ছিনতাইয়ের হোতা ছাত্রলীগ নেতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় একের পর এক ছিনতাই, গুলি আর অন্যত্র খুন করে লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনার মূল হোতা ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ নেতারা। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা ঘটলেও সেগুলো ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিন ধরে কোনো তৎপরতা না থাকলেও অবশেষে শাহবাগ থানাপুলিশ গতকাল সূর্যসেন হলে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ ছিনতাই চক্রের হোতা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সুজনসহ ছাত্রলীগের ৭ ক্যাডারকে আটক করেছে। : ক্যাম্পাস এলাকায় আতঙ্কিত বোধ করার কথা জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকে। প্রায়ই ছিনতাই, চুরি, গুলির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ কোনো তৎপরতা চালায় না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পুলিশ কোনো অভিযান চালাতে পারে না। অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আরেফিন সিদ্দিক সুজনের ৩১৫ নম্বর কক্ষ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। গত রবিবার রাত ১২টার পর অভিযান চালিয়ে পুলিশ এসব উদ্ধার করে। সুজন ওই হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ওই কক্ষসহ বেশ কয়েকটি কক্ষ সুজনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সুজন ক্যাম্পাসে ছিনতাই সিন্ডিকেটের নেতা বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব কক্ষে অভিযান চালিয়ে সাত বহিরাগতকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩১৩ নম্বর থেকে পাঁচজন, ৩১৪ নম্বর থেকে একজন এবং ১০১ নম্বর কক্ষ থেকে একজনকে আটক করা হয়। ছাত্রলীগ নেতা সুজনের নিজের কক্ষ থেকে একটি চায়নিজ কুড়াল, একটি রামদা, একটি খেলনা পিস্তল, ককটেল তৈরির সামগ্রী এবং ইয়াবা তৈরির প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। ওই কক্ষে অস্ত্র, গুলি এবং ইয়াবা ছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে। অভিযানের পর থেকেই সুজন পলাতক। : ঢাবি প্রতিনিধি জানান, অভিযানের নেতৃত্ব দেন শাহবাগ থানার ওসি আবুবকর সিদ্দিক। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী এবং হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামালসহ হলের আবাসিক শিক্ষক ও পুলিশের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে তিনজনের বাড়ি গোপালগঞ্জে। তারা হলোÑ লিমন দাড়িয়া, মো. সানি ও মো. রিয়াজ। অন্যরা হলোÑ মো. টিটন (খুলনা), মো. তপু হোসেন (মুন্সীগঞ্জ), ইমন হোসেন (সাতক্ষীরা) এবং মো. সজীব (মাদারীপুর)। : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী জানান, তিনদিন আগে তিন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে ওয়ারী থানাপুলিশ। তারা পুলিশকে জানায়, তাদের মূল হোতা কাশেম (ছদ্মনাম)। কাশেম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে থাকেন। এরপর থেকেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সূর্যসেন হলে নজরদারি রাখা হয়। এ কারণে গত তিনদিন কাশেম হলে আসছিল না। রবিবার কোতোয়ালি থানাপুলিশ কাশেমকে গ্রেফতার করে। কাশেমের কাছ থেকে সুজনসহ অন্যদের নাম বেরিয়ে আসে। সুজনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই সূর্যসেন হলে অভিযান চালানো হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী জানান, যেসব কক্ষে অভিযান চালানো হয়েছে সেসব কক্ষে আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদের তথ্য ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, কাশেমের গ্রেফতারের খবর জানার পর ওইসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি সুজন পালিয়ে গেছে। : শাহবাগ থানার ওসি আবুবকর সিদ্দিক জানান, গ্রেফতারকৃতদের নামে ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং ডাকাতিসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় বেশ কয়েকটি মামলা আছে। এর মধ্যে কাশেমের নামে ওয়ারী থানায়ই সাতটি মামলা আছে। সম্প্রতি দিনের বেলায় ঢাবি ক্যাম্পাসে গুলি করে যে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তার সঙ্গে টিটন ও কাশেম জড়িত বলে তারা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। : ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগে যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের যে নেতার নাম এসেছে তদন্তে প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। : বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও প্রতিদিনই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অপরাধের এই অভিযোগ অস্বীকার করছেন না। তারা বলছেন, চারদিক খোলা হওয়ায় দুর্বৃত্তরা সহজেই ক্যাম্পাস এলাকায় অপকর্ম করে সটকে পড়তে পারছে। যে কারণে ‘চেষ্টা থাকলেও’ কিছু করা যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের সামনে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীর গুলিতে আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মনিরুজ্জামান মাসুদ। ওই সময় চার ছিনতাইকারী ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেন তিনি। তাতেই ছিনতাইকারীরা তাকে গুলি করে ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলের মাত্র কয়েক গজ দূরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনের সামনে ছিল একগাড়ি পুলিশ; আর যে পথে ছিনতাইকারীরা পালিয়েছে সেখানে পড়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি ও নিউমার্কেট থানা। এই স্থানে ছিনতাইকারীর গুলিতে আহত হন মনিরুজ্জামান মাসুদ। : এর আগে ৩১ জানুয়ারি সকালে একই স্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইমারত হোসেন ইমু। সার্জেন্ট জহুরুল হক হল থেকে ক্লাসে যাওয়ার পথে ক্লাবের সামনে এলে দুই ছিনতাইকারী চাকু দেখিয়ে তার মোবাইল ফোন ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। ছিনতাইয়ের মুখে গুলির আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল মাস দুই আগে। পলাশী থেকে চা খেয়ে হলে ফেরার পথে ব্যানবেইসের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ আল যুবায়ের ভূঁইয়ার মোটরসাইকেল আটকে দাঁড়ায় একটি প্রাইভেটকার। ঘটনা বুঝে মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে ফের পলাশীর দিকে আসতে চাইলে ছিনতাইকারীরা গাড়ির ভেতর থেকেই তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। : ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের একটি অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত লিওনি মারগারিটা কুলেনারার হাতব্যাগ চুরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে অবশ্য চোরকে আটক করা হয়। রাষ্ট্রদূতের ব্যাগ চুরির পর গ্রেফতার হয় দুই যুবক। একই বছরের ৯ অক্টোবর দুর্গাপূজা দেখতে আসার পথে নীলক্ষেত গেটের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রের স্ত্রীর গলা থেকে স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেয় দুই ছিনতাইকারী। এর আগে ৯ এপ্রিল দুপুরে দোয়েল চত্বরে রিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় আজম উদ্দিন নামের এক পোশাক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ডিবি পরিচয়ে সাত লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ২০১৬-এর মতো আগের বছরের ৯ এপ্রিল সন্ধ্যায়ও ছিনতাইকারীরা দোয়েল চত্বরকেই বেছে নিয়েছিল। এদিন রিকশায় বাসায় যাওয়ার পথে ল্যাপটপসহ ব্যাগ হারান এনসিসি ব্যাংকের কর্মকর্তা একরাম হোসেন। ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ টান দিলে একরাম নিজেও চলন্ত রিকশা থেকে নিচে পড়ে যান, ভাঙে তার হাত। ওইসব ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে বলে জানান ওসি আবুবকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার ক্লু পেয়েছি। এখন অপরাধীদের গ্রেফতার করার চেষ্টা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ছিনতাই ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে টহল বাড়িয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব জায়গায় ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো ঘটছে সেসব স্থান ও ক্যাম্পাসের প্রবেশ গেটগুলোতে সিসি ক্যামেরা লাগাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি।

print

LEAVE A REPLY