এখন কী করবেন মাহমুদুর রহমান?

ঢাকা: দীর্ঘ ১৩২০ দিন কারাভোগের পর গত ২৩ নভেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। প্রায় দুই সপ্তাহ ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর বাসায় ফিরেন তিনি।

এরপর তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে ফের আইনি লড়াই শুরু করেন। এতে মাহমুদুর রহমানের করা এক আবেদন নিষ্পত্তি করে ৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ তার পাসপোর্ট ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন।

সুপিম কোর্টের রায়ে মাহমুদুর রহমানকে চিকিৎসার জন্য শুধু যুক্তরাজ্যে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু ইউকে চলে গেলে হয়তো তিনি দেশে ফিরে আসবেন না এমন অজুহাতে তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি। এরপরই মাহমুদুর রহমান প্রথমবারের মতো ৭ ফেব্রুয়ারি মিডিয়ার মুখোমুখি হন।

ওই সংবাদ সম্মেলনে তার ওপর সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের কথা তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আমি সব চাইতে অধিকার বঞ্চিত একজন নাগরিক। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় আমার চিকিৎসার অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়েছে। দীর্ঘ ৫ বছর কারাভোগের কারণে আজ আমি গুরুতর অসুস্থ। বিদেশে আমার চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু আদালত আমার চিকিৎসার জন্য শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাজ্য হাস্যকর কারণ দেখিয়ে আমার ভিসা আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। এই ঘটনায় আমি দুঃখিত হলেও অবাক হইনি।

যুক্তরাজ্যের ভিসা আবেদন খারিজের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, যুক্তরাজ্যের ভিসা কর্মকর্তা আমার ভিসা খারিজ করার হাস্যকর কারণ দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি নাকি যুক্তরাজ্যে গেলে নাও ফিরতে পারি। রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারি। কিন্তু আমার বয়স এখন ৬৩ বছর। যুক্তরাজ্যে থাকার চিন্তা আমি কখনোই করিনি এবং ভবিষ্যতেও করবো না। ১৯৮৬ সালে আমি প্রথম যুক্তরাজ্যে যাই। এরপর থেকে প্রতিবারই ৫ বছরের জন্য আমার ভিসা নবায়ন করা হয়।

সর্বশেষ ২০১২ সালে আমার চোয়ালের অপারেশনের জন্য লন্ডনে গিয়েছিলাম। তখনও আমার ওপর সরকারি দমন-পীড়ন চলছিল এবং আমি ৫০ টি মামলার ভিকটিম ছিলাম। সে সময়ও লন্ডনে থেকে যাওয়ার কোন চিন্তা আমার মাথায় আসেনি এবং অপারেশনের জন্য যে কয়দিন থাকা দরকার সেই কয়দিনই আমি সেখানে ছিলাম। আমার মনে হয় যুক্তরাজ্যের দৃষ্টিতে আমার অপরাধ আমি কেন ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি? আজ আমি যদি ইসলামের বিরুদ্ধের শক্তি হতাম, তাহলে আমাকে ভিসা চাইতে হতো না, ডেকে নিয়ে ভিসা দেয়া হতো।

তিনি আরো বলেন, আপনারা ইতিমধ্যেই জানেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৭টি মুসলমান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রদানে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সেখানে সফরে গিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে।

মুক্তির পর দুই মাসেরও বেশী সময় কোনো বক্তব্য না দেয়ার ব্যাখ্যাও দেন তিনি।

এরপর ১৩ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন তিনি। জেল থেকে মুক্তির লাভের পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কোনো সমাবেশে কথা বলেন তিনি।

এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ‘আমার দেশ’ এর ছাপাখানা খুলে দেয়ার দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আমার দেশ পরিবার আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন তিনি। সেখানে তিনি অবিলম্বে আমার দেশের প্রেস খুলে দেওয়ার দাবি জানান।

সর্বশেষ শনিবার গুলশানের একটি সেন্টারে ‘সীমান্ত হত্যা রাষ্ট্রের দায়’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে জনগণতান্ত্রিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠন। ওই সেমিনারে মাহমুদুর রহমানকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে বাধা দেয় পুলিশ। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপনের আগেই পুলিশের বাধায় সেমিনারটি বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, আজকের ঘটনা প্রমাণ করে বাংলাদেশ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। কারণ কোনো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয় তা আগে কখনো শুনিনি।

প্রসঙ্গত, আমার দেশ পত্রিকাটি বন্ধ থাকায় কয়েক হাজার সাংবাদিক-কর্মচারী দীর্ঘ চার বছর ধরে বেকার অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারের সংশ্লিষ্টরা ওই সময় বলেছিলেন, পত্রিকাটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ চার বছরেও সেই সাময়িক নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটেনি।

একদিকে পত্রিকা বন্ধ, অন্যদিকে মাহমুদুর রহমানকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। দেশের অভ্যন্তরেও তাকে কোনো সভা-সেমিনারে বক্তব্য রাখতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- তাহলে মাহমুদুর রহমান এখন কী করবেন? তার বন্ধ পত্রিকার সংবাদকর্মীরাই বা কী করবেন?

এ প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান বলেন, গত ২৩ নভেম্বর কাশিমপুরের ছোট কারাগার থেকে এখন আমি বাংলাদেশ নামের বড় কারাগারে। বর্তমান সরকারের ৮ বছরের মধ্যে ৫ বছরই কারাবন্দী ছিলাম। যেহেতু বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, সেহেতু যতটুকু চিকিৎসা করা সম্ভব দেশেই করবো, বাকিটা মহান আল্লাহর ইচ্ছা।

print

LEAVE A REPLY