ওদের জানিয়ে দাও’ চুয়াত্তরে যা লিখেছিলেন শাহরিয়ার কবির

মানুষের দুঃখ-দৈন্য এবং বিরাজমান সংকটের ছবি সমসাময়িক কথা সাহিত্যেও ফুটে উঠেছিল। চুয়াত্তরের নভেম্বরে শাহরিয়ার কবিরের একটি উপন্যাস ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। পরে এর একটি বর্ধিত সংস্করণ বের হয়।

‘ওদের জানিয়ে দাও’ উপন্যাসের একটি বর্ণনা এ রকম: ট্রেনের মতো বাসেও একই আলোচনা- জিনিসপত্রের দাম, দুর্ভিক্ষ, চোরাচালান এইসব। কুমিল্লায় দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম। সম্ভবত মৃত্যুর হার কম বলেই ভিক্ষুকের সংখ্যা বেশি। চলন্ত বাসেও কয়েকজন ভিক্ষে করছে। রাহেলা বাস থেকে নামার পর ওর সাজগোজ দেখে ভিখিরিরা হামলে পড়েছিল। দুঃখের ভেতরও পূরবীর হাসি পেলো।

কলেজে থাকতে পড়া মানিক বন্দোপাধ্যায়ের একটি গল্পের কথা মনে পড়ল-‘কেড়ে খায়নি কেন?’ এই মানুষগুলো যেদিন ভিক্ষে না চেয়ে গ্রাম থেকে লাখে লাখে শহরে ছুটে যাবে সব কিছু কেড়ে নেয়ার জন্য তখন কী হবে? বেশি দূর ভাবতে পারল না পূরবী। বাসের একজন যাত্রী, সম্ভবত আওয়ামী লীগের কোনো পাতিনেতা হবে, পরনে পায়জামা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির ওপর মুজিব কোট, তার ওপর উড়নির মতো গলায় চাদর ঝোলানো। স্থূলবপু লোকটা দুজনের জায়গা দখল করে পান চিবোতে চিবোতে গল্প করছিল। আশেপাশে অনুগত কয়েকজন গোগ্রাসে সেই গল্প গিলছিল। মুখের ভেতর পানের পিকটুকু অদ্ভুত কৌশলে জমিয়ে রেখে লোকটা বলল, ‘বুঝলা লাতুর বাপ, কাফনের কাপড় কিনতে কিনতেই আমি শ্যাষ হইলাম। ফকিরগুলো মরণের আর জায়গাও পায় না। সব আইস্যা মরে আমার এলাকায়। গতকালও চাইরটা মরছে ভেদবমি হইয়া।’ যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, থুতনিতে ছাগুলে দাড়িওয়ালা টাউট ধরনের লোকটা তোষামোদের সুরে বলল, ‘আপনের এলাকায় মরলে তো কাফনের কাপড় পায়। আমাগো এলাকায় মরলে কাফন আর কপালে জুটে না, হিয়াল কুত্তায় কামড়াইয়া খায়। আল্লার মর্জি, যাগো কপালে কাফনের কাপড় লেখা আছে হেরা আপনের এলাকায় গিয়া মরে। আল্লার নেক বান্দারাই কাফন পায়।

শাহরিয়ার কবিরের উপন্যাসের এ বিবরণ পাওয়া যায় লেখক, গবেষক, মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমদের সদ্য প্রকাশিত ‘বেলা-অবেলা: বাংলাদেশ ১৯৭২-১৯৭৫’ বইয়ে। বইটি প্রকাশ করেছে বাতিঘর।

মহিউদ্দিন আহমদ তার বইয়ে আরো লিখেছেন, ২২ নভেম্বর ১৯৭৪। খাদ্য-পরিস্থিতি সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী আবদুল মমিন জাতীয় সংসদে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাভাবিক অবস্থা মোকাবিলার জন্য আমাদের হাতে যদিও যথেষ্ট খাদ্য মজুত ছিল, কিন্তু ভয়াবহ অবস্থা মোকাবিলার জন্য আমাদের যথেষ্ট খাদ্য মজুত ছিল না।’ খাদ্যমন্ত্রীর বিবৃতির পর জাসদের সাংসদ আব্দুল্লাহ সরকার ‘অনাহারে ও ব্যাধির কারণে যারা মারা গেছেন, তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে সংসদে পাঁচ মিনিট নীরবতা পালনের’ প্রস্তাব দেন। আওয়ামী লীগের সাংসদ ডা. আসহাবুল হক ও শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। স্পিকার আবদুল মালেক উকিল সিদ্ধান্ত দেন, ‘অনেস্ট উইশেস অব দ্য হাউজ হিসেবে প্রসিডিংসে প্রস্তাবটি এভাবে উল্লেখ করা হবে: দুর্ভিক্ষজণিত কারণে, অনাহারে বা বন্যায় অথবা ব্যাধিজনিত কারণে বাংলাদেশে যেসব মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রতি এই সংসদ সহানুভূতি প্রকাশ করছে।’

বইয়ের আরেক অংশে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, ১৬ই ডিসেম্বর নতুন গজিয়ে ওঠা নকল মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যায় ছিলেন সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের বাড়াবাড়ি আচরণের কারণে মুক্তিযুদ্ধ অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একাত্তরে অনেকেই ভারতে গিয়েছিলেন, যাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সামান্যতম সম্পর্ক ছিল না। তাদের অনেকেই দেশে ফিরে অবরুদ্ধ মানুষের দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করতে শুরু করেন। তারা এমন একটা ধারণা তৈরির চেষ্টা করেন যে, যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়েছেন, তারা সবাই ‘মুক্তিযোদ্ধা’। আর যারা দেশের ভেতরে ছিলেন তারা সবাই ‘রাজাকার’। ৬ ফেব্রুয়ারি (১৯৭২) সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ খান ‘সিক্সটি ফাইভ মিলিয়ন কলাবেরটরস’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছাপলেন। দেশটা যেন দুই ভাগ হয়ে গেল।

১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘রাষ্ট্রপতির ৮ নং আদেশ’ নামে ‘বাংলাদেশ যোগসাজশকারী বা দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ, ১৯৭২’ জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অনুরোধে এই আইনের খসড়া তৈরি করে দিয়েছিলেন প্রবীণ আইনজীবী খান বাহাদুর নাজিমউদ্দিন আহমদ। পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে সরকার ১৫ জন প্রখ্যাত ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। এদের মধ্যে ছিলেন নুরুল আমীন, হামিদুল হক চৌধুরী, খান আবদুস সবুর, মাহমুদ আলী, ওয়াহিদুজ্জামান খান, খাজা খয়েরউদ্দিন, কাজী আবদুল কাদের, অধ্যাপক গোলাম আজম, শাহ আজিজুর রহমান,এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম, আবদুল জব্বার খদ্দর, রাজা ত্রিদিব রায়, অধ্যাপক শামসুল হক, ওবায়দুল্লাহ মজুমদার ও অং শু প্রু চৌধুরী। এক সপ্তাহ পরে দালালদের আরও বড় একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে কতজনকে গ্রেপ্তার ও সাজা দেওয়া হয়েছিল তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। পুলিশ বাহিনী দুর্বল থাকায় এবং দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগের হাতে থাকায় দালাল আইনের আবরণে অনেকেই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের সুযোগ পেয়ে যান। আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ হাজার ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং প্রায় সমানসংখ্যক ব্যক্তি পলাতক ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

দালাল আইনের বিরুদ্ধে অনেকেই সোচ্চার ছিলেন। জাসদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এ সম্পর্কিত রাষ্ট্রপতির ৮ নং আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছিল। মওলানা ভাসানী ১৯৭৩ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দালাল আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে আলটিমেটামও দিয়েছিলেন। ৩০ নভেম্বর (১৯৭৩) সরকার দালাল আইনে অভিযুক্ত ও আটক ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। ফলে ৩৪ হাজার ৪০০ জন আটক ব্যক্তি জেল থেকে ছাড়া পান। এদের অনেকেই মুসলীম লীগ, পিডিপি, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় অবশ্য উল্লেখ করা হয়েছিল যে, যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই বা অভিযোগের বিচারাধীন নন, কেবল তারাই সাধারণ ক্ষমার সুবিধা পাবেন।

print

LEAVE A REPLY