সারা দিন চরম নাটকীয়তা, রাতে এলো সুখবর

উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা আর চরম নাটকীয়তার মধ্যে কাটল সারা দিন। রাতে এলো সুখবর। আন্দোলনরত ক্রিকেটারদের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সমঝোতার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল সব সংকটের। বিসিবি কার্যালয়ে বোর্ড সভাপতি ও পরিচালকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর বুধবার রাত ১১টায় ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ক্রিকেটাররা। আপাতত তাদের ১৩ দফা দাবির ১০টি মেনে নিয়েছে বিসিবি। শনিবার মাঠে ফিরবেন ক্রিকেটাররা। আগামী মাসে জাতীয় দলের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা কেটে গেল।

বুধবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে থাকা বিসিবি পরিচালক ও সাংবাদিকরা কখনও গণভবনে আবার কখনও গুলশানের দিকে কান পেতে ছিলেন। ১১ দফা দাবিতে ক্রিকেটারদের ধর্মঘটে বাংলাদেশের ক্রিকেট যে নজিরবিহীন সংকটে পড়েছিল, এর দ্রুত সমাধানের অপেক্ষায় ছিল গোটা দেশও।

দুপুরে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন বোর্ডের অন্যতম পরিচালক, সাবেক অধিনায়ক নাঈমুর রহমান। গণভবন থেকে বেরিয়ে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান জানান, ক্রিকেটারদের সব দাবি মেনে নেয়া হবে। ক্রিকেটারদের তিনি আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। তবে ক্রিকেটাররা তখন আলোচনায় যোগ না দিয়ে গুলশানের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের জন্য একত্রিত হন।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটাররা আগের ১১ দফার সঙ্গে আরও নতুন দুটি দাবি জানান। ক্রিকেটারদের মুখপাত্র হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান জানান, দাবিগুলো লিখিতভাবে বিসিবির কাছে পাঠানো হয়েছে। এরপর নিজেরা আলোচনা করে বিসিবিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ক্রিকেটাররা।

রাত ৯টা ৩০ মিনিটে সংকট নিরসনে বোর্ডের সঙ্গে আলোচনায় বসেন আন্দোলনরত ক্রিকেটাররা। এর আগে খেলোয়াড়দের এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া সাকিব আল হাসান জানান, সফল আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের মধ্য দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব খেলায় ফিরতে চান তারা।

আলোচনায় বসার আগে ক্রিকেটারদের যোগ করা নতুন দুটি দাবির একটি হল- বোর্ডের রাজস্বের ভাগ দিতে হবে খেলোয়াড়দের। এছাড়া নারী ক্রিকেট দলকেও দিতে হবে ন্যায্য ভাগ। জোর দিয়ে বলা হয়, ক্রিকেটাররা লিঙ্গবৈষম্যে বিশ্বাস করেন না। তাই পুরুষ ক্রিকেটাররা যে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন, এর সব দিতে হবে নারী ক্রিকেটারদেরও।

গুলশানে সংবাদ সম্মেলনে সাকিব আল হাসান বলেন, ‘সিদ্ধান্ত যেহেতু সবাই মিলে নিয়েছি, সেক্ষেত্রে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তও সবাই মিলে নিতে হবে। সেদিন সময় কম থাকায় আমরা সেভাবে গুছিয়ে দাবি উপস্থাপন করতে পারিনি। আর সেজন্য বিষয়টা সুন্দর করে আয়োজনের উদ্দেশ্যেই আমাদের সময় নেয়া। বিসিবি আমাদের ডেকেছে, আমরা নিজেরাই যোগাযোগ করে আলোচনায় বসব। আমরা কেউ কারও থেকে দূরের নই।’

তিনি বলেন, ‘দুপক্ষ মিলেই কিন্তু বিসিবি। বিসিবির প্রতি ব্যক্তিগত সম্মানের জায়গা আমাদের আগের মতোই আছে। ক্রিকেটাররাও খেলতে চায়, সুস্থ থাকতে চায়, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।’

গুলশানের সিক্স সিজন হোটেলে ক্রিকেটাররা সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন সন্ধ্যা ৬টার দিকে। সেটা শুরু হয় আরও আধা ঘণ্টা পরে। ক্রিকেটারদের দিয়েই সংবাদ সম্মেলন কক্ষ প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

সেখানে সাকিবদের মুখপাত্র হিসেবে আইনজীবী মুস্তফিজুর বলেন, ‘ক্রিকেটাররা তাদের জীবনের নিরাপত্তা চান। তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে ক্রিকেটার হন। তাদের একটা সময় একাডেমিক ক্যারিয়ার বাইরে রেখেই ক্রিকেটে মন দিতে হয়। এখানে অনেক মেধাবী রয়েছেন যারা পড়াশোনা করলেই বিসিএস ক্যাডার বা বড় কর্মকর্তা হতে পারতেন। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে তারা ক্রিকেট খেলেন। যে ছেলেটা ইনজুরির কারণে ১৭-১৮ বছর বয়সেই আর ক্রিকেট খেলতে পারে না, সে সবই হারায়। এই বিবেচনাতেই

ক্রিকেটাররা নিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তা চায়। এটা তাদের ন্যায্য দাবি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আয় এখন বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ। অথচ আমাদের খেলোয়াড়রা জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়েও কম সুযোগ-সুবিধা পান।’

এর আগে বিসিবিতে দুপুর থেকে সবাই ক্রিকেটারদের অপেক্ষায় ছিলেন। দু’ধাপে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস। বেলা ১২টায় নিজামউদ্দিন বলেন, ‘আমরা ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তারা চাইলে যে কোনো জায়গায়ই আলোচনা হতে পারে।

বিকাল ৫টার দিকে এই আলোচনা হতে পারে।’ এরপর গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘ক্রিকেটারদের সব দাবি মেনে নিতে প্রস্তুত বিসিবি। ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ড আলোচনা করতে চায়।’ বিসিবিতে দ্বিতীয় দফায় জালাল ইউনুস বলেন, ‘ক্রিকেটারদের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি- এই বার্তা আপনারা তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারেন।’

মিরপুরে জাতীয় ক্রিকেট একাডেমি মাঠে সোমবার প্রায় ৬০ জন ক্রিকেটারকে সঙ্গে নিয়ে ধর্মঘটের ঘোষণা দেন সাকিব আল হাসান। এরপর মঙ্গলবার এক সুদীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটারদের এই আন্দোলনকে বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্র, দেশের ক্রিকেটকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত বলে মন্তব্য করেন বিসিবি সভাপতি। কাল এমন কথা ক্রিকেটারদের সংবাদ সম্মেলনে উঠতেই সবাই হেসে উঠেন। তারা পরোক্ষভাবে জানাতে চান, এমন কিছুই নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিনিয়র ক্রিকেটার বলেন, ‘তারা আমাদের বিষয়টা ষড়যন্ত্র বলে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। আসলে আমরা আমাদের জন্যই পথে নেমেছি।’ এদিকে ধর্মঘটে যাওয়ার পর থেকেই কোনো পরিচালকের ফোন ধরছিলেন না ক্রিকেটাররা। অবশেষে বুধবার সকালে বিসিবির ফোন ধরেন ওপেনার তামিম ইকবাল। তিনি বিসিবিকে আশ্বাস দেন ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনা করেই বিসিবির সঙ্গে বসা হবে।

বোর্ড বিভিন্ন ইঙ্গিতের মাধ্যমে জানানোর চেষ্টা করে যে তারা ক্রিকেটারদের দাবি মেনে নেবে। সকাল থেকে দু-একজন করে পরিচালক বিসিবিতে জড়ো হতে থাকেন। কিন্তু ক্রিকেটারদের তখনও কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বিকাল ৩টার মধ্যে ডজনখানেক পরিচালক বিসিবিতে জড়ো হয়ে যান। এরই মধ্যে ক্রিকেটাররা হঠাৎ করে গুলশানে সংবাদ সম্মেলন ডাকলে পরিচালকরা হতাশ হয়ে যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিচালক বলেন, ‘আমরা তাদের অপেক্ষায় আছি। তারা কী করবে, সেটা তারাই ভালো জানে। তবে দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস পেয়েও যদি ক্রিকেটাররা বিসিবিতে না আসে, তাহলে স্পষ্টই বুঝতে হবে এটা ষড়যন্ত্র।’ ক্রিকেটারদের সংবাদ সম্মেলনে সাকিব বারবারই বলেছেন ভারত সফরে খেলতে সবাই প্রস্তুত। কিন্তু এর আগে নিজেদের দাবি-দাওয়া মিটিয়ে দিতে হবে। স্বল্প সময়ে সব দাবি মেনে নেয়া সম্ভব না হলেও তাদের আশ্বাস দিতে হবে।

print

LEAVE A REPLY