এবার গুদামে ঢুকছে নিম্নমানের ধান-চাল

144680_1আমদানি করা নিম্নমানের গমের পর এবার নিম্নমানের ধান-চাল ঢুকছে সরকারি খাদ্যগুদামে। সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতারা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন, খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কার কাছ থেকে কী পরিমাণ ধান-চাল কিনতে পারবেন। এর জন্য সুপারিশকারী নেতারা নির্ধারিত টোকেন ব্যবহার করেন। ওই টোকেন নিয়ে যারা যাবেন, তাদের কাছ থেকেই ধান-চাল কিনতে বাধ্য ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। যারা এর প্রতিবাদ করছেন, তাদের ওপরই আওয়ামী লীগ-যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব হামলার ঘটনায় একাধিক মামলা হলেও হামলাকারীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, টোকেন নিয়ে আসা ব্যক্তিদের সরবরাহ করা অধিকাংশ ধান-চালই নিম্নমানের এবং আবর্জনাযুক্ত। বেশির ভাগই খাওয়ার অযোগ্য। এসব ধান-চাল কিনতে আপত্তি করায় সম্প্রতি একাধিক খাদ্যগুদামের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসব হামলা চালিয়েছে বলে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন। এসব ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ বলছে, ধান-চাল কেনা নিয়ে বিরোধের জের ধরেই এই হামলার ঘটনা ঘটছে। কর্মকর্তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করে এসব ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান চেয়েছে বাংলাদেশ খাদ্য পরিদর্শক সমিতি।

যোগাযোগ করা হলে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এসব ঘটনার কথা শুনেছি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, তার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও তিনি জানান।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলমান বাজারদরের চেয়ে কৃষকের কাছ থেকে একটু বেশি দরে ধান-চাল কেনে খাদ্যগুদামগুলো। কৃষককে বিশেষ সুবিধা দিতেই বেশি দরে ধান-চাল ক্রয় করে সরকার। তবে সরকারের কাছ থেকে কৃষক এ সুবিধা তেমন একটা পান না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা বাজার থেকে কম দামে ধান-চাল কিনে তা বেশি দামে গুদামে বিক্রি করে।

সরকারি সিদ্ধান্তে ১ মে থেকে কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল-গম সংগ্রহ শুরু করে খাদ্যগুদামগুলো। আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এ খাদ্য সংগ্রহ চলবে। চলতি মৌসুমে চাল কেনার টার্গেট ১০ লাখ, ধান এক লাখ ও গম আড়াই লাখ টন। ৩ আগস্ট পর্যন্ত চাল কেনা হয়েছে ছয় লাখ ৭২, ধান ১৮ হাজার ও গম দুই লাখ চার হাজার টন। খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অব্যাহত হামলার প্রতিবাদে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আগেই ৩০ জুন গম কেনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

খাদ্যগুদামের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা :গত ৫ মে রাজশাহীর তানোর উপজেলা খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা মইনুল ইসলামকে মারধর করেন ওই উপজেলার যুবলীগের সহসভাপতি রাকিবুল হাসান। এ ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, ঘটনার আগের দিন ১৫ টন গম নিয়ে ওই গুদামে যান রাকিবুল হাসান। নষ্ট এবং খাবার অনুপযোগী এসব গম গুদামে প্রবেশ করাতে অস্বীকার করায় স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে মইনুলের ওপর হামলা চালান রাকিবুল।

ঘটনা সম্পর্কে মইনুল বলেন, রাকিবুলের কাছ থেকে খাবার অনুপযোগী গম না কেনার কারণে তিনি হামলার শিকার হন।

তবে রাকিবুল দাবি করেছেন, তিনি তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিকে চাঁদা দিয়ে গুদামে গম বরাদ্দ দেওয়ার বন্দোবস্ত নিয়েছেন। গুদামের কর্মকর্তা ওই গম নিতে রাজি হচ্ছেন না। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।

গত ১৮ মে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন মেহেরপুরের গাংনী খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা ফুল জামাত আলী। এ ঘটনায় ওই দিনই গাংনী থানায় মামলা করা হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্ধারিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ধান-চাল না কেনার কারণেই এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ।

৩১ মে নিম্নমানের চাল সরবরাহে বাধা দিলে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন মেসার্স খান অটোরাইস মিলের মালিক নজরুল ইসলাম খান। এ সময় তিনি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে গালাগাল করেন। এ ঘটনায় নজরুলের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। নজরুল ইসলাম খান বটিয়াঘাটা ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার।

যোগাযোগ করা হলে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তিনি নিয়মিত ওই উপজেলার খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করছেন বলেও দাবি করেন।

পুলিশের চাকরিচ্যুত এএসআইর নিয়ন্ত্রণে ময়মনসিংহ সিএসডি :সম্প্রতি আনোয়ার হোসেন নামের এক ঠিকাদার ও তার সহযোগীদের দ্বারা হামলার শিকার হয়েছেন সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (কারিগরি) মো. আলাউদ্দিন, খাদ্যগুদামের ম্যানেজার সানোয়ার হোসেন ও খাদ্য পরিদর্শক আরিফুর রহমান। পুরনো নিম্নমানের ১২৪ টন চাল গুদামে জোরপূর্বক প্রবেশ করানোর অভিযোগ ছিল ঠিকাদার আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। ওই চাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়েই তারা গুদামের ভেতর হামলার শিকার হন। হামলার ঘটনায় একটি মামলা করা হলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে দুর্বৃত্তরা। এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। ২০০১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত আনোয়ার হোসেনের দ্বারা ১৭ কর্মকর্তা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ঠিকাদার আনোয়ার হোসেন একসময় পুলিশে চাকরি করতেন। কনস্টেবল হিসেবে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। এএসআই পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর পর তিনি ময়মনসিংহ খাদ্যগুদামের পাশে খুচরা হিসেবে চাল বিক্রি করতেন। একসময় তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় সিএসডিতে ঠিকাদারি শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ওই সিএসডির সবচেয়ে প্রভাবশালী ঠিকাদার। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আনোয়ার হোসেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে বিভিন্ন মিল মালিকদের নামে নিম্নমানের চাল-গম সরবরাহ করে আসছেন। গুদামের কর্মকর্তাদের বাধা উপেক্ষা করে নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করেন আনোয়ার। এর প্রতিবাদ করতে গেলে গুদামের কর্মকর্তারা রাজনৈতিক নেতাদের তোপের মুখে পড়েন। এমনকি জীবননাশের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগ নেতাদের টোকেন-বাণিজ্য :জানা যায়, গাংনী গুদামে কার কাছ থেকে ধান-চাল কেনা হবে, তা ঠিক করে দেন মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক। তিনি নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে নির্ধারিত টোকেন দিয়ে ওসির কাছে পাঠান। তবে ওই টোকেনধারীরা কেউই মাঠ পর্যায়ের কৃষক নন। তারা সবাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তাদের সরবরাহ করা ধান-চাল-গমও নিম্নমানের, খাবার অনুপযোগী।

গত ১৮ মে এম এ খালেকের সই করা কিছু টোকেন সমকালের কাছে রয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানের আওয়ামী লীগের নেতাদের নির্ধারিত টোকেন প্রমাণ রয়েছে সমকালের হাতে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এম এ খালেক সমকালকে বলেন, ধান-চাল কেনাকে কেন্দ্র করে খাদ্যগুদামে সব মৌসুমেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এসব বিশৃঙ্খলা ঠেকাতেই মূলত এই টোকেন পদ্ধতি করা হয়েছে। যাদের টোকেন দেওয়া হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা সবাই আওয়ামী লীগের কর্মী। এ ছাড়া তারা কার্ডধারী চাষিও। এ ধরনের টোকেন দিতে পারেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাদের টোকেন দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই আওয়ামী লীগের কর্মী। দলের কর্মী হিসেবে তারা এটুকু সুবিধা পেতেই পারেন। খাদ্যগুদামে ধান-চাল সরবরাহে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে এ টোকেন পদ্ধতি চালু করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

বাংলাদেশ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, ধান-চাল ক্রয়ে খাদ্যগুদামের কর্মকর্তারা মূলত সংশ্লিষ্ট এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের কাছে জিম্মি। তাদের মর্জি অনুযায়ী ধান-চাল ক্রয় করতে হয়। এর প্রতিবাদ করেও কোনো ফল পাওয়া যায় না। উল্টো জীবন ঝুঁকিতে পড়তে হয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, ওই দলের নেতাকর্মীরাই নিয়ন্ত্রণ করেন সংশ্লিষ্ট এলাকার খাদ্যগুদাম। তাদের নির্ধারিত টোকেনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যক্তির কাছ থেকে চাল-ধান-গম ক্রয় করতে হয়।

print

LEAVE A REPLY