অবিবাহিত ছাত্রলীগ নেতাকে বিবাহিত প্রমাণে সংসদ সদস্যের ষড়যন্ত্র ফাঁস

যশোর জেলা ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীকে বিবাহিত প্রমাণ করার জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ভুয়া কাবিননামা জমা দিয়েছেন যশোরের একজন সংসদ সদস্য। গত সপ্তায় অনুষ্ঠিত জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনের কয়েকদিন পর তিনি ওই কাবিনের অনুলিপি জমা দেন। ছাত্রলীগের সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় বিবাহিত ছাত্রনেতাদের সংগঠনের পদ ছেড়ে দিতে ৭২ ঘন্টা সময় বেধে দেন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এর পরপরই বিষয়টি নিয়ে সরব হয়ে ওঠেন ওই সংসদ সদস্য। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে খবরটি জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে গত সোমবার যশোর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘ ৬ বছর পর অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন রওশন ইকবাল শাহী এবং সাধারণ সম্পাদক হন ছালছাবিল আহমেদ জিসান। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সহাকারী সাইফুজ্জামান শিখর, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয়দেব নন্দী, বর্তমান সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের উপস্থিতিতে যশোর পৌর কমিউনিটি সেন্টারে ভোট নেওয়া হয়। সভাপতি পদে রওশন ইকবাল শাহী পান ১০৪ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাব্বির রহমান লিমন পান ১৬ ভোট। সাধারণ সম্পাদক পদে ছালছাবিল আহমেদ জিসান পান ১০৫ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৌফিকুর রহমান পিয়াস পান ১৫ ভোট। এরপর নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগ।
সম্মেলনস্থলে উপস্থিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীর নামে সম্মেলনের দিন কোনো অভিযোগ তোলা হয়নি। এমনকি ভোটগ্রহণের আগেও সম্মেলনস্থলে দুই ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়, কারো নামে কোনো অভিযোগ থাকলে তা জানানোর জন্য। ওইসময়ও কোনো অভিযোগ জমা পড়ে নি।
পরবর্তীতে যশোরের সম্মেলনের একদিন পর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত আসে, বিবাহিত কোনো নেতা সংগঠনে থাকতে পারবে না। ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের বিবাহিত নেতাকর্মীদের পদত্যাগের জন্য পরবর্তী ৭২ ঘন্টা সময়ও বেধে দেওয়া হয়। মূলত এরপর থেকেই যশোরের ওই এমপি সরব হয়ে ওঠে। তিনি গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে যশোর ছাত্রলীগের সভাপতির বিয়ের ওই কাবিননামার অনুলিপি জমা দেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি কাজী এনায়েতকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন। ইতোমধ্যে তদন্ত শেষে কাজী এনায়েত তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী এনায়েত পূর্বপশ্চিমকে বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নামে যে কাবিননামাটি জমা দেওয়া হয়েছিল সেটি ভুয়া। বাস্তবে এর কেনো অস্তিত্ব নেই। আমি তদন্ত রিপোর্ট সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে জমা দিয়েছি।
পূর্বপশ্চিমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী কাছে জমা দেওয়া কাবিননামায় দেখানো হয়েছে, যশোর সদরের ১২ নাম্বার ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদের নিকাহ রেজিস্ট্রার আখতার হোসেন বিয়েটি পড়িয়েছেন। তথ্যটি যাচাই বাছাই শুরু হলে আখতার হোসেন বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করে লিখিত পত্র পাঠান যশোর সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। ওই পত্রে তিনি বলন, রওশন ইকবাল শাহীর ‘বিবাহ সম্পাদনের কোনো তথ্য প্রমাণ নেই।’ ফতেহপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. জসীম উদ্দিনের আবেদনের প্রেক্ষিতে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে তথ্য চান যশোর সদরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার পঙ্কজ ঘোষ। তদন্ত শেষে উপজেলা নির্বাহী অফিসার যে প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ছাত্রলীগ সভাপতি শাহীর বিয়ের কোনো তথ্য প্রমাণ ফতেহপুর কাজী অফিসে নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে প্রতিবেদনের অনুলিপি ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে ছাড়াও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকেও অবহিত করবেন সোহাগ ও জাকির।
যশোরের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে ওই সংসদ সদস্য তার নিজের অনুসারীকে নেতা বানাতে চেয়ে না পেরে এখন এইসব মিথ্যা অভিযোগ করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, যশোর ছাত্রলীগের সভাপতির নামে বিয়ের যে কাবিনটি আমাদের হাতে এসেছিল, সেটি আসলে ভুয়া। বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ আমরা পাই নি। বাস্তবে রওশন ইকবাল শাহী অবিবাহিত।

print

LEAVE A REPLY