পেঁয়াজ বাজারের ‘আগুন’ এখন ‘দাবানল’, দাম ছাড়িয়েছে ২৫০

গত কিছুদিন ধরেই পেঁয়াজের বাজার ‘আগুন’। বাণিজ্যমন্ত্রী ‘নিয়ন্ত্রণে’র কথা বললেও আমদানির ঘোষণা, অভিযান— কিছুই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সেই আগুন। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আগুন যেন পরিণত হয়েছে দাবানলে। দাবানল নিমেষেই যেমন ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে, তেমনই পেঁয়াজের বাজারের দাবানলও যেন দামের পারদকে কোনোভাবেই নামতে দিচ্ছে না। একশ থেকে দেড়শ, দেড়শ থেকে ডাবল সেঞ্চুরির ল্যান্ডমার্কেও সন্তুষ্ট নয় সেই দাবানল। রাজধানীতে ছুটির দিনের বাজারে সেই দাবানল পেঁয়াজের দাম উঠিয়ে দিয়েছে আড়াইশ টাকার ‘পাহাড় চূড়া’য়। ক্রেতারা বলছেন, তরকারিতে নিত্যব্যবহার্য এই উপকরণের দামে নাভিশ্বাস তাদের আগেই উঠেছে। এখন রীতিমতো খাবি খাচ্ছেন তারা।

শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর শ্যামবাজার, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল কাঁচা বাজার, কাপ্তান বাজার, কারওয়ান বাজার আর উত্তরার পেঁয়াজের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পেঁয়াজের কেজি যে ২০০ টাকা ছিল— তা যেন সুদূর অতীত। একটু খারাপ মানেরও যে পেঁয়াজ, সেটাও মিলছে না ২২০ টাকার নিচে। কিছু কিছু দোকানো দেশি পেঁয়াজের দেখা মিলছে, তার দাম ২৫০ টাকা, কোথাও ২৬০ টাকা!

বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ না থাকায় তাদের কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। তবে যেসব ব্যবসায়ীর কাছে পেঁয়াজের মজুত আছে, তারা আরও বেশি লাভের আশায় ধীরে ধীরে সেসব পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ছেন— এমনটিও জানালেন তারা।

সকাল সাড়ে ৮টায় শ্যামবাজারের আড়তে বাজারে গিয়ে দেখা যায়, কোনো গুদামে পেঁয়াজ আছে, কোনো গুদামে নেই। যেসব গুদামে পেঁয়াজ আছে, সেখানে দাম চড়া। মিয়ানমারের পেঁয়াজ পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। আর দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে ২১০ থেকে ২২০ টাকায়।

শ্যামবাজারের ছোট আড়তদারদের চিত্র আরও ভয়াবহ। এক পাল্লার (৫ কেজি) নিচে পেঁয়াজ বিক্রিই বন্ধ হয়ে গেছে। আর এক পাল্লা দেশি পেঁয়াজের দাম পড়ছে ১২০০ টাকা থেকে ১২৫০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। পাশের সূত্রাপুর খুচরা বাজারে দেখা গেল, সেই দেশি পেঁয়াজই বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা কেজিতে। আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কিছুটা ‘কম’— প্রতি কেজি ২৩০ টাকা।

বণিক বাণিজ্যালয়ের ম্যানেজার হাশিম মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, পেঁয়াজের সরবরাহ নেই। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার পর কিছুদিন মিয়ানমার থেকে এনেছি। সেটাও বন্ধ করে দিয়েছে। টেকনাফের ঘাটে ট্রলারে কিছু পেঁয়াজ আসছে, তবে গতকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে দাম চড়া। টেকনাফেই কিনতে হচ্ছে ১৫০ টাকা দরে। ট্রাক ভাড়া ও অন্যান্য খরচসহ দাম পড়ছে ১৬০ টাকা। বস্তা থেকে অনেক পচা পেঁয়াজ বের হয়। সেগুলো ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। আবার বেশি দামে বিক্রি করলে অভিযান শুরু হয়। তাই পেঁয়াজ আনতে পারছি না।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানকে ইঙ্গিত করেই শেষ কথাগুলো বলেন হাশিম মিয়া। ওই অভিযানে কেনা দামের চেয়ে ‘অনেক বেশি’ দামে পেঁয়াজ বিক্রি করায় শ্যামবাজারের তিন দোকানকে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল। ওই অভিযান নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন অন্য ব্যবসায়ীদেরও।

পেঁয়াজ নেই— এমন একটি গুদামের একজন মালিক সারাবাংলার কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘সূত্রাপুরের সাবেক কমিশনার আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ সাহিদ শ্যামবাজারের পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার অধীনে অনেক গুদাম রয়েছে, যেগুলোতে হাজার হাজার পেঁয়াজের বস্তা রয়েছে। সেখানে কেউ অভিযান চালায় না। ওই সব পেঁয়াজ বাজারে ছাড়া হলে দাম আরও কমত।’ পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে— এমন আশঙ্কার কথাও বললেন এই আড়তদার।

সকাল ১০টা যাত্রাবাড়ী পেঁয়াজের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজের কেজি ২৪০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। বিক্রেতারা জানান, পেঁয়াজ বিক্রিতে কোনো লাভ নেই। আমদানি করা যে পেঁয়াজ আসছে, তার বেশিরভাগই পচা। যারা আগে পেঁয়াজ এনে রেখেছিলেন, তারাই কিছু লাভ করতে পারছেন।

পাশের খুচরা বাজারে দেখা গেছে, এক কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়। কেউ কেউ বিক্রি করছেন ২৬০ টাকায়। তবে কোনো ক্রেতাকেই এক কেজির বেশি পেঁয়াজ কিনতে দেখা গেল না। কেউ কেউ কিনলেন আধা কেজি। ২৫০ গ্রাম পেঁয়াজও কিনছেন কেউ কেউ।

দিলারা বেগম পেঁয়াজ কিনতে এসেছিলেন শনির আখড়া থেকে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় আসতে পেরেছেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতকালই (বৃহস্পতিবার) খবরে দেখলাম, পেঁয়াজ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। রাত পোহাতেই সেই পেঁয়াজ কিভাবে ২৫০ টাকা হয়ে যায়, মাথায় খেলছে না।’

যাত্রাবাড়ীতে খুচরা বিক্রেতা আলী রায়হান সারাবাংলাকে বলেন, সকালে আড়ত থেকে পেঁয়াজ কিনেছি ২৪০ টাকা কেজিতে। আর বিক্রি করছি ২৫০ টাকায়। আড়তেও দাম বেড়েছে, কারণ চট্টগ্রামে দাম বেড়েছে। হিলি দিয়ে তো কোনো পেঁয়াজ আসছে না।

সারাবাংলার সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট সৈকত ভৌমিক উত্তরার পেঁয়াজের বাজার ঘুরে জানালেন, সেখানকার অবস্থাও ভিন্ন কিছু নয়— দেশি পেঁয়াজের কেজি ২৬০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে ক্রেতারা আসছেন, পেঁয়াজের দাম জিজ্ঞাসা করছেন, এরপর কেউ নিরুপায় হয়ে যতটুকু না কিনলেই নয়, ততটুকু কিনছেন। ক্ষুব্ধ হয়ে পেঁয়াজ না কিনেও বাজার ছাড়তে দেকা গেছে কাউকে কাউকে। ক্রেতারা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে পেঁয়াজ খাওয়ার কোনো উপায় নেই।

উত্তরায় সুমন ইসলাম নামে একজন ক্রেতা বলেন, দেশি পেঁয়াজের দাম ২৬০ টাকা, আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ২৩০ টাকা। এই দামে পেঁয়াজ না খেলে কী হয়! যতদিন আগের দামে না ফিরবে, ততদিন পেঁয়াজ ছাড়াই তরকারি খাব।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজ বাজারের চিত্রও প্রায় একই। সেখানেও পেঁয়াজ ২৩০ টাকা থেকে ২৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে আগের মতো কেউ পেঁয়াজ কিনছে না। বিক্রি কমে যাওয়ায় বিক্রেতাদেরও মাথায় হাত পড়ছে।

কারওয়ান বাজারে পাতাসহ নতুন পেঁয়াজও উঠেছে। এককেজি পাতাসহ পেঁয়াজের দাম পড়ছে ১৫০ টাকা। পেঁয়াজের দাম শুনে ভিরমি খেয়ে অনেকে এই কাঁচা পেঁয়াজও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে, পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমুখী বাজার ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় গঠিত বাজার মনিটরিং টিম কাজ করছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডলের নেতৃত্বে চালানো হচ্ছে অভিযান। তবুও থামছে না পেঁয়াজের অস্থিরতা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শুক্রবার ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল সারাবাংলাকে বলেন, আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। মন্ত্রণালয় অনেক দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ওইসব পেঁয়াজ যেন সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করে বিক্রি করা যায়, তার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া অভিযান চালানোর মূল কারণ হলো— কেউ যেন পেঁয়াজ মজুত রেখে ব্যবসা করতে না পারে। আবার যার কাছে যেমন পাবে দাম নেবে— তা যেন না হয়।

তবে কর্তৃপক্ষ যত কিছুই বলুক না কেন, তাতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না ক্রেতারা। শ্যামবাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আড়তদারদের মতো তারাও আশঙ্কা করছেন, ট্রিপল সেঞ্চুরির ল্যান্ডমার্ক ছাড়াতে খুব বেশি সময় নেবে না পেঁয়াজ।

সারাবাংলা

print

LEAVE A REPLY