৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও দু’টি কথা

রাত পোহালেই ৭ নভেম্বর। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন এটি। বলা হয়ে থাকে, প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন দিসব। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষনার মাধ্যমে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় এসেছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী সরকারের সাথে ইন্ডিয়ার ৭ দফা গোপন চুক্তি এবং পরবর্তীতে ২৫ বছরের গোলামী চুক্তি বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার করতলে সমর্পণ করা হয়। মানচিত্রের স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু জাতীয় সার্বভৌমত্ব ছিল পিন্ডির জিঞ্জির আবদ্ধ। এ শৃঙ্খল থেকে জাতীয় মুক্তি মিলেছিল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। সিপাহী ও জনতার ঐতিহাসিক সম্মিলিত বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল প্রকৃত সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই এদিবসটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় পরবর্তীতে। এ উপলক্ষ্যে ১৯৭৬ সাল থেকে দিবসটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে ঘোষনা করা হয়।

এ বিপ্লব সম্পর্কে আলোকপাত করতে হলে কিছুটা পেছনে ফেরা লাগবে। হঠাৎ করেই একদিনে বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। মেজর শরিফুল হক ডালিমের (বীর উত্তম) লেখা “জিয়া থেকে খালেদা অতপর” বইয়ের তথ্যসূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েই সেনাবাহিনীর একটি গোপন সংগঠন তৈরি হয়। এর নাম ছিল সেনা পরিষদ। পাকিস্তান আর্মি থেকে পালিয়ে বা বিদ্রোহ করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্য থেকেই কিছু সদস্য সেনা পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেন। কারন তারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অনুভব করতে পেরেছিলেন, পাকিস্তান থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করা হচ্ছে। কিন্তু ইন্ডিয়ার আশ্রিত স্বাধীনতা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। যারা এটা উপলব্ধি করেছিলেন তাদের মধ্য থেকেই প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের লক্ষ্যে সেনা পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। এই পরিবর্তশীল পরিস্থিতিতে সেনা পরিষদের একটি বিশেষ ভুমিকা ছিল বলে জানা যায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট থেকে ৩ নভেম্বর। মাত্র ২ মাস ১৮দিন। এর মাঝেই সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসার মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের (বীর উত্তম) নেতৃত্বে পাল্টা একটি অভ্যূত্থান ঘটানো হয়। ৩ নভেম্বর অভ্যূত্থানে ১৫ আগষ্টে গঠিত সরকারের পতন ঘটে। ৩ নভেম্বরের অভ্যূত্থানকে ইন্ডিয়াপন্থি সৈনিকদের অভ্যূত্থান হিসাবে চিহ্নিত করে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ। দেশের মানুষের মনেও তখন এবিষয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। তাই দেশপ্রেমিক সৈনিকদের তৎপরতায় শুরু হয় পাল্টা আরেকটি অভ্যূত্থানের প্রস্তুতি। মেজর শরীফুল হক ডালিম বীর উত্তমের বই থেকে জানা যায়, পাল্টা অভ্যূত্থানের নেপথ্যে মূল ভুমিকা পালন করে সেনাবাহিনীতে মুক্তিযদ্ধকালীন সময়ে গড়ে উঠা সেনা পরিষদ এবং সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা।

‘জিয়া থেকে খালেদা অতপর, বইয়ের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব প্রসঙ্গে আলোচনার এক জায়গায় উল্লেখ রয়েছে-‘৬ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট হিসাবে জাষ্টিস সায়েমের শপথ গ্রহনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ঐদিন বঙ্গভবনে খালেদ মোশাররফ দুপুর ১১টায় কমান্ডারদের এক কনফারেন্স করলেন। কিন্তু ৬ই নভেম্বর বাস্তব অবস্থা ঢাকাসহ অন্য সব সেনানিবাসে ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। ইতোমধ্যে আরেকদফা রিফলেট বিতরণ করা হয়েছে সব ক্যান্টনমেন্টে এবং শহর-গঞ্জে। খালেদ যখন বঙ্গভবনে করফারেন্সে ব্যস্ত তখন বনানীর এক বাড়িতে সেনা পরিষদের পক্ষ থেকে মেজর মহিউদ্দিন এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পক্ষ থেকে কর্ণেল তাহের বসেছিলেন খালেদ বিরোধী বিপ্লবের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে।’

মিটিংয়ে কত গুলো সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়, “জিয়া থেকে খালেদা অতপর” বইটিতের এ অধ্যায়ে উল্লেখিত সিদ্ধান্ত গুলোর মধ্যে ছিল-
১. ৬-৭ নভেম্বর রাত ১২টায় বিদ্রোহ শুরু হবে।
২. বিদ্রোহ পরিচালিত হবে ২য় ফিল্ড আর্টিলারির রেজিমেন্ট থেকে মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে।
৩. ঠিক রাত ১২টায় মেজর মহিউদ্দিনের নির্দেশে একটি গান থেকে আকাশে ফায়ার করা হবে একটা ট্রেসার গোলা। সেটাই হবে বিপ্লব শুরুর সময় সংকেত, ঢাকায় উপস্থিত সবগুলো ইউনিটের জন্য।
৪. কর্ণেল তাহের দায়িত্ব নেন শহরের গোপন আস্থানা থেকে বিপ্লবের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলার।
৫. বিপ্লবের লক্ষ্য, খালেদ চক্রের পতন ঘটিয়ে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেনা পরিষদের মনোনীত জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা। তাঁকে আবার চীফের পদে অধিষ্ঠিত করা এবং তাঁর মাধ্যমে খন্দকার মুশতাককে পুনরায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহনে আবেদন জানানো।
৬. বিপ্লবকালে এবং পরবর্তী পর্যায়ে যে কোন ধরনের ভারতীয় আগ্রাসন মোকাবেলায় জনযুদ্ধ গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত থাকা। প্রতিটি দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং বিভিন্ন দেশপ্রেমিক দল সংগঠনের নেতাকর্মী ও সদস্যদের প্রস্তুত করা।
৭. বিপ্লবের সফলতার পর আগষ্ট বিপ্লবের নেতাদের অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনা।
৮. এ দফায় বিপ্লবের সময় নারায়ে তাকবীর আল্লাহু-আল্লাহু আকারসহ কত গুলো শ্লোগান নির্ধারিত হয়।
৬ নভেম¦র দিবাগত রাত ১২টায় পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৎকালীন মেজর এবং পরবর্তীতে কর্ণেল পদে উন্নীত মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে ২য় ফিল্ড আর্টিলারির রেজিমেন্ট থেকেই আকাশে গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। ওই রেজিমেন্টের সৈনিকরা মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে বিপ্লবের শুরুতেই ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ছুটে যায়। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে প্রথমে মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে ২য় ফিল্ড আর্টিলারির দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে নিয়ে যাওয়ার পরপরই জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর বিপ্লবের মূল কমান্ড গ্রহন করেন।

৭ নভেম্বরের এই বীর মহিউদ্দিনের ভাগ্যে পরবর্তিতে কি ঘটেছিল, সেটা কি আমরা ষ্মরণ রেখেছি! ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সময় সেনাবাহিনীর কর্ণেল পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। স্বপদে দায়িত্বপালনরত অবস্থায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় আসামী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে তাঁর বিচার হয়। পরবর্তীতে আবার ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসেন। দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় এসে কর্ণেল মহিউদ্দিনসহ শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় কারাগারে আটক ৫ সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কারাগারে ফাঁসির সেলে বন্দি জীবন যাপন করতে হয়েছিল তাঁকে। ৭ নভেম্বর বিপ্লবের সূচনাকারী ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার নেতৃত্বদানকারী সেনা অফিসার মহিউদ্দিনের কষ্টের জীবনটা কেউ ষ্মরণ করেন কিনা জানা নেই।

এটা অনস্বীকার্য্য, কর্ণেল মহিউদ্দিনদের অবদানে সংঘটিত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আমরা পালন করি। কিন্তু তাঁকে কেউ ভুলেও ষ্মরণ করি না।

৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি আমাদের স্বাধীনতাকে পূর্ণতা দিয়েছিল। দিল্লীর গোলামীর জিঞ্জির থেকে মুক্ত করা হয়েছিল জাতিকে। একই সঙ্গে নিজ বাসভবনে খালেদ মোশাররফ কতৃক বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়েছিল। এক দলীয় বাকশাল নিপাত গিয়েছিল ১৫ আগষ্ট। তাঁর ধারাবাহিকতায় বহু দলীয় গণতন্ত্র দেশে আবার পুনরায় চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল ৭ নভেম্বরের মহান বিপ্লবীরা।

যাদের উদ্যোগে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব সুসংঘটিত হয়েছিল, তাদের প্রতি রইল হাজারো সালাম। ৭ নভেম্বরের বিপ্লব অমর হউক।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উদ্দিনের নেতৃত্বে জরুরী আইনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বেই দেশকে আবারো ইন্ডিয়ার করতলে সমর্পন করা হয়। এই মঈন উদ্দিন ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অভ্যূত্থানের সময় খালেদ মোশাররফের অনুসারী তরুণ ক্যাপ্টেন হিসাবে ভুমিকা রাখেন। তাঁর নিজের লেখা বইয়ে উল্লেখ করেন, খালেদ মোশাররফের নির্দেশে সেদিন তিনি রাষ্ট্রপতি খন্দকার মুশতাক আহমদকে বন্দি করে রাখার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিজেই লিখেছেন, ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যূত্থানের পর বঙ্গভবনের দেয়াল টপকে সিভিল ড্রেসে রাস্তায় জনতার সাথে মিশে গিয়ে জীবন রক্ষা করেছিলেন। জীবনের শুরু থেকে তিনি ছিলেন ইন্ডিয়াপন্থি। ২০০৭ সালে জরুরী আইনের মাধ্যমে ক্ষমতা নেয়ার পরপরই তিনি ৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি বাতিল করেছিলেন। তিনি এই ছুটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি যে ছিলেন, খালেদ মোশারফের ইন্ডিয়াপন্থি অভ্যূত্থানের জুনিয়র সেনা অফিসার। ৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস তাঁর চিন্তার একেবারেই বিপরীত মেরুতে ছিল। সেটা তিনি ষ্মরণে রেখেছেন এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সে সুযোগ পেয়েই ৭ নভেম্বরের ছুটি বাতিল করেছেন।

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এই দেশে খালেদ মোশাররফের সঙ্গী ইন্ডিয়াপন্থি জুনিয়র সেনা অফিসার পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি পেয়ে সেনাপ্রধান হয়েছেন। আর ৭ নভেম্বর বিপ্লবের মূল সেনা নায়করা কারাগারে ধুকে ধুকে ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিয়েছেন।

print

LEAVE A REPLY