মেট্রোরেলের মূল নির্মাণকাজ শুরুর আগেই দুর্ভোগ

মেট্রোরেল নিয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বসিত ঢাকার বাসিন্দারা। কিন্তু মূল কাজ শুরুর আগেই এখন যে দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা। বিশেষ করে মিরপুর এলাকায় যারা বসবাস করেন তাদের সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সইতে হচ্ছে যানজট আর ধুলাবালির অত্যাচার। অনেকেই এরই মধ্যে মিরপুর এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় বাসা নিয়েছেন। ভুক্তভোগীরা বলছে, মেট্রোরেলের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এলোমেলো কাজের কারণে তাদের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
অন্যদিকে মেট্রোরেল নির্মাণকালীন নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে যে সাত পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা তার কোনোটিই বাস্তবায়নের কোনো নজির চোখে পড়েনি এখন পর্যন্ত। আগামী জুন মাস থেকে মেট্রোরেল প্রকল্পের মূল নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার কথা। তার আগে গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে শুরু হয়েছে প্রকল্প এলাকায় থাকা বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাসসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার অবকাঠামো সরানোর কাজ। তবে দিয়াবাড়ি ডিপো থেকে পল্লবী পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার জনবসতি না থাকায় সেখানে সেবা সংস্থার লাইন সরাতে হবে না। তবে সেখানে সরু রাস্তা প্রশস্ত করা হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের মাঝ বরাবর মেশিন দিয়ে কালো পিচের সড়ক কাটা হচ্ছে। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তার প্রস্থ কমে যাওয়ায় ওই এলাকায় যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। ফলে দিনের অধিকাংশ সময়ই যানজট লেগে থাকছে। এর সঙ্গে রয়েছে ধুলাবালির যন্ত্রণা। এভাবেই গত কয়েক মাস ধরে উন্নয়নের ভোগান্তি সইছেন মিরপুর এলাকার বাসিন্দারা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্মাণ কাজের কারণে মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সাত ধরনের প্রস্তুতি কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন প্রকল্পের পরামর্শকরা। এর মধ্যে রয়েছে-প্রকল্প এলাকার ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করা, হকার উচ্ছেদের পর যাতে পুনরায় না বসতে পারে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা; প্রকল্প এলাকার সড়কে গাড়ি পার্কিং বন্ধ করা, সম্ভব হলে সড়কে একমুখী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা, পুরো মেট্রোরেলের পথে রিকশা চলাচল বন্ধ, পল্লবী থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত শাটল বাসসেবা চালু করা। হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের সামনে দক্ষ জট ব্যবস্থাপনারও পরামর্শ রয়েছে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
মিরপুর-১২ নম্বর থেকে নিয়মিত মতিঝিলে যাতায়াত করেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মশিউর রহমান। তিনি বলেন, উন্নয়নের আগে কিছুটা ভোগান্তি থাকবেই। সাধারণ মানুষও সেটা মেনে নেয়। এই ভোগান্তি কমাতে কর্তৃপক্ষের কিছু উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কিন্তু ঢাকার অন্য প্রকল্পের মতো মেট্রোরেল প্রকল্পের ক্ষেত্রেও দুর্ভোগ কমানোর কোনো কিছু দেখা যাচ্ছে না। ফলে নাগরিকদের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দা আফরোজা রিমার সঙ্গে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে পল্টনে অফিস যেতে যুদ্ধ করে বাসে উঠার যন্ত্রণার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজের যন্ত্রণা। আগে কাজীপাড়া থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত তেমন কোনো যানজট ছিল না বললেই চলে। আর এখন কী যে ভয়াবহ যানজট তা এই এলাকার বাসিন্দারাই জানে।’
‘এখনই এই অবস্থা। মূল কাজ শুরু হলে কী হবে আল্লায়ই ভালো জানেন’-মন্তব্য করে আফরোজা জানান সেই ভোগান্তির হাত থেকে বাঁচতে এখনই অন্য এলাকায় বাসা খোঁজা শুরু করে দিয়েছেন।
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মিলন রহমান বলেন, মূল সড়ক থেকে যে গলি দিয়ে আমাকে বাসায় যেতে হয় সেখানে কাটা হয়েছে। তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে মোটা মোটা লম্বা পাইপ। ফলে আমাকে অনেক দূরের রাস্তা ঘুরে বাসায় পৌঁছাতে হয়। এমনিতেই রাস্তায় যানজট, তার ওপর আবার গলির মুখ বন্ধ। ফলে অন্য সময়ের চেয়ে এখন আমার ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় বেশি লাগে।
শিখর পরিবহনের চালক শিমুল মিয়া জানান, মিরপুর-১০ নম্বর থেকে তালতলা পর্যন্ত পুরো রাস্তায় জ্যাম থাকে। এতে করে আগের চেয়ে ট্রিপ কমে যাওয়ায় তাদের আয়-রোজগারও কমে গেছে।
অন্যদিকে খুঁড়ে রাখা মাটি আর বালি স্তূপ করে রাখা হয়েছে সড়কের দুই পাশে। বাতাস দিলেই দেখা দিচ্ছে ধুলোর ঝড়। শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাত জুড়ে নির্মাণ সামগ্রী আর যন্ত্রপাতি রাখায় পথচারীরা নিরাপদে হাঁটতে পারেন না। এ ছাড়া যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং করে রাখার কারণে যানজট আরও বেড়ে যায়।
ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, বার বার রাস্তা না কেটে একবার রাস্তা কাটার মাধ্যমে সব কাজ শেষ করতে চাইছি আমরা। শুষ্ক মৌসুমেই কারওয়ানবাজার পর্যন্ত সেবা সংস্থার লাইন পুনঃস্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের কাজ দেশে প্রথম হওয়ায় প্রথমে কিছু সমস্যা হয়েছে। জনগণের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, আশা করি দুর্ভোগ অনেকখানি লাঘব হবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা সকালের খবরকে বলেন, উন্নয়নের আগে কিছু দুর্ভোগ সহ্য করতেই হবে। কম-বেশি অন্যান্য দেশেও এমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তবে যানজট নিরসনে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলে দুর্ভোগ অনেকখানি কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।
রাজধানীর উত্তরায় বেড়িবাঁধ সংলগ্ন দিয়াবাড়ি এলাকায় মেট্রোরেলের ডিপোর ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজও চলছে পুরোদমে। এখানেই থাকবে মেট্রোরেলের কোচ। ওয়ার্কশপ ও অন্যান্য দাফতরিক কাজ পরিচালনাও করা হবে। ২০১৮ সালের জুন নাগাদ এ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে পল্লবী, রোকেয়া সরণি, ফার্মগেট, দোয়েল চত্বর ও প্রেসক্লাব হয়ে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত চলাচল করবে মেট্রোরেল। ২০.১ কিলোমিটার দৈর্ঘের এই রুটে থাকবে ১৬টি স্টেশন।   কৌশলগত কারণে ২০১৯ সালের মধ্যে সরকার উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। বাকি অংশ ২০২১ সালের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের প্রথম এই মেট্রোরেল চালু হলে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে মাত্র ৩৮ মিনিটে। বর্তমানে ওই পথে বাসে যেতে সময় লাগে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা বা তারও বেশি। প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে মেট্রোরেল।

print

LEAVE A REPLY