ফেনী নদী নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি

পানি প্রবাহের হিসাবে গড়মিল এবং তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণে ঘাটতি নিয়েই ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি দেয়ার সমঝোতা চুক্তিতে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। ভারত যেখানে বলছে শুকনো মওসুমে ফেনী নদীর পানির প্রবাহ ১০৯ কিউসেক, সেখানে বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশন বলছে শুকনো মওসুমের গড় প্রবাহ ৪০০ কিউসেকেরও উপরে। এখন ‘চুক্তি পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায়’ তথ্য আদান-প্রদান ও ব্যখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে দৌড়ঝাপ শুরু হয়েছে। অপরদিকে ভারত প্রায় তিন দশক ধরে পাম্প বসিয়ে অবৈধভাবে পানি তুলে নিচ্ছে ফেনী নদী থেকে। বর্তমানে তাদের ওই অবৈধ পাম্পের সংখ্যা ৩৬টি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) একটি প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, শুস্ক মওসুমে ফেনী নদীর গড় পানির প্রবাহ সেকেন্ড প্রতি ১.৩৫ ঘনমিটার বা ৪৭.৬৭ কিউসেক। বাংলাদেশের নদ-নদীর ধরন, গতি-প্রকৃতি এবং স্থানিক বর্ণনাসহ ৬ খণ্ডের ওই প্রকাশনাটি ২০০৫ সালে প্রকাশ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০১১ সালে প্রকাশ হয় এর দ্বিতীয় সংস্করণ। যেখানে শুস্ক মওসুমে ফেনী নদীর (আইডি নং এসই-১২) সর্বনিম্ন পানি প্রবাহের মাস হিসেবে এপ্রিলকে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ওই শুস্ক মওসুমে বাংলাদেশেরই পানি প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে পরে। গত এপ্রিলে খাগড়াছড়ির রামগড় পৌরসভা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বিজিবি ও বিএসএফ এর সেক্টর পর্যায়ের বৈঠকে ভারতের বসানো অবৈধ পাম্পগুলোর ব্যাপারে আপত্তি তুলে সেগুলো বন্ধের দাবি জানানো হয়। এখন চুক্তির আওতায় আরও যাবে ১.৮২ কিউসেক পানি। এনিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনকে বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্নের মুখে পরতে হচ্ছে। কিন্তু সঠিক উত্তরটি তিনি কোথাও দিতে পারছেন না। গত ১৯ অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে ডয়েচে ভেলের মুখোমুখি হয়ে চুক্তির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘ভারতকে বাংলাদেশ দায়বদ্ধতার মধ্যে ফেলেছে’। তিনি আরও বলেন, ‘ফেনী নদী থেকে যে পানি দেয়া হচ্ছে, তা খুবই সামান্য। ১২৬ কিউসেকের মধ্যে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক, যা ১ ভাগেরও কম। মানবিকতার জন্যই বাংলাদেশ এই পানি দিচ্ছে।’

প্রশ্ন হলো, পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকাশিত তথ্য সঠিক হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া ওই তথ্যের উৎস কী? যৌথনদী কমিশনের দাবিরও ভিত্তি কী?

জানা গেছে, ফেনী নদীর পানি তুলে ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমা শহরে পানি সরবরাহের আলোচনা শুরু হয় চলতি দশকের শুরুর দিকে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের কাছে পানি চেয়ে অনুরোধ জানায় ভারত। এর পরে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সম্পাদন প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত হয়। ওই সময়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্ব জোনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে ফেনী নদীর পানির প্রবাহের বাস্তব চিত্র উল্লেখ করে জাতীয় একটি দৈনিকের রামগড় প্রতিনিধির করা প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসলে সে যাত্রায় তালিকা থেকে বাদ যায় চুক্তিটি। যদিও ওই সময়ে চুক্তি নিশ্চিত জেনেই স্থাপনা নির্মাণ শুরু করে দিয়েছিল সাব্রুম প্রশাসন। চুক্তি না হওয়ায় বন্ধ থাকে সেই স্থাপনা নির্মাণের কাজ। স্থানীয় গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন, আগের জায়গাতেই নতুন করে স্থাপনার নির্মাণ কাজ শুরু করবে সাব্রুম প্রশাসন। শুস্ক মওসুমে ওই এলাকাতেই ১০৯ কিউসেক গড় পানি প্রবাহের তথ্য জানাচ্ছে ভারত।

শুষ্ক মওসুম শুরু হওয়ার আগেই ফেনী নদী এখনই প্রায় শুকিযে গেছে। ছবিটি রামগড় পৌরসভার ফেনীরকূল এলাকা থেকে ৫ নভেম্বর, ২০১৯ দুপুরে তোলা।

এদিকে সাব্রুমের এপার রামগড় থেকে কয়েক কিলোমিটার ভাটিতে কালিয়াছড়ি পয়েন্টে ২০০৯ সাল থেকে পানির স্তর এবং পানির প্রবাহসহ ৭টি বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে দেখা যায় ২০১৩ সালের ২৩ মার্চ পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে সেকেন্ড প্রতি ৪.২৭ ঘনমিটার। একইভাবে ২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল রেকর্ড করা হয়েছে ৩.৯১ ঘনমিটার, ২০১৫ সালের ২১ মার্চ ৫.৮৯ ঘনমিটার, ২০১৬ সালের ৩০ এপ্রিল ৪.২২ ঘনমিটার এবং ২০১৭ সালের ২৭ মে ছিল ৬.৪৬ ঘনমিটার। যার গড় সেকেন্ড প্রতি ৪.৯৫ ঘনমিটার বা ১৭৪.৮০ কিউসেক। কিন্তু কোনভাবেই তা ৪০০ কিউসেক নয়।

এ প্রসঙ্গে যৌথনদী কমিশনের সদস্য কেএম আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি একটা আছে। এক এক উৎস থেকে এক এক ধরনের তথ্য আসছে। তবে সবগুলো তথ্য নিয়ে আমরা বিশ্লেষণ করছি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সঠিক তথ্যটি জানা যাবে।’

তাহলে ‘বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের’ ভিত্তিতে চুক্তি হলো কিভাবে? এমন এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার হোসেন বলেন, এটা ‍চুক্তি নয়, বলতে পারেন ‘অন্তর্বর্তীকালীন একটি সমেঝোতা’। যার ভিত্তিতে ভারত ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি নিয়ে সাব্রুম শহরে সরবরাহ করবে।

তিনি আরও জানান, ফেনী নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে ‍চুক্তি হওয়ার কথা সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শুধু ফেনী নদী নয় অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে তিস্তা, মনু, খোয়াই, ধলাইসহ ৭টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা চলছে। চলতি নভেম্বরে দিল্লিতে এ সংক্রান্ত কারিগরি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। খুব শিগগিরই হয়তো নদী ৭টির পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি হবে।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুমের দোলবাড়ি নামক স্থানে নো ম্যান্স ল্যান্ডের কাছে বসানোপাম্প হাউজের মাধ্যমে ফেনী নদী থেকে অবৈধভাবে পানি তুলে নেওয়া হচ্ছে। ছবিটি ৫ নভেম্বর, ২০১৯ তোলা

এদিকে, ফেনী নদী থেকে অবৈধভাবে ভারতের পানি তুলে নেয়ার প্রতিবাদ এবং প্রতিবাদ পরবর্তী ভারতের ‘পাল্টা প্রতিক্রিয়ার’ বিষয়ে কথা বলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সাবেক এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, সালটা ২০০৪-০৫ সাল হবে। রামগড়ের ওপারে নবীনপাড়া এলাকা দিয়ে পানি তুলতে ৩৪ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পাইপ বসানোর উদ্যোগ নেয় ভারত। পানিউন্নয়ন বোর্ড এতে আপত্তি জানালে বন্ধ হয়ে যায় তাদের পানি তোলার কাজ। পরে তারা একই পদ্ধতিতে মিরসরাই উপজেলার ওলিনগর সীমান্তের ওপারে আমলিঘাট এলাকায় পাইপ বসানোর উদ্যোগ নিলে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) বিএসএফ এর মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনাও ঘটে। ওই সময়ই বাংলাদেশ অংশের নদী ভাঙ্গন রোধে কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তখন তাতে আবার বাধা দেয় ভারত। ওই কর্মকর্তা জানান, ওই সময় ভাঙ্গন রোধে সিমেন্টের ব্লক নির্মাণ করা হয়েছিল। তাদের বাধার কারণে সেই ব্লক আর ফেলা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ওই কাজ আটকে ছিল। পরে অবশ্য সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ সম্পন্ন হয়।’

ফলে গঙ্গা-তিস্তা নিয়ে মূলধারায় আলোচনা সমালোচনার মধ্যে অনেকটা আড়ালেই ছিল ফেনী নদী। কিন্তু সেখানেও ঘটছে নানা সব ঘটনা। চুক্তি পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সরব হচ্ছে সেসব বিষয়। একই সঙ্গে পরিষ্কার হচ্ছে বর্তমানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রস্তুতিহীনতার প্রমাণও।

সাউথ এশিয়ান মনিটর

print

LEAVE A REPLY