আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অান্তদ্বন্দ্বে রাজশাহীর আ.লীগে অচলাবস্থা

রাজশাহী: ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রাজশাহীর আওয়ামী লীগে অান্তদ্বন্দ্ব এখন চরমে উঠেছে। মহানগর-জেলার সর্বত্রই এই দ্বন্দ্বের জাল বিস্তার করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপিরাও এ দ্বন্দ্বের পালে হাওয়া দিচ্ছেন বলে নেতাকর্মীরা দাবি করছেন। ফলে রাজশাহীর আওয়ামী লীগের অনেকটাই অবচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি জেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে দ্বন্দ্ব চরমে উঠে। মহানগর ও জেলার নেতারা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান। আর এতে মন্ত্রী-এমপিরাও পেছন থেকে ইন্ধন জোগান বলে স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য মতে, জেলা পরিষদ নির্বাচনে মহানগরের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ নেতাদের একটা বড় অংশ দলীয় প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুব জামান ভুলুর পক্ষে প্রচারণা চালান। অন্যদিকে কয়েকজন এমপি ও জেলার নেতাদের একাংশ স্বতন্ত্র প্রাথী মোহাম্মদ আলীর পক্ষে অবস্থান নেন। এ নিয়ে দলের ভেতরে অান্তদ্বন্দ্ব চরমে উঠে। সেই দ্বন্দ্বের আগুন এখন থানা-ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়েও ছড়িয়েছে।

ওই দ্বন্দ্বের জের ধরে সোমবার রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকারের সংবর্ধনা সভায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় এমপি আয়েন উদ্দিনের সমর্থকদের সঙ্গে জেলার সাধারণ সম্পাদক আসাদ সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার বলেন, এমপি আয়েনের নাম করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত এ হামলা করেছে।

জানা গেছে, সোমবার বিকেল চারটার দিকে রাজশাহীর মতিহারের কাপাশিয়ায় মহানগর টেকনিক্যাল বিজনেস এন্ড ম্যানেজমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। এসময় হামলাকারীররা মঞ্চ ও চেয়ার ভাংচুর করে। তবে কেউ হতাহত হয়নি। এসময় উভয়পক্ষের মধ্যে কিছু সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় সভাটি পণ্ড হয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, মহানগর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল এ্যান্ড কলেজ মাঠে জেলা পরিষদের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার ও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেয়ার আয়োজন করা হয়।

 

কলেজের অধ্যক্ষ জহুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ওই সংর্বধনা অনুষ্ঠান বিকেল চারটার দিকে শুরু হওয়ার পরপরই স্থানীয় আওয়ামী লীগের ৩০-৪০ জনের একটি দল এ হামলা চালায়। এসময় হামলাকারীরা মঞ্চ ও চেয়ার ভাংচুর করে। পরে মোহাম্মদ আলী সরকারের গ্রুপ ধাওয়া দিলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।

 

ওই অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ ও যুবলীগের সভাপতি আবু সালেহ প্রমুখ।

 

তবে এমপি আয়েন উদ্দিন বলেন, জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে বলে ওই অনুষ্ঠানে আমাকে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। সেই মোতাবেক আমি প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের নেতৃত্বে মোহাম্মদ আলী সরকারকে সংবর্ধনা দেয়ার ব্যানার টাঙানো হয়।’

 

এমপি আয়েন আরো বলেন, হঠাৎ করে ব্যানার পরিবর্তন করায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে বলে শুনেছি। তবে কারো ওপর হামলার কোনো খবর আমার জানা নাই। কেউ হতাহতও হয়নি। এমনকি আমার কোনো লোকজন ওই হামলায় অংশ নেয়নি।’

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আসাদের উপর হামলা পরিকল্পিত বলে একাংশের নেতারা। হামলার ধরণ ও পুলিশের নীবর ভুমিকা দেখে এমনটাই মনে করছেন নেতাকর্মীরা। কারণ হামলার কিছুক্ষণ আগে সেখানে পুলিশ থাকলেও হামলার সময় হঠাৎ করে পুলিশ সেখান থেকে গায়েব হয়ে যায়। এতে নেতাকর্মীরা মনে করছেন পুলিশকে ম্যানেজ করে এমপি আয়েন উদ্দীনদের ক্যাডাররা এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে।

এছাড়াও নেতাকর্মীরা মনে করছেন আসাদুজ্জামান আসাদের জনপ্রিয়তায় ইর্ষান্বিত হয়ে এমপি আয়েন উদ্দিনের নির্দেশে তার ক্যাডাররা পুর্ব পরিকল্পিতভাবে তাকে প্রাণনাশের জন্য এ হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের নেতার্মীরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় নেতারা জানান, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জনি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা উজ্জল, যুবলীগ কর্মী খোকন জামান, কাটাখালি পৌরসভা ছাত্রলীগের সভাপতি রাজু আহমেদ, পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি হৃদয়, ছাত্রলীগ কর্মী জয় এবং যুবলীগ কর্মী সোহাগ, সুরুজ, ডাবু, রানা, মানিক ও ইমন সরাসরি এ হামলায় অংশ নেন। তারা সবাই স্থানীয় এমপি আয়েন উদ্দিনের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়েছে। মতিহার থানার দুই ভ্যান পুলিশ ঘটনার পাঁচ মিনিট আগেও এখানে ছিল। কেন তারা চলে গেল, এ জবাব ওসিকে দিতে হবে। জবাব দিতে না পারলে ওসিকে প্রত্যাহার করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ আমাদের নিরাপত্তা দিয়েছে। রাজাকারপূত্র আয়েন আপনি দেখেন, জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। এই জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আপনার এই হামলার যথাযথ জবাব দেয়া হবে। আপনার মতো লেবাসধারী আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে জেলা আওয়ামী লীগের আগামি সভায় কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে পবা-মোহনপুর আসন থেকে আসাদুজ্জামান আসাদকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। কারণ আয়েন উদ্দিন এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। বিষয়টি তিনি বুঝতে পেরে গোপনে গোপনে আসাদুজ্জামান আসাদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, সামনে এমপি আয়েন উদ্দিন দলীয় মনোনয়ন নাও পেতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে আসাদুজ্জামান আসাদের উপর তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে হামলা চালিয়েছে।

অপরদিকে হামলার ঘটনার পর বিক্ষোভ করে আসাদ সমর্থকরা নেতাকর্মীরা। হামলার প্রতিবাদে সন্ধ্যার পর থেকে বিক্ষোভ সমাবেশ, পথসভা হয়েছে।

সোমবার সন্ধ্যায় নগরীর লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। বিক্ষোভ মিছিল থেকে আসাদুজ্জামান আসাদের উপর হামলার নিন্দা ও হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

পথসভায় সভাপত্বি করেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ফারুক হোসেন ডাবলু। বক্তব্য রাখেন রাজশাহী জেলা শ্রমিকলীগের সভাপতি আলহাজ্ব আবদুল্লাহ খান। উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক প্রভাষক শরিফুল ইসলাম, জেলা শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদ আলী, জেলা যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলী আজম সেন্টু, মহানগর যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদ আক্তার নাহান, ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন বকুল, রাজপাড়া থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাসির উদ্দিন রুবেল, সাধারণ সম্পাদক মো. মারুফ হোসেন সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। বক্তারা অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন এবং আয়েন এমপি কে দল থেকে বহিষ্কার করার জোর দাবি করেন। পথসভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল সরকার।

এছাড়াও বায়া, নওহাটায় নেতাকর্মীরাও বিক্ষোভ মিছিল করে হামলার প্রতিবাদ জানান।

এদিকে, হামলার ঘটনা স্বীকার করে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, অনুষ্ঠানকে ঘিরে আওয়ামী লীগের দুপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এমপি আয়েন উদ্দিনের উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি। এরই জের ধরে দুপক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে এঘটনায় কোন পক্ষ থানায় অভিযোগ দেয়নি বলে জানান তিনি।

print

LEAVE A REPLY