পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াচ্ছে চীন

চীন-পাকিস্তান কৌশলগত জোট ৫ দশক ধরে জোরদার হচ্ছে এবং অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করার পর গত তিন মাসে পাকিস্তানের প্রতি চীনের অটল সমর্থন দৃশ্যমান। এসবের মধ্যে রয়েছে, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের পর কাশ্মীর নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক আহ্বানে জাতিসংঘে বেইজিংয়ের প্রভাব কাজে লাগানো, পাকিস্তানকে কালো তালিকায় না ফেলতে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সে (এফএটিএফ) ইসলামাবাদকে রক্ষা করা, আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী করতে সামরিক সমর্থন বৃদ্ধি করার প্রস্তাব।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ‘সরকারি’ চীনা ভাষার এক মিডিয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় শক্তিশালী বিমান বাহিনীর মোকাবিলায় পাকিস্তানের প্রয়াস সুস্পষ্টভাবেই পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য দেশটিকে জঙ্গি বিমান দিতে পারে চীন।

ওই প্রতিবেদনে বল হয়েছে, ভারত-পাকিস্তান সঙ্ঘাতের প্রেক্ষাপটে চীনা বিমান (জেএইচ-৭এ২২ সংস্করণ) কেবল ভারতীয় সৈন্যদের বিমান শক্তিকেই দমন করতে পারবে না, সেইসাথে পাকিস্তানি জঙ্গিবিমানগুলোকে আকাশযুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করবে।

বেইজিং মনে করে, পাকিস্তানের অর্থনীতি যুদ্ধের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো অবস্থায় নেই। এ কারণে জেএইচ-৭এ২২ প্রদান করার চীনা প্রস্তাবটি পাকিস্তানের আকাশসীমা শক্তিশালী করবে।

এ ব্যাপারে কী চুক্তি হয়েছে, তা জানা যায়নি, তবে স্পষ্ট যে সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে সরাসরি সামরিক সমর্থন দেয়ার কথা ভাবছে চীন।

বেইজিং-ইসলামাবাদ কৌশলগত অংশীদারিত্বে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধিতে চীনা সহায়তা প্রধান বিষয়। দুই দেশ অনন্য কৌশলগত জোটে আবদ্ধ। দুই দেশের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধ ভিন্ন হলেও উভয় দেশই একে অপরের কৌশলগত প্রয়োজন পূরণ করছে পরিপূরকভাবে। সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, অভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যই পাকিস্তান ও চীনকে একত্রিত রেখেছে ভারতকে কোণঠাসা করতে।

১৯৬৩ সালে শাকাসগাম ভেলি চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকতার দিকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ভারতকে সংযত রাখার জন্য এর পর থেকে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য যখনই পাকিস্তানের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে, তখনই চীন এগিয়ে এসেছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চাহিদা পূরণ করার জন্য। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে পাকিস্তানকে কূটনৈতিক সমর্থনও দিয়ে যাচ্ছে চীন। গত ৫ দশক ধরে তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টে পাকিস্তানকে সর্বাত্মক সহায়তা করেছে চীন। এগুলো হলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি, পাকিস্তানের স্থানীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা, এবং পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডার গড়তে সহায়তা।

১৯৬০-এর দশকের মধ্য ভাগে পাকিস্তানে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিপুল মাত্রায় রফতানি করা শুরু করে চীন। ওই সময় সহায়তার মধ্যে ছিল এফ-৬এস, স্লাউটার-ক্লাস অ্যাটাক ফাস্ট-প্যাট্রোল বোট, হুনাইন-ক্লাস অ্যাটাক্ট ক্রাফট, টি-৫৯এস ও টি-৬০এস। চীনা সরঞ্জাম পাকিস্তানের জন্য ছিল ক্রয়সাধ্য। আর চীনও সহজ শর্তে পাকিস্তানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করত।

১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার সামরিক সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। দুই দেশ যৌথভাবে কারাকোরাম-৮ প্রশিক্ষণ বিমান ও চতুর্থ প্রজন্মের জেএফ-১৭ বিমান নির্মাণের কাজ শুরু করে। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসের জন্য কারিগরি ও কৌশলগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্বল্প ব্যয়ের জেএফ-১৭ ছিল চমৎকার বিকল্প।

পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচিতেও অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে চীন। বিভিন্ন কারিগরি ও পরিষেবামূলক সহায়তাই বেশি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, পাওয়ার রিঅ্যাক্টর খাতে সহায়তাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রধান রফতানিকারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছ চীন। দুই দেশ গত ৮ বছর ধরে যৌথ বিমানবাহিনীর মহড়া চালাছে। বেইজিংয়ের সমর্থনেই পাকিস্তান আবেগগত ও মনোস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে ভারতের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান তৈরি করতে।

পাকিস্তানে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা রফতানি ও চীন-পাকিস্তান সীমান্তে ইলেকট্রনিক জঙ্গিবিমান মোতায়েনের সর্বশেষ ঘোষণাটি ভারতীয় নেতৃত্ব ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাবিদদের সতর্কতার সাথে দেখা প্রয়োজন।

সাউথ এশিয়ান মনিটর

print

LEAVE A REPLY