মহামারি : ‘দোয়া ও দাওয়া’ দুইয়েরই সমন্বয় দরকার

আরজু আহমেদ ।।

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন, ‘আল্লাহ পৃথিবীতে এমন কোনও রোগ দেন নি- যার প্রতিষেধক তিনি রাখেন নি।‘ বুখারী।

এর মানে হচ্ছে, সমস্ত রোগেরই প্রতিষেধক আছে। আমরা হয়ত তা জানি না। ফলত তা খুঁজে নেওয়া আমাদের কর্তব্য। সেটা আল্লাহর রহমেরই খোঁজ করা।

সুতরাং এটাও ইবাদাত। এই হাদীসের মধ্যে দিয়ে প্রকারান্তরে সেটাই বলা হচ্ছে। মানুষের কর্তব্য সেই প্রতিষেধকের অনুসন্ধান করা। আবিষ্কারে উৎসাহ দানই এর উদ্দেশ্য।

আদতে সপ্তম শতাব্দীতে পৃথিবীতে ইসলামের উত্থান ছিল এ যাবতকালের ইতিহাসে সবচে’ বড়ো বিপ্লব। কেবল প্রার্থনা কেন্দ্রিক ধর্মাচারের ব্যাপারেই নয় বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, আইন ও বিচার এবং বিজ্ঞানের বিস্তারেও তা ছিল বড়ো ঘটনা।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপারটাতেই একটু লক্ষ্য করুন।

খোদ রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাম সংক্রামক ব্যধির বিস্তার সম্পর্কে আলোকপাত করেন এবং কোয়ারেন্টাইনের ধারণা প্রবর্তন করেন।

ইসলামি খেলাফতের প্রাথমিককাল থেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্তারে কাজ শুরু হয়। এনাটমি, ফিজিওলজির ব্যাপারে মুসলমানদের অগ্রগতি ছিল তদানীং দুনিয়ার মধ্যে সর্বাপেক্ষা অগ্রগামী।

রক্তসঞ্চালন, ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডের অবস্থান ও যথাযথ কার্যপ্রণালী মুসলমানদের দ্বারাই প্রথম আবিষ্কৃত হয়।

কুষ্ঠ, বসন্ত, সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজের ক্ষেত্রে সে সময় পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত কোনও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়।

জীবাণুনাশক তথা এন্টিসেপটিকের আবিষ্কার মুসলমানদের হাতেই এবং সফল প্রয়োগ হয় খেলাফতকালে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসালয়গুলোতে।

ভিনেগার, গোলাপজল, এলোভেরা আর এলকোহল দিয়ে তাঁদের তৈরি করা স্যানেটাইজার এখনো অবধি সংক্রমণ প্রতিরোধে পৃথিবীর প্রধানতম অবলম্বন।

ইসলামি হাসপাতালগুলোই প্রথম হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি তথা হাসপাতাল স্টেরাইল করার ধারণা প্রদান করে। তখন ইউরোপে কোনও উপযুক্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থাই ছিল না।

শল্য চিকিৎসা তথা সার্জারির পায়োনিয়ার হচ্ছেন মুসলিমগণ। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর আবুল কাসিম আল জাহরাবি রহ. একাই দুইশো সার্জিকাল ইন্সট্রুমেন্ট আবিষ্কার করেন।

এর অধিকাংশই আজও ব্যবহৃত হয়। যেমন, সার্জিক্যাল রিট্র‍্যাক্ট্রর, ফোরসেপস, স্পেকুলা, স্কালপেল এর মত বহুল প্রচলিত যন্ত্রাদি।

হিজরি দ্বীতিয় শতক থেকে বাগদাদে গড়ে উঠা হাসপাতালগুলো মূলত আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থার রূপকার। সেখানে আলাদা আলাদা রোগের জন্য আলাদা ওয়ার্ড, আলাদা সার্জারি ও মেডিসিন এবং সংক্রামক ব্যধি ওয়ার্ড, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড ব্যবস্থা ছিল।

সেখানে পৃথক ফার্মাসি বিভাগ ছিল। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোয় নতুন চিকিৎসকদের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।

পৃথিবীতে এনেস্থিসিয়ার প্রয়োগও মুসলিমদের হাত ধরেই শুরু।

অপথালমোলজি অর্থাৎ চক্ষু চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং সাইকিয়াট্রির পৃথিবীর প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র ছিল বাগদাদ, কায়রো, আলেপ্পো আর দামেস্কে।

এক হাজার শতকের মধ্যে ইসলামি খেলাফতকালে অন্তত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল শিক্ষা কেন্দ্রের বিবরণ মেলে। যার প্রথম সূচনা নবম শতাব্দীতে। এরও প্রায় তিনশত বছরের অধিককাল পরে ইউরোপে প্রথম কোনও প্রাতিষ্ঠানিক মেডিক্যাল শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপিত হয়।

এটা ছিল আমাদের পূর্ববর্তীদের শিক্ষা। তাঁরা বিজ্ঞানের বিচারেও ইউরোপ থেকে ছিলেন কয়েক শতাব্দী এগিয়ে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এখন কেবলই কোনও কিছু হলে তাকিয়ে থাকতে ইউরোপ-আমেরিকার দিকে।

ইদানীং আমরা কেবল দোয়ার মধ্য দিয়েই পরিত্রাণ পেতে চাই। ইসলাম তো কেবলই এটা শেখায় না। খোদ আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিকিৎসা গ্রহণ করে। চিকিৎসা বাতলে দিয়ে আমাদের জন্য নিদর্শন রেখে গেছেন।

অবশ্যই আমরা দোয়া করব, আল্লাহ্‌র মূখাপেক্ষী থাকব। দোয়া করব যেন আরোগ্যলাভের মাধ্যম ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারি। আমরা তাঁরই দেওয়া প্রতিষেধকের সন্ধান করব। এই দিকে আমাদের কি কোনও মনোযোগ আছে?

আমাদের পূর্বপুরুষেরা তো আমাদের চে’ অধিক ইবাগাতগুজার ছিলেন। অনেক বেশি তাওয়াককুল করতেন। অর্থাৎ আরও অনেক বেশি ফেইথ বেইজড ছিলেন। আমরা তো সেদিকেও পিছিয়ে। এদিকেও পিছিয়ে। অথচ এই দুইয়েরই সমন্বয় খুব দরকার।

এই মূখাপেক্ষিতা, এই অক্ষমতা লজ্জার। আল্লাহ আমাদের উপর সহায় হন।

লেখকে ফেইসবুক পেইজ থেকে সংগৃহীত

print

LEAVE A REPLY