বিএনপিকে নিষ্ক্রিয় রাখার কৌশল সরকারের

BNPবিএনপিকে নিষ্ক্রিয় রাখতে দলটির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মামলার চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে সরকার। কোনো দাবি নিয়ে যখনই রাজপথে নামার প্রস্তুতি নেবেন; কিংবা সরকারবিরোধী কোনো পদক্ষেপে যাবেন খালেদা জিয়া, তখনই তার বিভিন্ন মামলা পুনরুজ্জীবিত করা হবে। নিষ্ক্রিয় রাখার অপর কৌশলটি হচ্ছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন বিষয়ে বিএনপিকে ধোঁয়াশায় ফেলে রাখা।
সরকারের সূত্রগুলো জানায়, রাজনৈতিক অঙ্গনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আলোচনা থাকলেও, সরকারের সিদ্ধান্ত মেয়াদের বাকি তিন বছর পূরণ করা। বিভিন্ন সময় এ ধরনের আলোচনা ছড়িয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি নিয়ে মাঠে নামলেও গ্রেফতার হতে পারেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, খালেদা জিয়া সক্রিয় হলেই সরকারের জন্য অস্বস্তি। রাজপথে কিছু করার শক্তি-সামর্থ্য না থাকলেও সরকারবিরোধী ক্ষুদ্র কোনো আন্দোলনও যেন গড়ে না ওঠে সেজন্য সতর্ক শাসকগোষ্ঠী। শুধু রাজপথ নয়; সরকারের কাছ থেকে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন আদায়ে যেন কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাতে না পারেন খালেদা জিয়াÑ সেজন্য তাকে বিভিন্ন মামলা দিয়ে চাপে রাখার চেষ্টা রয়েছে সরকারের।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা মানবকণ্ঠকে বলেন, দল হিসেবে তো বিএনপিই আর থাকছে না। ওরা এখন বেঁচে থাকার জন্য যে কোনো প্রক্রিয়ায়, দরকার হলে বিরোধী দলে বসেও একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। যে কোনো পদ্ধতিতে নির্বাচন দিলেই বিএনপি তাতে অংশগ্রহণ করবে। সরকার এখন আর নির্বাচনের দিকে নেই। সরকারের নজর এখন উন্নয়নে।
খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা মানবকণ্ঠকে জানান, বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করায় দলের এমপি লতিফই (এমএ লতিফ) তো বাঁচতে পারছে না। হাজার কোটি টাকার মানহানি মামলা হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটাক্ষ করে খালেদা জিয়া কিভাবে পার পাবে?
দলটির কয়েক নেতা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ বৈঠকের কথা তুলে ধরে বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ওই সভায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। তবে এটা শিডিউলে ছিল না। আগে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন আইনজীবী মোমতাজ মেহেদী। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ওইদিন বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে হবে না। মামলা করতে হবে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার জন্য সরকারের অনুমতি লাগে। পরে  ওই বৈঠকে মামলার সিদ্ধান্ত হয়।
দলের নেতারা বলেন, বিএনপি বা খালেদা জিয়া সরকারের জন্য এখন আর কোনো ফ্যাক্টর না।    দলের অন্য কোনো কৌশল নয়; কেবল তাকে চাপে রাখার জন্যই পুরনো মামলাগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে। এসব মামলা নিয়ে ব্যস্ত রাখতে পারলে সরকারবিরোধী অন্য কোনো কৌশলে মন দিতে পারবেন না। এজন্য সর্বশেষ ২৫ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের হয়। ওই দিনই আদালত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সমন জারি করে ৩ মার্চ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। শুধু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা নয়; সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় গাড়িতে পেট্রলবোমা মেরে যাত্রী হত্যা মামলার অভিযোগ গ্রহণের শুনানিও আগামী ২ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে ড্যান্ডি ডায়িং ঋণখেলাপির মামলাও। এছাড়া ক্ষমতায় থাকার সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির দুটি মামলার বিচারকাজ চলছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে। আরো অনেক নিষ্ক্রিয় মামলাও সক্রিয় হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
সরকারের সূত্রগুলো জানায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা, ২০ দলীয় জোটকে ভাঙার চেষ্টা, জাতীয় পার্টির দৃশ্যমান অস্থিরতা কিংবা সিলেটে জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর আগামী নির্বাচনে ভোট চাওয়ার মধ্য দিয়ে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা থাকলেও, সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের শিগগিরই কোনো নির্বাচনের পরিকল্পনা নেই। রাজনীতির নিরস মাঠে মাঝেমধ্যে আলোচনায় আসে মধ্যবর্তী নির্বাচন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় উঠে আসে বিষয়টি।
তাই পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এমন সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে। দলের বিকল্প চিন্তা হিসেবে এটিও ভাবছেন নীতিনির্ধারকরা। তারা বলছেন, একটি সুবিধাজনক সময়ে আগাম নির্বাচন দিয়ে সরকারকে আরো শক্তিশালী করার সুযোগ বর্তমান সরকার নিলেও নিতে পারে। তাছাড়া বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এটা মনে হচ্ছে সরকার যদি আগাম নির্বাচন দেয় তাহলে তারা খুশি মনেই অংশগ্রহণ করবে। দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তারা অংশ নেবে। এই ধারাবাহিকতায় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি সে নির্বাচন থেকেও দূরে থাকবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনাটা সামনে আসছে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তৃতাকে কেন্দ্র করে। ২১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেট সফরে গিয়ে সেখানে আয়োজিত এক জনসভায় বক্তৃতায় সিলেটবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনারা নৌকা মার্কাকে আগামীতে ভুলবেন না। নৌকাই শান্তি দেবে, নৌকাই উন্নতি দেবে, নৌকাই এদেশের মানুষের মুক্তি এনে দেবে।’
কোনো নির্বাচনের কথা উল্লেখ না করেই প্রধানমন্ত্রী নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন। দলের নেতারা বলছেন, হতে পারে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন মাথায় রেখেই মানুষের কাছে নৌকায় ভোট চেয়েছেন। আবার এমনও হতে পারে, আগাম সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই তিনি ভোট প্রার্থনা করেছেন। বিষয়টি দলের নেতাদের অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। তাই নেতারা বলছেন, আগাম নির্বাচনের বিষয়টি দলের আলোচনায় আপাতত নেই। প্রধানমন্ত্রীর মনে কী আছে সেটা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি অনুকূল মনে করলে, তিনি সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আনতেও পারেন। পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ খুবই ভালো ফলাফল করেছে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও যদি নৌকার একই রকম সাফল্য অব্যাহত থাকে, তাহলে আগাম নির্বাচন দিতে তিনি দ্বিধা না-ও করতে পারেন।
দলের নেতারা বলছেন, সরকারের সামনে এখন দৃশ্যত বড় ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। বিএনপি শান্ত। জামায়াত ছন্নছাড়া। অন্য কোনো উৎপাতও তেমন নেই। এ অবস্থায় সংসদ নির্বাচন করে জনপ্রিয়তা যাচাই করাটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে না হলে আগামী বছরের শুরুতে অথবা সুবিধাজনক অন্য কোনো সময়ে সংসদ নির্বাচন দেয়ার চিন্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করতেই পারেন।

print

LEAVE A REPLY