ব্যারিস্টার আরমান ও বিগ্রেডিয়ার আজমীর জন্যও অপেক্ষায় গৃহবন্দী স্বজনরা

ঢাকা: দীর্ঘ সাত মাস পর বিএনপি নেতা মরহুম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদেরকে ফেরত দিয়ে গেছে ‘অজ্ঞাত বাহিনী’।

বুধবার ৩টার দিকে ‘অজ্ঞাত বাহিনী’ হুম্মাম কাদেরকে তাদের ধানমন্ডির বাসার কাছে রেখে যায় বলে জানা গেছে ।

পারিবারের সদস্যদের দাবি, সাত মাস আগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে হুম্মাম কাদের চৌধুরী নিখোঁজ ছিলেন।

বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বেশ কিছু ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ ছবিতে দেখা যায় হুম্মাম অনেক শুকিয়ে গেছেন। তার চেহারা বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল।

এদিকে দীর্ঘ সাত মাস পর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের বাড়ি ফিরে আসায় আশার সঞ্চার করেছে নিখোঁজ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে বিগ্রেডিয়ার আবদুল্লাহিল আমান আজমী এবং মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিষ্টার আহমদ বিন কাশেমের (আরমান) স্বজনদের মাঝে। তারা আশা করছেন আজমী ও আরমানও একদিন ফিরে আসবেন। পথ পানে তাকিয়ে আছেন কখন তারা ফিরবেন।

এ ব্যাপারেও মীর কাশেম আলীর খোন্দকার আয়েশা বলেন, আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত যে কতটা কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা কাউকে বুঝাতে পারবো না। সব সময় পথের তাকিয়ে থাকি- এই বুঝি আমার সন্তান (আরমান) ফিরছে। সাত মাস পর হুম্মাম কাদের বাড়ি ফিরে আসায় আমরা কিছুটা হলেও আশাবাদী একদিন আমার সন্তান ফিরে আসবে।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ৪ আগস্ট সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ৯ আগস্ট  মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিষ্টার আহমদ বিন কাশেম (আরমান) এবং ২২ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে বিগ্রেডিয়ার আবদুল্লাহিল আমান আজমীকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়েই বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে। নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাদের আর কোনো খবর নেই।

আরমান নিখোঁজ হবার সময় দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকা লিখেছিল আরমান‘আটক’। কিন্তু কোথায়, কারা তাকে আটক করেছে সেই তথ্য পত্রিকাটি আজো দিতে পারেনি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় তাদের পরিবার অজানা আতঙ্কে মুখ খুলতে নারাজ।

মিরপুর ডিওএইচএস-এর বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাশেম আরমানকে। তাকে উঠিয়ে নেয়ার আগের রাতে ইউনিফর্ম পরিহিত পোশাকে র‌্যাব গিয়েছিল বাসায়। তখন তাকে তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য চাপ দিলে আরমান জানতে চায় কেন যেতে হবে। তাদের সাথে কোনো ওয়ারেন্ট রয়েছে কিনা!

এই কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে র‌্যাব পরিচয়ধারীরা সেই রাতে তাকে না নিয়েই চলে যায়। কিন্তু পরের রাতে সাদা পোশাকে আসা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিয়ে মা‘ বোন এবং স্ত্রীর সামনে থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়।

তার ১৩ দিনের মাথায় সেনা বাহিনীর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা যিনি কর্মজীবনের শুরুতে সোর্ড অব অনার পেয়েছিলেন বিগ্রেডিয়ার আযমীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে নেয়ার সময় বাসার আসে পাশের রাস্তায় লাগানো সরকারি সিসি ক্যামেরাও খুলে ফেলা হয়। এমনকি বাসা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় লাগানো সিসি ক্যামেরাও তছনছ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবী করে ব্যরিস্টার আহমেদ বিন আরমানের এক খালাতো ভাই তার খালার খোজ খবর নিতে বাসায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সঙ্গে রান্না করা কিছু খাবারও নিয়েছিলেন খালার জন্য। মিরপুর ডিওএইচএসের বাসার সামনে প্রবেশ করতেই পুলিশের বিশেষ শাখার লোক তাকে আটকায়। কেন এই এলাকায় গিয়েছে, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি বলে প্রায় এক ঘন্টা আটকে রাখে। পরে রান্না করা ও খাবার না নিয়েই মাত্র ২০ মিনিটের জন্য মীর কাশেম আলীর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়া হয়।

গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী। ৭ মাস পার হয়ে যাচ্ছে। তাদের পরিবার পথ চেয়ে অপেক্ষায়। কখন ফিরবে আপনজন। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে তাদেরকে আটকের বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করা হচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়। কিন্তু পুলিশ তাদের খুঁজে বের করার বিষয়ে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়নি।

এবিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাদের পরিবারের কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। অভিযোগ করলে পুলিশ তাদেরকে খুঁজে বের করবে।’

যেভাবে তাদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল:

গত ২২ আগস্ট রাত ১২ টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (সাবেক) আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে মগবাজার কাজী অফিস লেনের বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি ঘটনার দিন আইন শৃংখলা বাহিনীর ৮/১০টি গাড়ি ওই গলিতে প্রবেশ করে। তারা সবাই ছিলো সাদা পোষাকে। সাদা পোষাকে আসা ব্যক্তিরা মহল্লার সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলে এবং গলির বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়। প্রয়াত গোলাম আযমের বাসায় প্রবেশ করে তার বড় ছেলেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে প্রায় সাড়ে চার মাস পেরিয়ে গেলেও আযমীর কোন খোঁজ মিলেনি। আÍীয়রাও তার কোন সন্ধান পাননি।

বাড়ির কেয়ারটেকারকে উদৃত করে ঘটনার সময় জামায়াতে ইসলামীর ওয়েব সাইটে বলা হয় ‘আযমীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় গোয়েন্দা পুলিশের সদস্য কোথায় কোথায় সিসি ক্যামেরা আছে দেখিয়ে দিতে বলে। পরে তারা মহল্লা থেকে সিসি ক্যামেরা গুলো খুলে নিয়ে যায়।’

গোলাম আযমের লন্ডন প্রবাসী ছেলে সালমান আল-আযমী অভিযোগ করেন তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোথাও কোন মামলা নেই। শুধু গোলাম আযমের ছেলে হবার কারণেই সরকার পরিকল্পিতভাবে তাকে তুলে নিয়ে গুম করেছে।’

সাদা পোষাকে নিরাপত্তা বাহিনী গোলাম আযমের ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য শতশত মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাদেরই একজন মগবাজার কাজী অফিস লেনের দোকনদার আব্দুল মালেক। তিনি জানান, একজন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমরা সবাই দেখেছি। অথচ চার মাসেও তার খোঁজ মিলেনি।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমীর রহস্যজনক গুম বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহনগর পুলিশের রমনা থানার অফিসার ইনচার্জ মসিউর রহমানের কাছে। তিনি বলেন, ঘটনার সময় (২২ আগষ্ট) খবর পেয়ে পুলিশের একটি টহল দল কাজী অফিস লেনে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তার আগেই আগন্তুকরা সেখান থেকে চলে গেছে। ঘটনার পর দিন পরিবারের পক্ষ থেকে একটি তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করার জন্য লোকজন থানায় আসে। যেহেতু অভিযোগটি ‘তুলে নেয়ার’ তাই আমরা মামলা করতে বলেছি। কিন্তু তারা (আযমীর পরিবার)মামলা না করেই চলে গেছে।

৯ আগস্ট জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাশেমকে (আরমান) রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের বাসা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। ১০ আগস্ট আরমানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার পল্লবী থানায় এবিষয়ে জিডি করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন ৯ আগস্ট রাত ১১ টার দিকে সাদা পোষাকে একটি মাইক্রোবাস আরমানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় পাঁচ জন লোক তাদের বাসায় যায়। তারা কলিং বেল চাপলে তিনি দরজা খুলে দেন। ওই ব্যক্তিরা নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেয়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আরমানকে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। ওই ব্যক্তিরা কোন সংস্থার জানতে চাইলে তারা বিস্তারিত পরিচয় না দিয়ে শুধু আরমানকে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। কিন্তু আরমান তাদের সঙ্গে যেতে রাজি না হওযায় আরমানকে টেনে-হিঁচড়ে নিচে নিয়ে নামিয়ে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে তুলে নেন।

এবিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ দাদন ফকির বলেন, আরমানের স্ত্রী থানায় একটি জিডি করছেন। কারা তাকে তুলে নিয়েছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জিডির তদন্ত অব্যাহত আছে।

এবিষয়ে পল্লবী থানার ওসি দাদন ফরিক জানান, জিডির তদন্ত করেছি। কিন্তু কারা তাকে তুলে নিয়েছে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি।

একরকম গৃহবন্দী সবার পরিবার: বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (সাবেক) আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাশেমকে গুম করার মধ্য দিয়েই তৎপরতা থেমে যায়নি। দুজনের পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য এখন নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে থেকে একরকম গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর হয়রানী ও মারধরের শিকার হয়ে বাসার গৃহকর্মীরা অনেক আগেই চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। বাসার বাজার করতে গেলেও আসা যাওয়ার পথে পুলিশি তল্লাশীর মুখে পড়তে হয়।

পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসআই) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সার্বক্ষণিকভাবে ওই দুইজনের বাসায় কঠোর নজরদারি রেখেছে। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি অব্যহত রেখেছে। ফলে পরিবারের অপর সদস্যরাও একরকম গৃহবন্দী হয়ে পড়েছেন। কোনো স্বজন বাসায় দেখা করতে গেলে তাদেরকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এমনকি মারধরেরও স্বীকার হতে হয়। এমতাবস্থায় পরিবার দুটি অনেকটাই অঘোষিত কারাগারে দিনাতি পাত করছেন।

print

LEAVE A REPLY