আবরার হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন রুমমেট অন্তিম

বুয়েট শিক্ষার্থী মেধাবী আবরার হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল বুয়েটসহ বুয়েটসহ উত্তাল দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস।

বিদ্যাপীঠগুলোর সঙ্গে ফুঁসে উঠেছে সারা দেশ।

ফেসবুকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির প্রতিবাদে নিজের মত জানিয়েছিলেন আবরার ফাহাদ।

সেই স্ট্যাটাসের জেরে সোমবার (৭ অক্টোবর) রাতে তাকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েটের একই হলের বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী।

সোমবার ভোরে শেরেবাংলা হলের নিচতলা ও দোতলার সিঁড়ির মাঝের করিডোর থেকে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

শেরে বাংলা হলের শিক্ষার্থীরা ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেদিন শেরেবাংলা হলের নিজ কক্ষে (১০১১ নম্বর) ঘুমিয়ে ছিলেন আবরার ফাহাদ। এসময় ছাত্রলীগ কর্মী ও মেক্যানিক্যাল বিভাগের একই ব্যাচের শিক্ষার্থী মুনতাসির আল জেমি এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এহতেশামুল রাব্বি তানিম ওই কক্ষে এসে আবরারকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। পাশের সিটেই আবরারের রুমমেট অন্তিম পড়ায় মগ্ন ছিলেন।

ঘুম ঘুম চোখে আবরার কিছু বুঝে ওঠার আগেই জেমি বলে, ‘ভাইরা তোকে ২০১১ নম্বর রুমে ডাকে। তোর মোবাইল ও ল্যাপটপ নিয়ে চল।’

সিনিয়র ভাইদের কথামতো আবরার ২০১১ নম্বর কক্ষে যায়। এর কিছুক্ষণ পর তার অপর দুই রুমমেট ১৬তম ব্যাচের মিজান ও ১৭ তম ব্যাচের রাফি রুমে আসলে। তাদের রুমে রেখে অন্তিম পলাশীতে কফি খেতে চলে যান।

ঘটনার বিবৃতি দিয়ে অন্তিম এক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আবরারের সঙ্গে আমার ওটাই ছিল আমার শেষ দেখা। ‘৯ টার দিকে আমাকে ঘুম থেকে তুলে দিস’ – এ কথাটাই ছিল বন্ধু আবরারের বলা শেষ কথা জানিয়ে কেঁদে ফেলেন অন্তিম।

আবরার সন্ধ্যায় কেন ঘুমাচ্ছিলেন প্রশ্নে অন্তিম বলেন, আমাদের পরীক্ষা চলছে। সবাই রাত জেগে পড়ি। তাই এনার্জি নিতে সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে নিই আমরা। আবরারও রাতে পড়তে চেয়েছিল। তাই রাত ৯ টার দিকে তাকে ঘুম থেকে তুলে দিতে বলেছিল।’

অন্তিম বলেন, পলাশী থেকে কফি খেয়ে এসে দেখি রুম তালা দেয়া। রুমমেট রাফি ও মিজান রুমে নেই। সঙ্গে চাবি না থাকায় পাশের ২০১০ নম্বর কক্ষে বসে অপেক্ষা করতে থাকি আমি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কোথা থেকে যেন মিজান ও রাফি কক্ষে এমে তালা খুলে।

অন্তিম যোগ করেন, ইতিমধ্যে ১০ টা বেজে যায়। তবুও আবরার ফেরে না। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি আর এর মধ্যেই ফের জেমি রুমে এসে আবরারের একটি গ্রামীণ চেকের শার্ট ও একটা ট্রাউজার নিয়ে যায়।

অন্তিম বলেন, এ সময় আমি জেমিকে আবরার কোথায় আর কেন আসছে না জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, ‘আবরার ঠিক আছে।’ পরবর্তীতে আবরারের লাশের গায়ে গ্রামীণ চেকের সেই শার্টটি দেখা যায়। সেটিও ছেঁড়া ছিল।

ছাত্রলীগ কর্মী ও মেক্যানিক্যাল বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মুনতাসির আল জেমি

কান্নারত কণ্ঠে অন্তিম জানায়, নিহত আবরারের গায়ে সেই চেক শার্টটি ছেঁড়া অবস্থায় দেখেছি। আমাদের সহপাঠী জেমিরা যে আবরারকে মেরে ফেলবে, এটা মাথায়ই আসেনি।’

এর পর রাত ২টা ২০ মিনিটে তিতুমীর হলে খেতে যান অন্তিম। রাত ৩ টার দিকে খেয়ে ফেরার পথে হলের গেটে প্রবেশ করেই স্ট্রেচারে আবরারের নিথর দেহ দেখতে পান। সেই নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে রুমমেট মিজান ও রাফি কান্না করছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, স্ট্রেচারে থাকা আবরারের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, মুয়াজ, মেক্যানিক্যাল ১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন।

এছাড়াও হল কর্তৃপক্ষের মধ্যে বুয়েটের ডাক্তার মাসুক এলাহী, প্রভোস্ট ড. জাফর ইকবাল, সহকারী প্রভোস্ট শাহিনুর রহমান, সহকারী প্রভোস্ট ড. ইফতেখার ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ড. মিজানুর রহমান স্ট্রেচারের পাশে ছিলেন।

অন্তিম জানান সে সময় উপস্থিত বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল স্ট্রেচারে আবরারের নিথর দেহকে নির্দেশ করে ডাক্তার মাসুক এলাহীকে বলেন, ‘ওকে (আবরার) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই।’

জবাবে ডাক্তার মাসুক এলাহী বলেন, ‘১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে মারা গেছে ছেলেটা। ওকে হাসপাতালে পাঠিয়ে কী হবে?’

আবরারের নিথর দেহ সিঁড়িতে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন আহনাব নামে ১৭ তম ব্যাচের মেকানিক্যাল বিভাগের এক শিক্ষার্থী।

তিনি বলেন, ‘আমি অনেক রাত পর্যন্ত পড়ছিলাম। রাত ২ টার দিকে আমি পানি আনার জন্য বোতল নিয়ে বের হই। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই দেখি দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি জায়গায় তোষকের ওপর আবরারের নিথর দেহ পড়ে আছে। আমি দ্রুত রুমে চলে যাই। আমার হাত-পা অবশ হয়ে যায়। বুঝতে পারছিলাম না কী করব। এরপর আবার আসি। তখন দেখি কেউ তাকে স্ট্রেচারে তুলে রেখেছে ।’

যুগান্তর

print

LEAVE A REPLY