উপকার ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর সন্তুষ্টিই একমাত্র লক্ষ্য

সমাজে চলতে আমাদের অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এ সহযোগিতা যে কেবলই বিপদ ও সঙ্কটের মুহূর্তে প্রয়োজন হয় এমন নয়, বরং সহযোগিতা প্রয়োজন হয় খুশি ও আনন্দের প্রতিটি উপলক্ষেও। কেউ যদি বড় কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, তাহলে অন্যদের অংশগ্রহণেই তা পূর্ণতা পায়, আয়োজনটি সফল ও সার্থক হয়। শত শত মানুষের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করার পর যদি আশানুরূপ উপস্থিতি না হয়, তাহলে আয়োজকগণের আনন্দে ভাটা পড়বেই। আর এ অনুপস্থিতি যদি কোনো আপনজনের পক্ষ থেকে হয় তাহলে তো বলাই বাহুল্য। এমন কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় সম্পর্কেও ছেদ পড়ে। শিথিল হয়ে পড়ে আত্মীয়তা কিংবা বন্ধুত্বের বন্ধন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই আমরা পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর ভর করেই টিকে থাকি। কথা হল, যখন আমরা কারও কাছ থেকে সহযোগিতা পাই, উপকৃত হই, এর বিনিময়ে আমরা কী করতে পারি? এ উপকার ও সহযোগিতার বদলা আমরা কীভাবে দিতে পারি? এর কৃতজ্ঞতা আমরা আদায় করতে পারি কী করে?

সহযোগিতা ও উপকারের কত ধরন যে মানুষের সমাজে দেখা যায়! যারা অঢেল অর্থসম্পদের মালিক, তারা যেমন অসহায় ও অসচ্ছলদের সহযোগিতা করে থাকেন, ঠিক এর উল্টো অসহায়দের সহযোগিতা ছাড়াও ধনীরা একটা দিন পার করতে পারে না। শহরের মানুষ ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যায়। দুই-চারদিন বেড়ায়। এলাকার গরীব-অসচ্ছল প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের খোঁজ-খবর নেয়। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এতটুকু আন্তরিকতা পেলে গরিব মানুষের কৃতজ্ঞতার অন্ত থাকে না। আবার ধনীরা যখন শহরে চলে আসে, তখন গ্রাম থেকে নিয়ে আসা অসচ্ছল পরিবারের কাজের মানুষেরাই তাদের সুখকে টিকিয়ে রাখে। এ তো একটা উদাহরণ মাত্র। আমাদের সমাজে এমন উদাহরণের অভাব নেই।

সহযোগিতা ও ভালো কাজের একটি ছোট তালিকা বর্ণিত হয়েছে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীসে। হযরত আবু যার রা. থেকে বর্ণিত সেই হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমার ভাইয়ের চেহারায় তাকিয়ে মুচকি হাসাও তোমার জন্যে একটি সদকা। সৎকাজের প্রতি আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে বাধাপ্রদানও সদকা। পথ হারানো কাউকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়াটাও তোমার জন্যে সদকা। দৃষ্টিশক্তি দুর্বল- এমন কাউকে সহযোগিতা করাও তোমার জন্য সদকা। রাস্তা থেকে পাথর, কাটা আর হাড্ডি সরিয়ে দেয়াও তোমার জন্যে সদকা। ভাইয়ের বালতিতে তোমার বালতি থেকে একটু পানি ঢেলে দেয়াও তোমার জন্যে সদকা। (জামে তিরমিযী : হাদীস ১৯৫৬)।

সহযোগিতা যেমনই হোক, আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত- অন্যের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। বিশেষত যদি কখনো নিজের প্রতি দয়াকারী ব্যক্তিটির পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়, তার কোনো উপকার করার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তো অবশ্যই তা কাজে লাগানো উচিত। উপকারী ব্যক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এটা এক মোক্ষম সুযোগ। এ কৃতজ্ঞতা যদি কেউ প্রকাশ না করে, তাহলে সে সমাজের চোখে তো নিন্দিত হয়ই, সে নিন্দিত হয় মহান রাব্বুল আলামীনের কাছেও। প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি হাদীস: যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না। (জামে তিরমিযী : হাদীস ১৯৫৪)।

বোঝা যাচ্ছে, মানুষের অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা আদায় করা আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতারই অংশ। ইসলামের শিক্ষা তো এমন- যদি কেউ তোমার সঙ্গে অসদাচরণ করে তবুও তুমি তার প্রতি ভালো আচরণ করো; তোমার কোনো আত্মীয় যদি তোমার সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তার সঙ্গেও সম্পর্ক রক্ষা করে চলো। হযরত রাস‚লুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমার সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করো, যে তোমাকে বঞ্চিত করে তুমি তাকে দান করো আর যে তোমার ওপর জুলুম করে তুমি তাকে ক্ষমা করো। (মুসনাদে আহমাদ : হাদীস ১৭৪৫২)।

এই হচ্ছে মন্দ আচরণের বদলা! অন্যায় যদি কেউ করে, তাহলে অন্যায় পরিমাণ প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ যদিও আছে, কিন্তু কুরআন ও হাদীসে আমাদের উৎসাহিত করা হয়েছে আইনি এ অধিকারটুকু ছেড়ে দিয়ে ক্ষমার আচরণে নিজেদেরকে আলোকিত করতে। পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা: যদি তোমরা শাস্তি দাওই, তবে ঠিক ততখানি শাস্তি দিবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। তবে তোমরা ধৈর্য ধারণ করলে ধৈর্যশীলদের জন্য তাই তো উত্তম। (সূরা নাহল (১৬) : ১২৬)।

মন্দ আচরণের ক্ষেত্রেই যদি ইসলামের শিক্ষা এমন হয়ে থাকে, তাহলে উত্তম আচরণের বদলা কেমন হবে! উপকারীর উপকার কীভাবে স্বীকার করতে হয় এর একটি নির্দেশনা লক্ষ করুন। প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কাউকে যখন উপহারস্বরূপ কিছু দেয়া হয়, তখন সে যদি এর পরিবর্তে দেয়ার মতো কিছু পায় তাহলে যেন তা দিয়ে দেয়। আর যে এমন কিছু না পাবে সে যেন তার প্রশংসা করে। কেননা যে প্রশংসা করল সেও কৃতজ্ঞতা আদায় করল। আর যে লুকিয়ে রাখল সে অস্বীকার করল। (জামে তিরমিযী : হাদীস ২০৩৪)।

অর্থাৎ কেউ যখন কোনো উপহার দেয়, সম্ভব হলে তাকেও অন্য কোনো উপহার দেয়া উচিত। আর যদি এটা সম্ভব না হয়, তাহলে তার প্রশংসা করো। এতেও তার হক কিছুটা আদায় হবে। আরেক হাদীসে বলা হয়েছে: কারও সঙ্গে যখন কোনো ভালো আচরণ করা হয় এরপর সে যদি ভালো আচরণকারীকে বলে- জাযাকাল্লাহু খায়রান অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, তাহলে সে যথোপযুক্ত প্রশংসা করল। (জামে তিরমিযী : হাদীস ২০৩৫)।

inqilab

print

LEAVE A REPLY