্রশ্ন এড়িয়ে যান। অনেকে অভিযোগ করেন, তিনি হিন্দু জাতীয়বাদী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।

ভারত সরকারের মুখ্য বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা কৃষ্ণস্বামী বিজয়রাঘবন একটি ব্লগ পোস্টে লিখেছেন যে রাষ্ট্রীয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভিসি বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কোনো বিষয়ে কথা বলবেন, তা দুর্ভাগ্যজনক।

আরেক বক্তা সায়েন্স কংগ্রেসের শিশুদের অধিবেশনে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ও নিউটনের মধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব চ্যালেঞ্জ করেন। এতে আরো বেশি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

২০১৫ সালের ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের পর ভারতীয়-বংশোদ্ভূত নোবেলজয়ী ভেনকটরমন রামকৃষ্ণান এটিকে ‘সার্কাস’ হিসেবে অভিহিত করেন।

স্ট্রাকচারাল বায়োলজিস্ট রামকৃষ্ণানের উদ্ধৃতি দিয়ে মিডিয়ায় বলা হয়, সায়েন্স কংগ্রেসে বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা হয় সামান্যই। আমি আর কখনো এই সম্মেলনে হাজির হব না।

রামকৃষ্ণান ২০১৫ সালের সায়েন্স কংগ্রেসের একটি উপস্থাপনায় মর্মাহত হয়েছিলেন। তাতে দাবি করা হয়েছিল যে বৈদিক যুগে ভারতীয় সন্ন্যাসীরা বিমান আবিষ্কার করেছিলেন।

তিনি মিডিয়ায় বলেন, এটা চরম মূর্খতা। এর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। এ ধরনের আবর্জনা শুনে সময় অপচয় করব না আমি।

উত্তরপূর্ব ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব দাবি করেন যে মহাভারতের যুদ্ধে দ্রুত সামরিক যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেটের মতো কোনো কিছুর ব্যবস্থা ছিল তাদের।

বিজেপির আইনপ্রণেতা প্রজ্ঞা ঠাকুর দাবি করেছেন যে তার স্তন ক্যান্সর ভালো হয়েছে নিয়মিত গো-মূত্র খাওয়ার কারণে। কিন্তু লক্ষ্ণৌর রাম মনোহরলহিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের যে সার্জন তার চিকিৎসা করেছিলেন, তিনি এই নারী এমপির দাবিকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেন।

কার্ডিওথোরাপিক সার্জন এস এস রাজপতু প্রজ্ঞা ঠাকুরের বাইলেটারাল মাস্টাটেকটোমি (উভয় স্তন অপসারণ) করেছিলেন। সার্জন বলেন, প্রজ্ঞার স্টেজ-১ বা প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সর ধরা পড়ার পর তিনি তিনবার তার অস্ত্রোপচার করেছেন।

পরমাণু পদার্থবিদ বিকাশসিনহা বলেন, আমি আমার দেশের অতীত ও এর বৈজ্ঞানিক অর্জন নিয়ে গর্বিত। কিন্তু আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি করতে চাইলে পুরাণকাহিনীর সাথে বিজ্ঞানকে মিশ্রিত করার মিথ্যা প্রবণতাকে অবশ্যই দমন করতে হবে। তিনি বিজ্ঞান থেকে রাজনীতিকে আলাদা করার অনুরোধ করেন।

কলকাতাভিত্তিক সায়েন্স অ্যান্ড রেশনালিস্ট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা প্রবীর ঘোষ (তিনি প্রায়ই ধর্মীয় গুরুদের জারিজুরি ফাঁস করে দেন, এমনকি মাদার তেরেসাকে সন্ন্যাসীর মর্যাদা দেয়ার মিরাকলেরও প্রতিবাদ করেছিলেন) বলেন, রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ হিসেবে পুরাণকাহিনীকে বিজ্ঞান হিসেবে সঙ্ঘবদ্ধভাবে প্রচার করা থেকে এই বিপদের উদ্ভব।

ঘোষ সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, ভারত যদি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি করতে চায়, তবে একে থামাতেই হবে। তরুণদেরকে অবশ্যই পুরাণতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে।

তিনি বলেন, ভারতের চন্দ্র মিশনকে কাছ থেকে দেখানোর জন্য স্কুল শিশুদের ইসরোতে নিয়ে যাওয়া কি অপচয় হবে না যদি তাদেরকে গো-মূত্রকে চিকিৎসাসামগ্রী হিসেবে তুলে ধরার ভিত্তিহীন বিষয়গুলো শেখানো হয়।

সাউথ এশিয়ান মনিটর

print

LEAVE A REPLY