কথায় কথায় মামলা

কথায় কথায় মামলা। সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মুক্তমনাদের বিরুদ্ধে চলছে মামলা দায়েরের প্রতিযোগিতা। কখনো তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায়, কখনো মানহানির আবার কখনো রাষ্ট্রদ্রোহ। প্রতিপক্ষ বানিয়ে ঘায়েল করা হচ্ছে আইনের মারপ্যাঁচে। নির্বাচনী এলাকার বর্তমান এমপি দলের মনোনয়ন পাচ্ছেন না- পত্রিকায় এই লেখার কারণে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে ঠুকে দেয়া হচ্ছে ৫৭ ধারায় মামলা। সংশ্লিষ্ট সেই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে পাঠানো হচ্ছে কারাগারে। এমনকি চায়ের দোকানের কর্মচারীর সীকারোক্তির ভিত্তিতেও গণমাধ্যম কর্মীদের নামে দেয়া হচ্ছে মামলা। কথায় কথায় মামলা দায়েরের এ প্রবণতাকে স্বাধীন মত প্রকাশের ওপর চরম আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন আইনজ্ঞ, সাংবাদিক, মুক্তমনা, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী মহল। তারা বলছেন, যেসব মামলা করা হচ্ছে সেসব মামলার ভিত্তি, অভিযোগের সত্যতা কতটুকু তা যাচাই বাছাই হচ্ছে না। কারো বিরুদ্ধে কথা বললে, লিখলেই মামলা দেয়া কোনো গণতান্ত্রিক দেশে শোভনীয় হতে পারে না। এতে বাক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। আর ৫৭ ধারা বাতিলের বিষয়ে আইনমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও এ ধারায় একের পর এক মামলা দায়েরে বিস্ময় প্রকাশের পাশাপাশি এই আইনটি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান তারা।
মুক্তিযোদ্ধা ও হবিগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি গোলাম মোস্তফা রফিকের মালিকানাধীন স্থানীয় দৈনিক হবিগঞ্জ সমাচার পত্রিকায় ‘আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাচ্ছেন না মজিদ খান’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি সংবাদের জের ধরে মামলা করা হয় গোলাম মোস্তফা রফিকের বিরুদ্ধে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় দায়ের করা ওই মামলায় ১২ই জুন গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। এ নিয়ে ক্ষোভের পাশাপাশি আতঙ্কে আছেন সেখানকার সাংবাদিক সমাজ। মানিকগঞ্জে একজন বিচারকের বাসা বদলের মালবাহী ট্রাকের কারণে একটি অসুস্থ শিশুকে হাসপাতালে নেয়ার পথ আটকে যাওয়া সংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রকাশের জের ধরে ১৩ই জুন অনলাইন নিউজপোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাংবাদিক গোলাম মুজতবা ধ্রুবর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেন এক বিচারক। খুলনায় সিএমএম আদালতের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে দৈনিক সময়ের খবর পত্রিকার সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ান এবং দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার খুলনা ব্যুরো প্রধান কাজী মোতাহার রহমানের বিরুদ্ধে ১৪ই জুন আইসিটি আইনের ৫৭ ও ৬৬ ধারায় খুলনা সদর থানায় খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা মামলা করেন। গত ৩০শে মার্চ তথ্যপ্রযুক্তির আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয় কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের দপ্তর সম্পাদক, বেসরকারি বাংলাভিশন চ্যানেল, দৈনিক বণিক বার্তা ও অনলাইন পত্রিকা বিডি নিউজ ২৪ ডট কমের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হাসান আলী এবং কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সদস্য দৈনিক কুষ্টিয়া দর্পণের স্টাফ রিপোর্টার আসলাম আলীকে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী এক চায়ের দোকানের কর্মচারীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ওই দুই সাংবাদিককে এই মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২৯শে মে কুষ্টিয়া জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান হাসান আলী ও আসলাম আলী।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ইদানীং ৫৭ ধারায় যেসব মামলা হচ্ছে এবং যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে তা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে যারা প্রগতিশীল, গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, সুশাসনের কথা বলেন তাদের বিরুদ্ধেই এই ধারার প্রয়োগ হচ্ছে বেশি। তিনি বলেন, এটা স্পষ্ট এভাবে সরকার অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী লোকজনদের হাতে একটি মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। ফলে, বাক স্বাধীনতা বা ভালো কিছু বলার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। এতে গণতন্ত্রও নিঃসন্দেহে সংকুচিত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টে মূল ফটকের সামনে থেকে ভাস্কর্য সরানোর প্রতিবাদে গত ২৮শে মে আন্দোলনে নেমেছিল গণজাগরণ মঞ্চ। শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গণজাগরণ মঞ্চের মিছিলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটূক্তি করা হয়েছে-এমন অভিযোগে ঢাকা, গাজীপুর ও সুনামগঞ্জে গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার ও মঞ্চের কর্মী সনাতন উল্লাসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতারা। বিচারক মামলাগুলো আমলে নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পাশাপাশি ঢাকার একটি আদালতে ইমরান এইচ সরকারকে হাজিরের জন্য সমন জারি করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস মানবজমিনকে বলেন, যেভাবে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে তাতে মত প্রকাশকে হুমকিতে ফেলা হচ্ছে। এভাবে সরকার তার স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে পরমত সহিষ্ণুতা গুরুত্বপূর্ণ। যে কারো সমালোচনা হতেই পরে। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা মানুষ করতেই পারে। এই সমালোচনা মানতে হবে। আর এই মানতে পারার নামই গণতন্ত্র। ফেসবুকে সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে জড়িয়ে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন- এমন অভিযোগে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত ৫ই জুন রাজধানীর গুলশান থানায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। বনানীর ‘রেইনট্রি’ হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ‘রেগনাম’ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হোসেন জনির ছেলে সাদমান সাকিফকে ভুলে মাসুদ চৌধুরীর ছেলে হিসেবে উল্লেখ করায় আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়। গত ৮ই জুন ঢাকা মহানগর হাকিম নূরুন্নাহার ইয়াসমিন মামলার এজাহার গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য আগামী ২৩শে জুলাই দিন ধার্য করেন। ইতিমধ্যে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন আফসান চৌধুরী। জানতে চাইলে আফসান চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, মামলা দায়েরের প্রবণতা কখনোই ভালো না। ৫৭ ধারার মামলায় যেকোনো অবস্থায় যে কাউকে ধরা যায়। এখন আমি যেটা চেষ্টা করছি তা হলো আইনি লড়াইয়ের। আর আমি নিজে যেহেতু ভুক্তভোগী তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা উচিত হবে না।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করার অভিযোগে গতবছরের বিভিন্ন সময়ে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির ৮৩টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে সিলেটের আদালতে দায়ের করা একটি মামলা খারিজ হয়ে যায়। পরে ৮২ মামলার সবগুলোতেই মাহফুজ আনাম বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। একই সঙ্গে হাইকোর্টের আদেশে গত বছরের জুনে সব মামলার কার্যক্রমই স্থগিত হয়ে যায়। একটি প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের একজন স্বনামধন্য সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৮০টির বেশি মামলা দেয়ার সামলোচনা করেন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ইংরেজি দৈনিক নিউজ টুডে’র সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত যে একজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৮৩টি মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় আমরা প্রতিবাদ করেছি। দেশ বিদেশেও এটি নিন্দনীয়ও হয়েছে।
সম্প্রতি আইনমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল বা এটি বিবেচনা করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তার এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক ৫৭ ধারায় মামলা দায়েরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও আইনজীবীরা। নিউজ টুডে পত্রিকার সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি অবাক হয়ে গেলাম, কিছুদিন আগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন যে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা থাকবে না। কিন্তু তিনি এটা বলার পর থেকেই এই ধারার মামলায় অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এটা আমার কাছে আশ্চর্য মনে হয়েছে। আমরা আশা করি সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং এ ধরনের কালা কানুনের প্রয়োগ থেকে সরকার নিবৃত থাকবে। তিনি আরো বলেন, সরকারের ভিতরে একটা অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়েছে। নানা সমস্যায় সরকার ব্যতিব্যস্ত আছে। আর এটা যখন হয়, সরকারে যারা থাকে আর তাদের রুলিং পার্টির যারা নেতা তাদের সহ্য শক্তি একটু কমে যায়। তখন প্রতিপক্ষের কণ্ঠকে নিবৃত করার জন্য, যাতে সমালোচনা কম হয়, সরকারের বিরুদ্ধে কথা কম বলা হয়, তখনি এ ধরনের (৫৭) কালা কানুনকে তারা ব্যবহার করে। সুুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, আইনমন্ত্রী ৫৭ ধারা বাতিলের কথা বললেও সরকার তার সমালোচক এবং যারা গণতন্ত্রের কথা বলে তাদের শায়েস্তা করার এই অস্ত্র হাতছাড়া করবে বলে আমি মনে করি না।

উৎসঃ mzamin

print

LEAVE A REPLY