ক্যাসিনোর এক আলীবাবা

বিশ্বখ্যাত আরব্য সাহিত্যের অমরগাথা আলীবাবা ও চল্লিশ চোরের কাহিনি সর্বজনবিদিত। হতদরিদ্র কাঠুরে আলীবাবার একটি গাধা ও কুঠারই ছিল সম্বল। একদা একদিন বনে কাঠ কাটতে গিয়ে পাহাড়ের গুহায় চল্লিশ চোরের লুকিয়ে রাখা রত্নভাণ্ডার দেখে ফেলেন তিনি। এর পর সবার অগোচরে সেই বিশাল ভাণ্ডার থেকে গাধার পিঠে করে নিয়ে আসেন বিপুল পরিমাণ হীরা-জহরত মণি-মাণিক্য; হতদরিদ্র আলীবাবা হঠাৎ করে বনে যান ধনাঢ্য ব্যক্তি। আরব্য উপাখ্যানের সেই আলীবাবার সাক্ষাৎ রূপ আলী আহম্মদ। আলীবাবা একটি মন্ত্র পড়ায় খুলে গিয়েছিল চোরদের রত্মভাণ্ডার। আর আলী আহম্মদের মন্ত্র হচ্ছে জুয়া, এর বদৌলতেই তিনি গড়েছেন সম্পদের পাহাড়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টাকা কামানো বেড়ে যাওয়ার পর আলী আহম্মদের স্ত্রীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। কাগজে কলমেই অন্তত আটটি বিয়ে করেছেন তিনি। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক রয়েছে এমন দুজন আমাদের সময়কে বলেন, আলী আহম্মদের আটটি বিয়ের ঘটনা কেবল জানাজানি হয়েছে। তিনি আরও অন্তত চার থেকে পাঁচটি বিয়ে করেছেন। এসব স্ত্রী ঢাকার বাইরে বসবাস করেন।

সূত্রের খবর, এক সময় নিউমার্কেট ও বঙ্গবাজারে চোরাই কাপড়ের কারবার ছিল আলী আহম্মদের। ভাণ্ডারির ভক্ত হওয়ায় তার নামের শেষেও তিনি ভাণ্ডারি ব্যবহার করে থাকেন। এ কারণে অনেকে তাকে ভাণ্ডারি বলেও ডাকেন। ১৯৯৫ সাল থেকে গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে নেতাদের ফুট-ফরমায়েশ খাটতে শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে জাফর মাস্টার নামের একজন ক্লাব পরিচালনার ইজারা পান। তার হয়ে বছর দুই ক্লাব পরিচালনা করেন আলী। তখন অবশ্য ক্লাবগুলোয় ক্যাসিনো কারবার শুরু হয়নি। ক্যাসিনোর ধুন্ধুমার কারবার শুরু হওয়ার পর, ২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে আধিপত্যের বিস্তার ঘটে আলী আহম্মদের। এর পর মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে সেই তিনিই এখন শতকোটি টাকার মালিক।

এ সময়কালেই তিনি অন্তত সাতটি বিয়ে করেছেন। শতকোটি টাকা ছাড়াও ৩০টি বাড়ি, অর্ধশতাধিক ফ্ল্যাট, প্রায় ৩০টি জমির প্লট ছাড়াও নামে-বেনামে বিপুল বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছেন এক সময় নেতাদের ফরমায়েশ খাটা আলী। মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্রে ক্যাসিনো কারবারের মূল হোতা আলী ক্লাবটিতে ওয়ান-টেন, তিন তাসসহ বিভিন্ন রকম জুয়ার আসর বসান। আর ক্যাসিনো তো রয়েছেই। এ সবের বদৌলতে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েন তিনি।

জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের প্রকৃত ইজারাদার ছিলেন হারুনুর রশিদ। কিন্তু ২০১০ সালের দিকে তার বিরুদ্ধে কূটকৌশলে নানা অভিযোগ তোলা হয়। ফলে তার ক্যাসিনো কারবার আপাতত বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪ সালে হারুনুর রশিদ মারা যান। এর পর ইজারা পান রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ইজারা-সংক্রান্ত এ নির্দেশ অগ্রাহ্য করে অগঠনতান্ত্রিকভাবে একটি প্রভাবশালী চক্র ক্যাসিনো ও ক্লাব পরিচালনার ভার তুলে দেয় আলী আহম্মদের হাতে।

এ ক্ষেত্রে আগে ইজারাপ্রাপ্ত হারুনুর রশিদের স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে জনৈক হোসনে আরা বিউটির নামে ক্লাবটির ইজারা নেন আলী আহম্মদ। অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, এই নারী প্রকৃতপক্ষে মৃত হারুনুর রশিদের স্ত্রী নন; তার স্ত্রীর নাম রুবিনা খাতুন, বসবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। নথিপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে বিউটিকে হারুনের স্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়। যদিও পরে আলী আহম্মদ নিজেই তাকে স্ত্রী করে ঘরে তোলেন।

হারুনের মৃত্যুর পর ইজারা পাওয়া রফিকুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, কাগজে কলমে ইজারা পেলেও কোনোদিন আমি ক্লাবে প্রবেশ করতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও বলা হয়, ওই হারুনের কথিত স্ত্রী বিউটিকে ক্লাবের ইজারা প্রদান অবৈধ। এতেও কাজ হয়নি। ক্লাবটি কব্জায় নিয়ে আলী আহম্মদ এটিকে ক্যাসিনো কারবারের আখড়া বানিয়ে ফেলেন। এহেন কর্মে নেপথ্য থেকে তার সঙ্গে যোগসাজশ ছিল যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের।

আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে কখনো সম্পৃক্ত ছিলেন না আলী। শাসক এ দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রভাবশালী এক নেতার সুপারিশে শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদ পান তিনি। এ জন্য ওই নেতাকে মোটা অঙ্কের অর্থ উৎকোচ হিসেবে দিয়েছিলেন আলী; দিয়েছিলেন নানা স্বর্ণালঙ্কারও। শাহবাগ থানা কমিটির শীর্ষ এক নেতাকেও এভাবে বাগে আনেন তিনি। বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও টাকার জোরে নব্য মুক্তিযোদ্ধা বনে যান আলী আহম্মদ, নিজের নামের আগে যুক্ত করেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’।

আলী আহম্মদের প্রথম স্ত্রী মনোয়ারা এবং সন্তান শফিক ও রানার নামেও রয়েছে অগাধ সম্পদ। কার্যত তাদের কোনো ব্যবসাই নেই। এসব সম্পদের উৎস বাবার ক্যাসিনো কারবার। যে ক্লাবে ক্যাসিনো কারবার চালিয়ে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন আলী আহম্মদ, সেই মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্র পর্যন্ত তার কাছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা পাওনা। কতিপয় নেতার ছায়া থাকায় এ অর্থ পরিশোধ করতে হয়নি তার।

সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে আলী আহম্মদের ৩০টি বাড়ি, অর্ধশত ফ্ল্যাট ও ১৫টি প্লট রয়েছে। এ ছাড়া গোপালগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বিপুল সম্পদ।

জানা যায়, ঢাকার জুরাইনে ‘আনিকা ভিলা’ নামে দশতলা একটি বিলাসবহুল বাড়ি, মাতুয়াইলের স্বপন মৃধা রোডে ‘সাজেদা ভিলা’ নামে সাততলা বাড়ি, একই রোডে স্ত্রী লাভলীর নামে ৬টি ফ্ল্যাট, রূপগঞ্জের ছনপাড়ায় একটি বাড়ি, টঙ্গীর তুরাগে ৩টি বাড়ি, মানিকনগর ওয়াসা রোডে ২টি ফ্ল্যাট, কালভার্ট রোডে একটি ফ্ল্যাট, এলিফ্যান্ট রোডে ২টি ফ্ল্যাট, সাইনবোর্ডের গিরিধারা এলাকায় একটি বাড়ি, সায়েদাবাদের জনপথ মোড়ের টাইলস মার্কেটে ৪টি দোকান, টঙ্গী বিসিক শিল্প এলাকায় ১৫ কাঠার প্লট, শ্যামপুর কমিশনার রোডে একটি বাড়ি, শনিরআখড়ায় একটি বাড়ি ও ২টি ফ্ল্যাট, আফতাবনগর প্রজেক্টে ৩টি প্লট, মানিকনগর পুকুরপাড়ে একটি বাড়ি, উত্তরায় নির্মাণাধীন ২টি বাড়ি, চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডারি এলাকায় একটি সুরম্য আটতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন আলী আহম্মদ।

গাজীপুরের মাওনায় সাড়ে আটবিঘা জমিতে বানিয়েছেন দৃষ্টিনন্দন বাগানবাড়ি। এ বাড়িতে গরু, মহিষসহ বিভিন্ন পশুপাখি পালনের পাশাপাশি মাছ চাষও হয়। এ ছাড়া কক্সবাজার ও ময়মনসিংহেও তার বাড়ি-ফ্ল্যাট ও জমির প্লট রয়েছে।

সূত্রমতে, নব্বইয়ের দশকে প্রথম বিয়ে করেন মনোয়ারা বেগম ববিকে। এ স্ত্রীর ঘরে দুই ছেলে-শফিক ও রানা। আলী আহম্মদের অধিকাংশ সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বও ছিল এ দুই সন্তানের ওপর। অন্যান্য স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করলেও নিয়মিত যাতায়াত নেই। তবে সবাইকেই তিনি কিনে দিয়েছেন একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ি।

জানা যায়, প্রথম স্ত্রী মনোয়ারা ও তার সন্তানেরা বেশিরভাগ সময় থাকেন এলিফ্যান্ট রোডের ফ্ল্যাটে। এর বাইরে গাজীপুরের মাওনায়ও তারা মাঝেমধ্যে থাকেন। এ স্ত্রীর ঘরে দুই সন্তান মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের ক্যাসিনো বাণিজ্যও দেখাশোনা করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী রাশিদা বেগমের জন্য রয়েছে ছনপাড়ায় বাড়ি ও ফ্ল্যাট। তৃতীয় স্ত্রী সাজেদা থাকেন মাতুয়াইলের সাজেদা ভিলায়। চতুর্থ স্ত্রী লাভলীর জন্য স্বপন মৃধা রোডে কিনে দিয়েছেন চারটি ফ্ল্যাট ও একটি প্লট। তিনি সেখানেই থাকেন। পঞ্চম স্ত্রী রোকেয়ার জন্য উত্তরায় বাড়ি করে দিয়েছেন। ষষ্ঠ স্ত্রী হোসনে আরা বিউটি থাকেন মানিকনগরে। সেখানে তার জন্য রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। সপ্তম স্ত্রী স্বপ্নাহারের জন্য ফ্ল্যাট রয়েছে শ্যামপুরে। আর কাগজে কলমে সর্বশেষ স্ত্রী বরিশালে রুমনের বোন নামে পরিচিত শিল্পী। গত এক বছর ধরে তার সঙ্গেই দাম্পত্য জীবনের অধিকাংশ সময় কাটাচ্ছেন আলী আহম্মদ।

স্বামী সম্পর্কে আলী আহম্মদের ষষ্ঠ স্ত্রী হোসনে আরা বিউটি বলেন, তার (স্বামী) এসব তথ্য আমি জানতাম না। পরে শুনেছি তিনি অনেকগুলো বিয়ে করেছেন। তবে আমার সঙ্গে এখন আর যোগাযোগ নেই। দ্বিতীয় স্ত্রী রাশিদা ও তৃতীয় স্ত্রী সাজেদাকে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তারা আর মুখ খোলেননি।

এসব বিষয় নিয়ে আলী আহম্মদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি কারণ তিনি এখন গা ঢাকা দিয়ে আছেন। তার মোবাইল ফোন নম্বরে কল করলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার বেশ কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বাড়ির কেয়ারটেকাররা তার অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিএম আতিকুর রহমান বলেন, আলী আহম্মদ শাহবাগ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কাগজে কলমে। আমরা তাকে চিনতাম না। তাকে নেতা বানানোর জন্য আমি কোনো সুপারিশও করিনি। কমিটি প্রকাশের পর সেখানে তার নাম দেখেছি। তিনি জানান, আলী আহম্মদকে বহিষ্কার করতে হলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নির্দেশনা লাগবে, নতুবা সম্ভব নয়। তাই তার কিছু করার নেই।

উৎসঃ   আ স
print

LEAVE A REPLY