বাংলাদেশ: দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে দুর্নীতি দমন অভিযানের ঝুঁকি

বাংলাদেশে খেলার বাইরে আর কোন কিছু মানুষের এত মনোযোগ কাড়েনি, যেমনটা কেড়েছে দুর্নীতি – বিশেষ করে অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে ষাঁড়াশি অভিযান। যারা গ্রেফতার হয়েছে, তারা দুর্নীতিগ্রস্ত ও শক্তিধর। কিন্তু যেটা সবাইকে চমকে দিয়েছে, সেটা হলো এদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের (এএল) সদস্য। অভিযান শুরুর দুই সপ্তাহের মাথায় মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে যে এই অভিযান শুরুর দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারবে কি না।

প্রথম ধাক্কাতেই ক্ষমতাসীন দলে বহু বড় বড় ব্যক্তির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে সেটা এখন কিছুটা কমে এসেছে কারণ শক্তিশালী রাজনীতিকদের বাদ দিয়ে মূলত অবৈধ জুয়ার দিকেই নজর দেয়া হচ্ছে। তবে, উত্তাপ এখনও রয়ে গেছে।

জুয়ার উপর মনোযোগ আরও কেন্দ্রীভূত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক হিসেব দিতে বলেছে। যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের অধিকাংশই তার যুব গ্রুপের সদস্য। তিনি এই অভিযানের সমালোচনাও করেছেন।

এটা কোন গোপন বিষয় নয় উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি রাজনৈতিক যোগাযোগ ছাড়া সম্ভব নয়। তাহলে কেন শুধু এদেরই টার্গেট করা হচ্ছে এবং আনুষ্ঠানিক খাতের অপরাধীসহ অন্যদের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না? এদেরকে স্পর্শ না করার জন্য কোন পক্ষ থেকে কি চাপ আসছে?

এক-এগারোর ছায়ার ছায়া?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “সমাজের এই দুর্নীতিগ্রস্ত অংশের বিরুদ্ধে আঘাত হানাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল”। এই পদক্ষেপ তার দল আওয়ামী লীগের ভেতরের অনেককে আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। যদিও সবাই প্রকাশ্যে এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন, তবে মানুষের ধারণা হলো তাদের অনেকেই অপরাধী কর্মকাণ্ডে জড়িত।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন: “এক এগারোর মতো ঘটনা যাতে আবার না ঘটে, সে জন্য আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই অভিযান অব্যাহত রাখছি”। হাসিনা ২০০৭ সালে সামরিক বাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা নেয়ার দিকে ইঙ্গিত করেন, যারা আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে হস্তক্ষেপ করেছিল। ওই অভ্যুত্থান বর্তমান বিরোধী দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টিকে (বিএনপি) ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। বিএনপি এখনও সেই আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক-এগারোর ভুত তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এ বিষয়ে তিনি অবগত যে, তার দলের কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি ও তাদের আইন ভঙ্গের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গেছে। এই ইস্যুটি বড় হয়ে সরকারকে হুমকির মুখে ফেলার আগেই তাই তিনি এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন।

শেখ হাসিনা আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তার দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার কারণে এই সমস্যাটা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন, “আমরা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় আছি। তাই আমাদের যখন কোন ভুল হয়, তখন তিলকে তাল করার একটা প্রবণতা রয়েছে”।

এটা সত্য যে মানুষ খুশি হয় যখন কোন ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়, যিনি আইনের উর্ধ্বে আছেন বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়। এটাও বাস্তবতা যে, এই ধরনের ব্যক্তিরা সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত থাকেন।

এই ধরনের গ্রেফতারের রাজনৈতিক দিক রয়েছে – এ বিষয়টি বিবেচনা করে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদরা সবসময় বলে আসছেন যে, যারা ধরা পড়েছে তারা সবাই আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার আগে বিএনপির সাথে যুক্ত ছিল। মন্ত্রীরা বলেছেন যে, বড় মাত্রায় জুয়ার আসরগুলো বিএনপির আমলে যাত্রা শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা যদিও দলের ইমেজ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তবে সাধারণ মানুষরা নয়। তাদের মতে, দুর্নীতিগ্রস্তরা যে দলেরই হোক না কেন, তারা হলো শত্রু। জনগণ যেটা আশা করে, সেটা হলো সরকার এইসব দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে কারণ তারা নিজেরা শক্তিহীন।

অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে কোন সরকারের সময় যে কোন অপরাধীকে এই ধরনের তৎপরতা চালাতে হলে ক্ষমতাসীন দলের সাথে তার যোগসাজশ থাকতে হয়। মূলত, এটা সবারই জানা বিষয় এবং মিডিয়ার প্রতিবেদন শুধু এটাকে নিশ্চিত করেছে মাত্র।

কিন্তু এখানে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ঝুঁকির ব্যাপারটি স্পষ্ট। পৃষ্ঠপোষকতা, সুবিধা প্রদান, দুর্নীতি আর পেশিশক্তির উপর যে কাঠামো নির্মিত হয়েছে, সেটা ভেঙ্গে দেয়াটা সহজ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় যে ধরনের রাজনীতির চল রয়েছে, সেটি চিন্তা করলে একটা ক্ষমতাধর দলের মধ্যে এই ধরনের উপাদান না থাকাটা অসম্ভব বিষয়।

বাংলাদেশে রাজনীতিতে প্রায় নিয়মিত সহিংসতা হয়ে আসছে। শুধু বিরোধী দল আর ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেই এই সহিংসতা সীমাবদ্ধ নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অংশের মধ্যেও সংঘর্ষ হয়ে থাকে। এটা প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠোমোর অংশ এবং ফলের ঝুড়ির মধ্যে কয়েকটা পচা আপেলের মতো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা?

যুবলীগের অন্যতম নেতা সম্রাট – মিডিয়াতে যাকে ঢাকার সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বস হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে – সে এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মিডিয়া তাকে নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করছে এবং ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতারা বলেছেন যে, তাকে শিগগিরই ধরা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা ঘটেনি।

সাম্প্রতিক মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, এটা হতে পারে যে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকা ঢাকা শহরে সম্রাটের সাংগঠনিক দক্ষতা ও পেশিশক্তির সাহায্য ছাড়া ক্ষমতাসীন দল চলতে পারবে না। সে কারণে তার ব্যাপারে এবং তার টাকা পয়সা উপার্জনের ব্যাপারটি দল সহ্য করে যাচ্ছে। দলের অনেক নেতা হয়তো তার পক্ষ থেকে লবিং করছে। অভিযানের জন্য এটা একটা প্রতীকী পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাই ঠিক করে দেবে যে এই অভিযান কতদূর যেতে পারবে।

বাস্তবতা হলো দুর্নীতিটা বাংলাদেশের কাঠামোগত। বাংলাদেশে এই ধরনের অভিযান জনগণকে তুষ্ট করার জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয় কিন্তু এই সব অভিযানে মূলত রাস্তা ঘাটের অপরাধের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়। ব্যাংক ঋণ আর নির্মাণের সাথে জড়িত বড় দুর্নীতিগুলোতে হাত দেয়া এখনও প্রায় অসম্ভব। এটা শুধু রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক সিস্টেমকে হুমকিতে ফেলবে না বরং রাজনৈতিক কাঠামো নিজেই হুমকিতে পড়ে যাবে।

বাংলাদেশের দুর্নীতির অবস্থা যেমন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে, সেখানে এটা হতে পারে যে, দুর্নীতি দমন অভিযানের নিজেরই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

সাউথ এশিয়ান মনিটর

print

LEAVE A REPLY