বিপুলসংখ্যক ইহুদি ইসরাইল ত্যাগ করছেন কেন?

yahudi_israel1যারা ক্রুসেডের ইতিহাসের ব্যাপারে আগ্রহী তাদের জিজ্ঞেস করুন ক্রুসেডারদের কিভাবে পতন ঘটেছিল? সারা দেশে তাদের গৌরবময় নগরদুর্গগুলোর সামান্য কিছু অংশের দিকে তাকালেই আমরা বিস্মিত হব। এই প্রশ্নের প্রচলিত জবাব হচ্ছেÑ ১১৮৭ সালে গ্যালিলি হ্রদের কাছে টুইন হিলসে দি হর্নস অব হাতিনের যুদ্ধে মহান মুসলিম সুলতান গাজী সালাউদ্দিনের কাছে ক্রুসেডাররা পরাজয় বরণ করেছিল। ক্রুসেডার রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিন এবং তার চতুর্দিকে আরো ১০০ বছর তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ক্রুসেডের ব্যাপারে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক পরলোকগত স্টিভেন রানসিম্যান ক্রুসেডারদের পরাজয়ের ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে একটি ভিন্ন ধরনের জবাব দিয়েছিলেন। তার মতে, ক্রুসেডার দেশ বা রাজ্যটি ধ্বংস বা বিলীন হয়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে বহু ক্রুসেডার তাদের নিজের দেশ তথা তাদের মাতৃভূমি বা পিতৃভূমি তথা নিজেদের বাপদাদার বংশানুক্রমিক দেশে ফিরে গিয়েছিল। অপর দিকে স্বল্পসংখ্যক লোক ক্রুসেডে অংশ নেয়ার জন্য সেখানে এসেছিল। পরিশেষে সেখানে যে স্বল্পসংখ্যক ক্রুসেডার ছিল তাদেরকে সাগরে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
ইসরাইলে যে ক্রুসেডার রাষ্ট্রটির ২০০ বছর ধরে অস্তিত্ব ছিল তার সাথে বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্রের বহু পার্থক্য রয়েছে। তবে অবশ্য দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মিল বা সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। এ কারণে তাদের ইতিহাস আমাকে সব সময়ই আকৃষ্ট করে। পরবর্তীকালে আমাকে রানসিম্যানের উপসংহারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। কারণ আমাদের সংবাদমাধ্যম আকস্মিকভাবে ইমিগ্রেশন বা দেশত্যাগের খবর প্রচারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কেউ কেউ সীমান্তে অস্থিরতার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে বলে মন্তব্য করে। এর দুটো কারণ হচ্ছেÑ প্রথমত, একটি টিভি নেটওয়ার্ক ইসরাইলি বংশধরদের হিব্রু ভাষায় যেটাকে ইউরদিম বলা হয় বিদেশে চলে যাওয়ার ব্যাপারে রিপোর্ট করে।
দ্বিতীয়ত, রসায়নে ইসরাইলের সাবেক দু’জন বিজ্ঞানীর নোবেল পুরস্কার লাভ। উভয় কারণে বেশ দুঃখ ও হতাশা সৃষ্টি হয় ইসরাইলিদের মধ্যে।
ডিসেন্ডারস বা বংশধর (ইউরদিম) হচ্ছে ইমিগ্র্যান্ট বা অভিবাসী শব্দের হিব্রু টার্ম। যেসব লোক ইসরাইলে বাস করতে আসত তাদেরকে ‘এসেন্ডারস’ (ওলিম) বলা হয়। এসেন্ডার শব্দটি পিলগ্রিম বা তীর্থযাত্রীর সমার্থক শব্দ। জেরুসালেম চতুর্দিকে পার্বত্যাঞ্চল দ্বারা পরিবেষ্টিত। চতুর্দিকে উপত্যকা রয়েছে। সুতরাং সেখানে পৌঁছার জন্য ওপরের দিকে উঠতে হবে। সম্ভবত এ কারণে ওই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অবশ্য ইহুদিদের আদর্শিক কোনো বিষয়ও এর সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে।
আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে এবং রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম কয়েক দশকের সময় আমরা নিজেদেরকে একটি সাহসী সমাজ হিসেবেই দেখেছি। ওই সময় অনেক বড় বাধা মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং কয়েকটি যুদ্ধ করতে হয়েছে। এখন মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং ওইসব জায়গা লোকবসতিহীন বা জনশূন্য দেখা যাচ্ছে। ঠিক যুদ্ধের সময় সৈন্যরা তাদের ইউনিট ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্য। আইজ্যাক রবিন তাদেরকে ‘জঞ্জাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। টিভির প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ভীতসন্ত্রস্ত ইসরাইলি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার উন্নত জীবনযাপনের জন্য বার্লিন, লন্ডন ও নিউ জার্সিতে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের ছেলেমেয়েরা ইতোমধ্যে হিব্রু ভাষা ছেড়ে বিদেশী ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে।
নি¤œশ্রেণীর লোক যারা সাধারণ সমাজে তাদের থাকার স্থান খুঁজে পাননি, তাদের অবস্থা ইসরাইলে খুবই খারাপ। মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীরা তাদের আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ তাদের বেতন খুব কম; কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অনেক বেশি। অবশ্য দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে দেশত্যাগের সংখ্যা কমেছে। আবার এখানে স্বাভাবিক সুশিক্ষিত তরুণ দম্পতি, ইসরাইলে জন্ম নেয়া হিব্রু ভাষায় দক্ষ ইসরাইলিও রয়েছেন। তাদের সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে, তারা ইসরাইলে মাস শেষ করতে পারেন না। ভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য তাদের মাঝারি পর্যায়ের বেতন অপর্যাপ্ত। এ দিকে জরিপে দেখানো হয়েছে, এমনকি আরব নাগরিকসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরাইলিরা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থায় সন্তুষ্ট।
অস্থিরতার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে দু’জন আমেরিকান রসায়নের প্রফেসরের নোবেল পুরস্কার অর্জন। এই দু’জন অধ্যাপক ইসরাইলে শিক্ষা লাভ করেন। তাদের একজন ইসরাইলের কিববুটজে জন্মগ্রহণ করেন। তারা তাদের নোবেল বিজয়ের জন্য গৌরব বোধ করেন। অনেক ইহুদি মনে করেন ইহুদিরা অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে অধিকতর ধীশক্তিসম্পন্ন। ইহুদি সম্প্রদায়ের ধনীরা তাদের কন্যাদের বিশেষভাবে তোরাহ পণ্ডিতদের কাছে বিয়ে দিয়ে গৌরব বোধ করে। অবশ্য কয়েক দশক আগে এসব স্কলার বা পণ্ডিত ব্যক্তি ইসরাইল ত্যাগ করে বিদেশে চলে গেছেন। তারা সম্মানজনক আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের গবেষণাকর্ম অব্যাহত রেখেছেন।
আগে তাদেরকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও এখন অবশ্য তেমনভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে না। দু’জনের মধ্যে একজন ইসরাইল ত্যাগ করার কারণ হচ্ছে ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট তাকে অধ্যাপক পদে যোগদান করার প্রস্তাব দেয়নি। কেন আমরা তাকে চলে যেতে দেবো? অন্যদের ব্যাপারে কী হবে?
সত্যিকারভাবে এটা ইসরাইলের কোনো সমস্যা নয়। বিশ্বে এখন মেধার যুদ্ধ বা প্রতিযোগিতা চলছে। একজন উচ্চাভিলাষী বিজ্ঞানী সর্বোত্তম ল্যাবরেটরিতে, অত্যন্ত সম্মানজনক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে চান। সারা বিশ্বের যুবমানস আমেরিকায় উড়ে যাচ্ছে। ইসরাইলিরা তার ব্যতিক্রম নন। আমাদের ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বিশ্বের ১০০ সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমাদের দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে; কিন্তু হার্ভার্ড অথবা এমআইটি প্রলুব্ধ করলে কে তাকে প্রতিরোধ করতে পারে।
(আগামি সংখ্যায় সমাপ্য)
লেখক : একজন ইসরাইলি লেখক। তিনি একজন শান্তিবাদী কর্মী। তিনি কাউন্টার পাঞ্চ’স বুক দি পলিটিকস অব অ্যান্টি-সেমিটিসিজমের একজন কন্ট্রিবিউটর
print

LEAVE A REPLY