ধর্মের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের বিরোধ নেই : প্রধানমন্ত্রী

পহেলা বৈশাখকে দেশের সব মানুষের উৎসব আখ্যায়িত করে এর সঙ্গে ধর্মকে না মিলিয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ সম্পূর্ণভাবে বাঙালি সংস্কৃতি। বাঙালির চর্চা। বাঙালি যুগ যুগ ধরে এই উৎসব পালন করে আসছে। এর সঙ্গে কোনো ধর্মের সংঘাতও নেই, কোনো ধর্মের সম্পৃক্ততাও নেই। ধর্মের সঙ্গে এই উৎসবের কোনো বিরোধ খোঁজার চেষ্টা করা কারোর উচিত নয়। ’

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর হাতিরঝিলে বিনোদন প্রকল্প ‘গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল ড্যান্সিং ফাউন্টেন’ এবং ‘অ্যাম্ফিথিয়েটার’ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি এগুলোকে নগরবাসীর চিত্তবিনোদনের জন্য ‘বাংলা নববর্ষ-১৪২৪’-এর উপহার বলে উল্লেখ করেন।

লেকের পানির ওপর নির্মিত এই অ্যাম্ফিথিয়েটার এবং মনোরম মিউজিক্যাল ড্যান্সিং ফাউন্টেন হাতিরঝিল প্রকল্পের অধীনে নগরবাসীর বিনোদনে নতুন সংযোজন। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বলে নির্মাতারা উল্লেখ করেছেন। এই অ্যাম্ফিথিয়েটারের আসনসংখ্যা দুই হাজার। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক ও ঢাকা ওয়াসার পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ যাতে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপিত হয়, সে জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। পহেলা বৈশাখ হচ্ছে একমাত্র উৎসব, যা সব ধর্মের মানুষ একত্রে উদ্‌যাপন করে। ’

পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠানকে ‘অনৈসলামিক ও হিন্দুয়ানি’ আখ্যায়িত করে তা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে কয়েকটি কট্টর ইসলামী সংগঠন। এর আগে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান জঙ্গি হামলার শিকারও হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইউনেসকোর কাছে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা ধর্মীয় কোনো বিষয় নয়। মাটি দিয়ে হাতি, ঘোড়া, থালা-বাসন এবং কাগজ দিয়ে ফুল তৈরি করা বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ’ তিনি বলেন, ‘এভাবে মানুষের বিনোদনে আজিমপুর, নিউ মার্কেট ও পলাশীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এবং দেশের অন্যান্য স্থানেও বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ ধারায় গড়ে উঠেছে বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্য। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকেই এটাকে নানাভাবে বিকৃত করতে চান। আসলে এর সঙ্গে কোনো ধর্মীয় সংঘাতের বিষয় নাই। ’ বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে নববর্ষের আগাম শুভেচ্ছা জানান।

অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। প্রকল্প পরিচালক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মোহাম্মদ মাসুদ প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও এলজিআরডি ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

বিদ্যালয় পর্যায়ে জঙ্গিবাদবিরোধী কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগ নেবে সরকার : হাতিরঝিলের বিনোদন প্রকল্পের উদ্বোধনের পর জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সে ময়মনসিংহ বিভাগের জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের একটা নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে, সেটা হলো জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস। যে করেই হোক এর হাত থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। ’

জঙ্গি-সন্ত্রাস কখনো ইসলামের পথ না উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিরীহ মানুষ হত্যা করা এটা কখনো ইসলাম অনুমোদন করে না। কিছু লোক অপকর্ম ও আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মটাকে কলুষিত করছে, বদনাম করছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করছে। ’

প্রধানমন্ত্রী শিক্ষক ও ইমামসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের কাছে নিজ নিজ ছেলেমেয়েদের খবর রাখতে অনুরোধ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কাউন্সেলিংয়ের জন্য আমরা হয়তো কিছু মানুষকে ট্রেনিং দিতে পারি, তাঁরা কিভাবে এই কাউন্সেলিংটা করবেন। এ ব্যাপারেও আমরা উদ্যোগ নেব। ’ তিনি বলেন, ‘এখানে প্রতি স্কুলে মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সিলর দেওয়ার একটা প্রস্তাব এসেছে। প্রতি স্কুলে হয়তো মনোবিজ্ঞানী কাউন্সিলর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আমরা ইতিমধ্যেই একটি উদ্যোগ নিয়েছি। আপনারা জানেন, আমি সূচনা ফাউন্ডেশন নামে একটি ফাউন্ডেশনও করেছি এবং সেখানে যারা এ ধরনের বিপথে যাচ্ছে বা যারা অটিস্টিক বা প্রতিবন্ধী রয়েছে, সেখানে তাদের কিছু কাউন্সেলিং প্রদান করা হচ্ছে। ’

বঙ্গবন্ধুর সময় ‘ইসলামের প্রচার-প্রসারে’ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর সরকার ইসলামের প্রচার-প্রসারে ‘যথেষ্ট কাজ’ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়নের জন্য দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কারো কাছে হাত পেতে নয়, আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।

মুখ্যসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর সঞ্চালনায় ময়মনসিংহ বিভাগের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের সময় আরো উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

print

LEAVE A REPLY