বাংলাদেশের সামনে আঞ্চলিক সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ দেশ হিসেবে ভৌগলিক বৈচিত্রের উপর নির্ভরশীল। ভারত ও মিয়ানমার দিয়ে ঘেরা থাকার অর্থ হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্কের বিষয়টি আঞ্চলিক সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য চরম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সীমান্তে ভারত আর মিয়ানমার তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের বহিপ্রকাশ ঘটাতে শুরু করার কারণে এই সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে গেছে।

জাতিগত নির্মূল অভিযানসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে মিয়ানমার। এই অভিযান থেকে প্রাণ বাঁচাতে এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মনোযোগ সত্বেও এখন পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি কোন সমাধান দেখা যাচ্ছে না। তাদেরকে স্থানান্তরিত করা হবে, না কি স্বেচ্ছায় ফেরত পাঠানো হবে, সে বিষয়ে কোন সমাধান হয়নি, নাগরিকত্ব বা জাতীয়তার বিষয় তো দূরের কথা। রোহিঙ্গারা এখনও রাষ্ট্রহীন অবস্থাতেই আছে।

বাংলাদেশে মিয়ানমারের প্রতি জনমানুষের নেতিবাচক ধারণার বিষয়টি যদিও স্পষ্ট হয়ে গেছে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর অনাস্থা বৃদ্ধি ও তাদের উপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে, কিন্তু রোহিঙ্গা সঙ্কট বাস্তবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যান্য দিকের উপর সেভাবে প্রভাব ফেলেনি।

মিয়ানমারের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের হতাশা থাকা সত্বেও দুই দেশ নিজেদের মধ্যে নৌ সীমা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধের মীমাংসা করেছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে, শরণার্থীদের ঢল নামার ঠিক পরপরই মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে ইন্সট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশান বিনিময় হয়েছে, যেখানে নাফ নদীর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্য ক্ষেত্রে ২০১৭ সালে যখন ক্রস-বর্ডার বাণিজ্য হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হয়, তখন মিয়ানমারের মুদ্রার ১২ শতাংশ পতনের কারণে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আসলে বেড়ে গিয়েছিল। দুই দেশই এখন চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যদিকে, ভারতের প্রতি বাংলাদেশের বর্তমান অনীহার বিষয়টিকে একটা বিস্ময়কর বৈপরীত্য মনে হবে কারণ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের উত্তেজনার বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠছে। এর মধ্যে এমন অভিযোগও রয়েছে যে, ভারত পানিচুক্তি অনুযায়ী সঠিকভাবে পানি দেয়নি, ভারতে বাংলাদেশের রফতানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা বাড়িয়েছে ভারত। সেই সাথে সীমান্তে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ১১০০ এরও বেশি বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে।

এইসব ইস্যু থাকা সত্বেও দুই দেশ এ যাবত মূলত একটা আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে কারণ তাদের পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয় রয়েছে এখানে। এর একটা উদাহরণ হলো চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর চুক্তি, যেটার মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য বাড়বে।

তবে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হয়তো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বদলে যেতে পারে, যেহেতু ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক বিতর্ক শুরু হয়েছে কারণ এতে বাঙালি মুসলিমদের মতো নাগরিকদেরকে ‘বিদেশী’ আখ্যা দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সুস্পষ্টভাবে বলেছে যে, এনআরসি ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ এবং এনআরসিতে যাদেরকে ‘বিদেশী’ আখ্যা দেয়া হয়েছে, তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের কোন উদ্বেগ নেই। তবে ভারতের আগ্রাসী আচরণের জন্য মূল্য দেয়া লাগতে পারে এবং বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সংযোগ, ও রেমিটেন্স নিয়ে মিয়ানমারের চেয়ে ভারতের স্বার্থ অনেক বেশি। বাংলাদেশ ভারতের অষ্টম বৃহত্তম রফতানিকারক গন্তব্য এবং ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৮.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে ভারত। সেই সাথে বাংলাদেশ ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম রেমিটেন্সের উৎস – ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পেয়েছে ভারত। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হলে সেটা বাংলাদেশের সাথে ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্কেরও ক্ষতি করবে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে গেরিলা গ্রুপগুলোকে দমন করা ভারতের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়ার যে কোন প্রচেষ্টার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আসাম ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ যদিও সামান্য, কিন্তু ব্যাপক ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশ – যাদেরকে এরই মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বোঝা বহন করতে হচ্ছে – তারা আসাম থেকে নতুন করে অভিবাসীদের বহন করতে পারবে না।

প্রতিবেশী দেশগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের নীতির নেতিবাচক শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি কোন সমাধান এখনও চোখে পড়ছে না। বিশ্বের স্পর্শকাতর একটা অঞ্চলে এটা নতুন করে একটা অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

সাউথ এশিয়ান মনিটর

print

LEAVE A REPLY