শত কোটি টাকার বাস মেরামত না করে নতুন বাস কিনছে বিআরটিসি

অযত্ন অবহেলা আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কয়েকশ কোটি টাকা মূল্যের ৫৪৫ বাস নষ্ট হয়ে পরে আছে বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোতে। সেগুলো মেরামত না করে আবারো নতুন করে বাস ক্রয় করার কথা ভাবছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পরিবহন কোম্পানী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কতৃপক্ষ-বিআরটিসি।
সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বিআরটিসির জন্য ইন্ডিয়া লাইন অব ক্রেডিটে ৬০০ বাস পাইপ লাইনে আছে। যেগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বহরে যুক্ত হবে। গত ২০ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন রাজধানীতে পরিবহন সংকট মেটানোর জন্য সরকার আরো ৪০০০ নতুন বাস নামানোর কথা ভাবছে। নতুন বাস কেনার ব্যাপারে মেয়রের সাথে আলাপ করে মে মাসে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও জানায় এই মন্ত্রী। তবে বিআরটিসি সূত্র বলছে তাদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বাসের সংখ্যা ১২০০। গত সাত বছরে সরকার বিআরটিসির জন্য ৯৫৮ টি বাস ক্রয় করলেও তা পরিচালনায় বিআরটিসি কতটা সফল হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে জনমনে। বিআরটিসির হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে তাদের মোট গাড়ীর সংখ্যা ১৫৩৮। এর মধ্যে চলাচলের উপযুক্ত ৯৯১টি। বাকি ৫৪৫টি অচলাবস্থায় পরে থাকলেও তা মেরামত না করে আবার নতুনকরে গাড়ী কেনা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির জন্য। নষ্ট বাসগুলো মেরামত না করে আবার নতুন করে গাড়ি নামানোর যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে না এর সাথে সংশ্লিষ্ট ও সাধারণ নাগরিকরা। তাদের অভিযোগ লুটপাটের মহা উৎসবের জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিআরটিসি। অন্যদিকে বিআরটিসি বলছে নতুন গাড়ি কেনা সম্পূর্ণ সরকারের ইচ্ছা। এখানে বিআরটিসির কোনো হাত নেই। বাস দেয় সরকার। বিআরটিসি কেবলমাত্র পরিচালনার ক্ষমতা রাখে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, রাজধানীতে চলাচলের জন্য সরকারের দেয়া বাসগুলো একদিনে কখনোই সবগুলো বাস জনগণের চলাচলের জন্য রাস্তায় নামায়নি বিআরটিসি। মাঝে মাঝে এর সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে যায়। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বিআরটিসির যখন চলাচলের উপোযোগী শহা¯্রাধীক গাড়ি ছিলো তখন তারা একদিনে সর্বোচ্চ ৯০০ গাড়ি নামিয়েছে। তবে সর্বনিম্ম একদিনে ৪৩০ টি গাড়ি রাস্তায় নামানোর রেকর্ড তাদের আছে বলে জানা যায়। বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন প্রতিষ্ঠানটির কর্তারা।
পূরাতন গাড়ি মেরামত না করে আবার নতুন গাড়ী কেনার কারণ কি জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জানান, বিআরটিসি গাড়ি ক্রয় করে না। সরকার কিনে বিআরটিসিকে কাছে দেয়। বিআরটিসি সেটা পরিচালনার মাধ্যমে জনগণকে সেবা প্রদান করে থাকে। কেনা না কেনা সম্পূর্ণ সরকারের ব্যাপার বলেও জানান তিনি। পূরাতন গাড়ি মেরামতের জন্য সরকারের কাছে কোনো সুপারিশ করা হয়েছিলো কি না জনতে চাইলে মিজানুর জানান, গাড়িগুলো মেরামতের জন্য তাদের প্রায় ৫০ কোটি টাকা দরকার। টাকা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। সরকার যদি বিআরটিসিকে টাকা দেয় তবে নষ্ট হয়ে থাকা গাড়িগুলো মেরামত করা সম্ভব হবে আর টাকা না দিলে মেরামত করা সম্ভব হবে না।
বহরের সবগুলো গাড়ি সড়কে নামানো হচ্ছে না এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমার জানামতে সড়কে নামার উপযুক্ত সকল গাড়ি রাস্তায় নামানো হয়। যদি কোনো ম্যানেজার গাড়ি সচল না থাকার পরেও রাস্তায় না নামায় এমন অভিযোগ প্রমানিত হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে যাত্রি না থাকার অযুহাতে রাজধানীর বেশকিছু রুটে গাড়ি চালাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। অথচ সেই সব রুটে ব্যাক্তি মালীকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ লাভজনকভাবেই তাদের গাড়ি চালাচ্ছে। রয়েছে তীব্র গাড়ির সংকট। এমন একটি রুট আব্দুল্লাহপুর-আজিমপুর রুট(২০৭)। যাত্রি থাকার পরেও এই রুটে কেনো গাড়ি চালাচ্ছে না জানতে চাইলে বিআরটিসির উপ-মহা ব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এম রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানায়, এই রুটে অন্য যে বাসগুলো চলছে সেগুলো সর্বোচ্চ ৪২ সিটের আর বিআরটিসির গাড়িগুলো সর্বনিম্ম ৭০ সিটের। তাই বিআরটিসির গাড়িগুলো পর্যাপ্ত যাত্রী পায় না। অথচ বেসরকারী পরিবহনের থেকে বিআরটিসির খরচ অনেক বেশী। তাই বাধ্য হয়ে এই রুটে গাড়ী বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মিরপুর-মতিঝিল রুটেও বিআরটিসিতে পর্যাপ্ত যাত্রী পাচ্ছে না বলে জানায় এই কর্মকর্তা। অথচ এই রুটে চলাচলরত যাত্রীরা জানায়, আগে যখন উক্ত রুটে বিআরটিসি চলত তখন যাত্রী বোঝাই থাকত। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই বিআরটিসি তাদের সার্ভিস বন্ধ করে দেয়। তাই পর্যাপ্ত গাড়ী না থাকায় দীর্ঘক্ষণ গাড়ির জন্য দাড়িয়ে থেকে অনেকটা কষ্ট করেই তাদের চলাচল করতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিসির এক জৈষ্ঠ কর্মকর্তা জানায়, বিআরটিসিকে নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র আছে। অন্য পরিবহন মালিকদের চাপের মুখে হোক বা তাদের থেকে কোনো অনৈতীক সুবিধা গ্রহণের বিনিময়ে হোক বিআরটিসিকে একদল স্বার্থানেশী লোক এগোতে দিচ্ছে না। ফলে আস্তে আস্তে ধ্বংসের মুখে পরতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য তিনি সরকার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্ত করে অপরাধীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবী জানন। তিনি বলেন, বিআরটিসিকে যদি এখনি কালো থাবা থেকে রক্ষা করা না যায় তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যাবে।
বিআরটিসির এমন বেহাল অবস্থার ব্যাপারে জানতে চাইলে সু-শাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, পর্যাপ্ত জবাবদিহীতা না থাকার কারনে এমন বেহাল অবস্থা প্রতিষ্ঠানটিতে। দুর্নীতি রোধ আর যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালনা করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থানে নেয়া সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

আস

print

LEAVE A REPLY