‘বাবাকে বলো না উঠে আসতে’

‘শহীদ ৫৭ জন আর্মি অফিসারের অনেকেই আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধার ছিলেন। একসঙ্গে চাকরিও করেছি। আজ তারা নেই। কেমন জানি শূন্য শূন্য লাগে। জানি এ শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়, পূরণ হয় না। তাদের স্মৃতি মনে করতেই কেন জানি ঠিক থাকতে পারি না। বুক ভেঙে আসে, চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।’ শিশুর মতো কান্না করছিলেন আর এসব কথা বলছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদ। যিনি শনিবার ভোর থেকেই বনানী সামরিক কবরস্থানে পিলখানা ট্র্যাজেডিতে শহীদদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন।

পিলখানা ট্র্যাজেডির আট বছর পূর্তিতে শনিবার সকালে বনানীর সামরিক কবরস্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, বিজিবি প্রধানসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও পরিবারের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। শহীদ মেজর মুমিনুল ইসলাম সরকারের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী, বাবা-মা, বোন ও একমাত্র শিশুসন্তান সাদাকাত বিন মমিন কান্না করছিল। শিশু সাদাকাত বাবাকে দেখতে পায়নি। বাবা শহীদ হওয়ার ১১ দিন পর এ পৃথিবীতে আসে সে। ছোট্ট সাদাকাত বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বাবাকে আমি দেখিনি, দেখতে অনেক ইচ্ছে করে। মা শুধু বলে বাবা নাকি আসবে, কিন্তু বাবা আসে না। আমার বাবা এখানে ঘুমিয়ে আছে, তোমরা বলো না, উঠে আসতে।’ ছোট্ট সাদাকাতের এমন কষ্টের কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।

মেজর মুমিনুল ইসলাম সরকারের স্ত্রী সোনিয়া বলেন, খুনিদের বিচার চলছে, রায়ও হয়েছে। কিন্তু আমরা এ রায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন দেখতে চাই। আট বছর অনেক সময়। আর কত সময়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শহীদ সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী জানান, এ দিনটিকে কেন শোক দিবস ঘোষণা করা হচ্ছে না। কেন এখনও ৫৭ সেনা কর্মকর্তার সম্মানে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ করা হচ্ছে না।

শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের অনেকেই এসেছিলেন। প্রিয় মানুষটির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সবাই কাঁদছিলেন। শহীদ কর্নেল গুলজার উদ্দীন আহমেদের স্ত্রী কবরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার দৃষ্টিতে যেন শুধুই শূন্যতা। চোখ দিয়ে গড়াচ্ছিল অশ্রু।

শহীদ মেজর মিজানুর রহমানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল দুই শিশু সন্তান তাহসিন রহমান ও ফারদিন রহমান। ১৭ বছর বয়সী তাহসিন রহমান বলে, ‘কেন এই হত্যাকাণ্ড? আমাদের কেউই উত্তর দেয়নি, কেন, কোন কারণে, কোন অপরাধে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো। এর পেছনের কারণ কী তা জানি না।’ ফারদিন রহমানের বয়স ১১ বছর। তারা দু’ভাই এতিম। বাবা শহীদ হওয়ার প্রায় ৯ মাস আগে তাদের মা রেবেকা ফারহানা ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মা-হারা এ দু’সন্তানকে মায়ের মমতা আর বাবার স্নেহ দিয়ে বাবাই ঘুম পাড়াতেন; খাওয়াতেন। ছোট্ট ফারদিন রহমান বলে, ‘বাবা ছিল, বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে।’ তারপর মাথাটি নুইয়ে কান্নাভেজা চোখ মোছে।

শহীদ মেজর সৈয়দ ইদ্রীস ইকবালের স্ত্রী ও দুই মেয়ে তাহসিনা ও নুসায়বা এসেছিল কবর জিয়ারত করতে। শিশু নুসায়বা বাবা শহীদ হওয়ার ছয় মাস পর জন্মগ্রহণ করে। তাদের মা ডা. তাসলিমা বলেন, ওদের কাছে বাবার গল্পই সবচেয়ে প্রিয়। আর্মির পোশাক পরা বাবার ছবি তাদের কষ্ট বাড়িয়ে দেয়। ওই পোশাক দেখলেই তারা কান্না করে, বাবার কথা বলতে থাকে।

শহীদ কর্নেল কুদরত-ই-এলাহীর কবরের গ্রিল ধরে বাবা হবিবুর রহমান কান্না করে বলছিলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে কেন নিয়ে গেলে না। আমার বাবাকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার নিশ্চয় আল্লাহ তুমি করবা। ঘাতকদের বিচার এ দেশের মানুষ দেখতে চায়।’ সরকার যেন দ্রুত রায় বাস্তবায়ন করে এমন অনুরোধও জানান তিনি। শহীদ মেজর মুমিনুল ইসলাম সরকারের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার বলেন, এখন আমরা দ্রুত রায় কার্যকর চাই। সন্তান দুনিয়ায় আসছে এমন আনন্দে মুমিনুল প্রায় সারাক্ষণই খুশিতে থাকত। কিন্তু, সেই সন্তান জন্মের ১১ দিন আগে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।

print

LEAVE A REPLY