ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ রক্ষা করছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যায়গুলো থেকে প্রতিদিনই, ভীতিকর নিয়তিমভাবে, খারাপ খবর আসছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতি অথবা দুটিই যুক্ত। পরিস্থিতি এতটাই নোংরা যে সেগুলো অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সমার্থক হয়ে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক অপরাধ সংঘটনের খবর আসছে। এগুলোর মধ্যে দেশের সেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে, এরই এক ছাত্র ফাহাদকে হত্যার ঘটনাও রয়েছে। কোন একক ব্যক্তি বা একটি গ্রুপ সমস্যা নয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনাতেই রয়েছে সমস্যা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাডেমিক বিবেচনার বদলে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত হচ্ছে।

সর্বশেষ ঘটনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)-কে কেন্দ্র করে। এখানকার ভাইস চ্যাঞ্চেলর (ভিসি) বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রশ্নে অত্যন্ত বিতর্কিত একজন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে তার অপসারণ দাবি করে আসছেন সেখানকার শিক্ষকরা। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের অনুগত হওয়ায় তার কিছুই হয়নি। বরং, দ্বিতীয় মেয়াদে তার বহাল থাকা নিশ্চিত হয়েছে।

চলতি বছরের মাঝামাঝি এখানকার একটি বড় ধরনের আর্থিক কেলেংকারি প্রকাশ হয়ে পড়ে। তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের এক কেন্দ্রীয় নেতা ভিসি’র কাছে বিপুল অংকের চাঁদা দাবি করে বসেন। এই নেতা দাবি করেন যে ভিসি ‘স্থানীয়’ ছাত্রলীগ নেতাদের ‘ঈদ বখশিশ’ দিয়েছেন। তাই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে তারা তাদের অংশ দাবি করেছেন।

এই ঘটনা বড় ধরনের জাতীয় কেলেংকারিতে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতা পদ হারান। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এদিকে বহিষ্কৃত ছাত্রনেতারা দাবি করেন যে এই দুর্নীতি চক্রে ভিসি ও তার পরিবার জড়িত। অবশ্য আজ পর্যন্ত এসব অভিযোগের কোন তদন্ত হয়নি।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য লেখার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের কর্মীরা। এই ঘটনা সবাইকে মর্মাহত করে। হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ থাকায় এটা আর অভিযোগের পর্যায়ে নেই। জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের কারণে কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়। অভিযুক্ত ঘাতকদের বিচার চলছে। ভিসি বলেছেন যে ছাত্রলীগের উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

চির তরুণ

বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে যুবলীগের বেশ কয়েকজন কর্মী গ্রেফতার হওয়ার পর এই বিষয়টি সামনে এসেছে। ‘যুব’ মানে ‘তরুণ’। কিন্তু এই সংগঠনের বেশিরভাগ নেতার বয়স চল্লিশ ও পঞ্চাশের কোটায়। আর প্রধান হলেন সত্তরোর্ধ বয়সী। দলের নামের সঙ্গে যা একেবারেই বেমানান।

তবে, দুর্নীতি, চাঁদাবাজী ও জুয়াড়ি চক্রের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতারের ঘটনা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এখন নতুন বয়সসীমা ৫৫ ঠিক করে দিয়েছেন। যা অন্তত ‘সীমাহীন তারুণ্য’ বিস্তারের চেয়ে ভালো।

কিন্তু আসল কথা হলো, এসব যুব ও ছাত্র সংগঠনগুলো কি কাজ করবে তার কোন তালিকা নেই। তাই তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও কেউ কিছু জানে না। সাধারণ জনগণ মনে করে যে এদের মূল কাজ হলো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে সেটা তারা করে। আর সে কারণেই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে সেখানে দলীয় উদ্দেশ্য হাসিলকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি রাজনৈতিক দলের শাখা?

অনেক দিন ধরেই সমস্যা মোকাবেলা করছেন জাহাঙ্গীরনগরের ভিসি। ‘টেন্ডারের কমিশন’ চক্রের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পরেও সমস্যা যায়নি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা ভিসিকে তার বাসায় রেখে গেটে তালা লাগিয়ে দিয়েছিলো।

এ অবস্থায় তাকে ‘উদ্ধারে’ এগিয়ে আসে ছাত্রলীগ এবং তারা আন্দোলনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও আহত করে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কিন্তু বিক্ষোভ এখনো চলছে।

অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়া ভিসি বলেন যে ছাত্রলীগ কর্মীরা ‘গণঅভ্যুত্থান’ ঘটিয়ে তাকে মুক্ত করেছে। ছাত্রলীগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তার কথাগুলো কোন ভিসির মতো ছিলো না, ছিলো দলীয় কর্মীর মতো। তার এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিক্রিয়া ছিলো অত্যন্ত তীব্র।

আসলে ভিসি তো এই সিস্টেমেরই ফসল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বলে আর মনে করছে না সরকার। মনে করছে একটি রাজনৈতিক শাখা হিসেবে। যা আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের অনুগতদের দ্বারা পরিচালনা করতে হবে। এটা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই ভালো একটি মডেল। কিন্তু এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কল্যাণ নেই।

এই মডেল শিক্ষার মান ব্যাপকভাবে ক্ষুন্ন করবে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য হতে পারে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।

আর সে কারণেই ক্ষমতাসীন দলের পছন্দ এমনসব ভিসি, যারা দলের প্রতি অনুগত থাকবেন।

সাউথ এশিয়ান মনিটর

print

LEAVE A REPLY