ঘুরে দাঁড়াতে বিএনপির ব্যাপক পরিকল্পনা, কাজ করছে ছয় উইং

সমন্বয়ের দায়িত্বে তারেক, ফখরুল খসরু, শাহজাহান সাবিহউদ্দিন ও রিজভী

বারবার রাজপথের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে কৌশল পরিবর্তন করেছে বিএনপি। আপাতত রাজপথে নামার পরিকল্পনা না থাকলেও চুপচাপ বসে নেই দলটি। নীরবে নতুন করে ‘ঘুরে দাঁড়াতে’ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেছে সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত বিএনপি। দলকে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা, নিজেদের দাবির পক্ষে দেশে-বিদেশে জনমত তৈরি এবং সংগঠনকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন নেতা-সংগঠকরা। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে দলের হাইকমান্ড থেকে গঠন করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সমন্বয়ে ‘ছয়টি উইং’। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কেউ প্রকাশ্যে, কেউ অপ্রকাশ্যে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, ‘বিএনপি এখন দুঃসময় পার করছে। সরকারের মিথ্যা মামলা ও নির্যাতনসহ একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে আমাদের নেতাকর্মীরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। সব দিক থেকে সুসংহত হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির যা যা করা প্রয়োজন, তা করার চেষ্টাই চলছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। দেশ ও গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার মতো হঠকারী কর্মসূচি না দিয়ে দলটি গঠনমূলক রাজনীতি করছে। এমন কোনো কর্মসূচি দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপিকে দোষারোপ করার সুযোগও দিতে চান না তারা। এ জন্য বিএনপিকে দুর্বল ভাবা ভুল হবে।’

বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি আগামীতে সঠিক পদক্ষেপ নিতে চাইছে। আর কোনো বড় ধরনের ভুল করতে চায় না তারা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনের মতো হঠকারী কর্মসূচি দিয়ে তারা দল ও জনগণের ক্ষতি করতে রাজি নয়। দলটি আর চায় না ‘নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের’ অপবাদে দেশি-বিদেশিদের সমর্থন হারানোর পথে হাঁটতে। এ পরিস্থিতিতে দেশের ভেতর ও বাইরের শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ নিয়ে এবং নিজেরা নানা হিসাব-নিকাশ করে পরিকল্পিতভাবে সমন্বিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সামনে এগোতে চায়। আবার সূত্রটি এও আভাস দিয়েছে যে, এখন রাজপথের কর্মসূচি না দিলেও ভবিষ্যতের বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতিও হতে পারে এই নীরব প্রস্তুতি। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে না করে একতরফা করার চেষ্টা করলেও আন্দোলনে নামতে পারে বিএনপি। এসব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাষ করেই দলের হাইকমান্ড থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও যোগ্য নেতাদের দায়িত্ব দিয়ে ছয়টি উইং গঠন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, সব উইংয়ের প্রধান হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম তদারক করছেন। আগামী নির্বাচনের মেনিফেস্টো এবং নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখার খসড়া তৈরি করছে থিঙ্কট্যাঙ্ক উইং। ইতিমধ্যে এই উইংয়ের তৈরি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিএনপির ১৩ দফা প্রস্তাব ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য-উপাত্ত জনসমক্ষে উপস্থাপন করছে দলটি। দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে মহিলা দল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও জাসাসের কমিটি ঘোষণা করেছে বিএনপি। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মামুন আহমেদকে জাসাসের সভাপতি করার মাধ্যমেও নেতৃত্বের গুণগতমান বৃদ্ধির ইঙ্গিত বলেও জানায় সূত্রটি।

বিএনপির এক নেতা জানান, বেশ কিছুদিন দলের প্রবীণ ও সিনিয়র নেতারা নিষ্ক্রিয় থাকলেও বর্তমানে সবাইকে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দলের স্থায়ী কমিটি, কেন্দ্রীয় কমিটি এবং উপদেষ্টা পরিষদের অভিজ্ঞ, যোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক কলাকৌশল নির্ধারণে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে মতামত নেওয়া হচ্ছে।

রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ: দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সক্রিয় সদস্য, সহসভাপতি ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ উইংয়ে সমন্বয় করছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, সহসভাপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রমুখ।

বিদেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দলের শাখা কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের দায়িত্ব পালন করছেন লন্ডনে অবস্থানরত সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে সহায়তা করছেন দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন রাষ্ট্রে অবস্থানরত বিএনপির শীর্ষ নেতা ও দল সমর্থিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা। এ ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানকারী দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক এহসানুল হক মিলনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

থিঙ্কট্যাঙ্ক: দলকে যুগোপযোগী করে এগিয়ে নিতে একটি ‘থিঙ্কট্য্যাঙ্ক’ গঠন করেছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ উইংয়ের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন। দলের সহসভাপতি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। থিঙ্কট্যাঙ্কে বিএনপি সমর্থক সাবেক আমলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতারা রয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সদস্য বেতনধারী। মাসিক বেতনে কয়েকজন বিদেশিও থিঙ্কট্যাঙ্কে কাজ করছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও থিঙ্কট্যাঙ্কের সমন্বয়কারী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অচলায়ন থেকে বের হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে অসম অবস্থানে থেকে কাজ করে করা কঠিন। তারপরও দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে সুস্থ রাজনীতির চর্চা করছে বিএনপি। জেল-জুলুম উপেক্ষা করে অধিকার আদায়ের চেষ্টা করছেন তারা।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিএনপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগামী দিনের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে দলকে প্রস্তুত করছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইতিবাচক রাজনীতির জন্য পৃথিবীর সব দেশে বড় দলগুলোর গবেষণা সেল থাকে।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন: প্রভাবশালী দেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক উইং করা হয়েছে। বর্তমানে ওই উইংয়ের সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন সাবেক কূটনীতিক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহউদ্দিন আহমেদ। আরও রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সহসভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ রহমান, দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, কেন্দ্রীয় নেত্রী ব্যারিস্টার রুহিন ফারহানা প্রমুখ।

তৃণমূল পর্যায়ে দলের পুনর্গঠন: তৃণমূল পুনর্গঠনে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহানকে। তার নেতৃত্বে দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক নেতারা সারাদেশে দলের জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা কমিটিগুলো পুনর্গঠন করছেন। অবশ্য মাঠপর্যায়ে মামলা, গ্রেফতার ও ভয়ভীতির কারণে আত্মগোপনে থাকায় এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের ১০ মাস পরও সব কমিটি গঠন সম্ভব হয়নি। তবে মোহাম্মদ শাহজাহান সহকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন জেলার নেতাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তি করে দ্রুত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ করার জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। অনেক জায়গায় বাধাবিঘ্নের কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলন করতে না পারলেও যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য-উৎপাত্ত সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছেন। যা দলের মহাসচিব ও চেয়ারপারসনের কাছে হস্তান্তর করে সঠিকভাবে দল পুনর্গঠনে সহায়ক হচ্ছে।

বিএনপির সহসভাপতি ও তৃণমূল পুনর্গঠনে সমন্বয়কারী মোহাম্মদ শাহজাহান সমকালকে বলেন, ‘নানা বাধাবিপত্তি ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তৃণমূল থেকে সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার কাজ অব্যাহত রয়েছে। অনেক জায়গায় প্রশাসন ও সরকারি দলের বাধাবিঘ্নের কারণে সম্মেলন করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিজের উপজেলা ফেনীর ফুলগাজীতে চারবার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেও প্রশাসনের বাধায় তা করা সম্ভব হয়নি।’

ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স সমকালকে বলেন, ‘সরকারের নানা ফ্যাসিবাদের চাপের মধ্যেও দলকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

দাপ্তরিক কার্যক্রম: দপ্তর উইংয়ের সমন্বয় করছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হলেও কার্যত তিনি দপ্তর উইংয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে সহায়তা করছেন দলের সহ-দপ্তর সম্পাদকরা।

print

LEAVE A REPLY